সংসদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

চলতি সংসদ অধিবেশনে প্রতি সপ্তাহে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত বিষয়াবলী নিয়ে আয়োজিত ‘সংসদ এ সপ্তাহে’ এর এবারের পর্বটি অনুষ্ঠিত হয় গত ৩০শে অক্টোবর, ২০০৯ তারিখে। আকবর হোসেনের সঞ্চালনায় সংসদ এ সপ্তাহের এবারের আয়োজনে অতিথি হিসেবে স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান, বিএনপি’র সংসদ সদস্য বরকতউল্লাহ বুলু। এছাড়া এবারের অনুষ্ঠানে বিশ্লেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা চলতি সপ্তাহে সংসদে আলোচিত বিষয়াবলী ছাড়াও বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এ সপ্তাহে সংসদ অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তাদের বক্তব্য, মতামত প্রদান করেন এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ছিলো সংসদে এ সপ্তাহে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য বিষয়াবলী নিয়ে মাহামুদুল করিম চঞ্চলের একটি প্রতিবেদন। এবারের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রায় সবগুলি নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে সরকারকে বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করলেও কিছু সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়নি। কিছু সংসদীয় কমিটির বৈঠক না হওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন নিয়মিত সংসদীয় কমিটির বৈঠক না হলে সরকারের জবাবদিহিতা কমে যাবে। এছাড়া বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বিভিন্ন প্রেস ব্রিফিংয়ে অভিযোগ করেছেন মন্ত্রণালয়গুলি তাদের সুপারিশ অনুযায়ী কাজ করছে না। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ মানার ব্যাপারে বিধি প্রণয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি (মি মেনন) মনে করেন, মন্ত্রণালয়গুলি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশগুলি না শোনার ফলে বিষয়গুলির বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে।

এরপর প্রতিবেদক জানান, এ সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে সরকারী জোটের সাংসদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে’ সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপসের উপর বোমা হামলার বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেন। মি তাপসের উপর বোমা হামলা এবং সাংসদের নিরাপত্তা নিয়ে কোন বিবৃতি প্রদান না করায় মি গুপ্ত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। প্রতিবেদনের সবশেষে বলা হয় সংসদে সামনে সারির চার নেতার উপর বোমা হামলার বিষয়ে সংসদে বক্তব্য প্রদানের পর সংসদীয় উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সংসদ নেতার সাথে পরামর্শ করে বিষয়টি নিয়ে সাধারন আলোচনার জন্য স্পিকারকে দিন ঠিক করার প্রস্তাব দেন।

প্রতিবেদনের পরপরই ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয় কিছু কিছু সাংসদীয় স্থায়ী কমিটির বিরুদ্ধে নিয়মিত বৈঠক না করার যে অভিযোগ উঠেছে এ বিষয়ে তিনি কি মনে করেন?

এ প্রসংগে ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, তাঁর মতে, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলির বৈঠকগুলি নিয়মিত অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি থেকে কোন সুপারিশ করা হলে মন্ত্রণালয়ের উচিত সেগুলি স্বাগত জানানো।

এরপর বরকতউল্লাহ বুলুর কাছে জানতে চাওয়া হয়, কিছু কিছু সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সভা অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে কেন৻

এ প্রসংগে বলতে গিয়ে বরকতউল্লাহ বুলু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানান, অনেকক্ষেত্রে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশমালা মন্ত্রণালয় থেকে তেমন গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয় না, এর ফলে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। একইসাথে তিনি মনে করেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশগুলি বাস্তবায়নযোগ্য হলে মন্ত্রণালয়ের উচিত সে সুপারিশগুলি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা।

এরপর মি রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয় কিছু কিছু মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে স্থায়ী কমিটির সুপারিশের তোয়াক্কা না করে সিদ্ধান্ত নেয়ার যে অভিযোগ উঠেছে সে বিষয়টি তিনি কিভাবে দেখছেন৻

মি রহমান এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, তার জানা মতে স্থায়ী কমিটির কোন সুপারিশ মন্ত্রণালয় থেকে তোয়াক্কা না করার মতো কোন ঘটনা ঘটেনি। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়গুলির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলি গঠিন করা হয়েছে।

মি রহমানের কাছে আরও জানতে চাওয়া হয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে আরও ক্ষমতা দেয়া হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে স্থায়ী কমিটির কোন সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হবে কিনা৻

এ প্রসংগে মি রহমান বলছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীবর্গ সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রধান হিসেবে ভূমিকা পালন করেন তাই সংসদীয় কমিটির সুপারিশ গ্রহনের জন্য স্থায়ী কমিটির ক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রয়োজন নেই।

এরপর মি বুলুর কাছে জানতে চাওয়া হয় সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপসের উপর বোমা হামলার পরে সংসদ এবং সংসদ সদস্যদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মি গুপ্ত যে আশংকা করেছেন সে বিষয়ে তিনি কি মনে করেন?

মি বুলু তার মতামত দিতে গিয়ে জানান, বিএনপি’র পক্ষ থেকে মি তাপসের উপর বোমা হামলার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের আহবান জানানো হয়েছে। একই সাথে তিনি এও মনে করেন, একজন সাংসদের উপর হামলা হওয়ার সাথে সাথে বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদে বিবৃতি প্রদান করা উচিত ছিলো।

এরপর মি রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সাংসদের উপর বোমা হামলা বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দেয়া উচিত কিনা?

এ প্রসংগে মি রহমান বলেন, সাংসদ এবং সংসদের নিরাপত্তা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবশ্যই বিবৃতি প্রদান করা উচিত।

অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে উপস্থাপক জানিয়ে দেন এ সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে দুটি বিল পাশ হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন বিল-২০০৯’ (এই বিল অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ হবে ১৫ বছর এবং পরিচয় পত্র তৈরীর সময় মিথ্যা তথ্য দিলে এক বছর এবং জাতীয় পরিচয়পত্র জাল করলে সাত বছর কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে)। এছাড়া এ সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের দ্বিতীয় সংশোধনী বিল সম্পর্কে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে আইন বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি (এই সংশোধনী বিলটি পাশ হলে, ২০১০ সালের ২৪শে জানুয়ারির মধ্যে নিবন্ধিত কোন রাজনৈতিক দল সংশোধিত দলীয় গঠনতন্ত্র জমা না দিলে নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে।)

এরপর সেলিনা হোসেনের বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে সংসদে আলোচিত বিষয়াবলীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি তুলে ধরা হয় ‘এ সপ্তাহের স্পট লাইট’ নামক প্রতিবেদনে।

এ সপ্তাহের স্পট লাইটে সেলিনা হোসেন বলেন, এ সপ্তাহের সংসদে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আর কোন মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি না দেয়ার যে ঘোষনা দিয়েছেন সেটি তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। এর পাশাপাশি তিনি মোবাইল ফোন নিয়ে কিছু সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবনার কথা তুলে ধরেন। রাত জেগে কথা বলার জন্য মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলি তরুণসমাজকে যেভাবে প্রলুব্ধ করে তিনি সেটিকে অগ্রহনযোগ্য বলে মনে করেন। এর পাশাপাশি তিনি মনে করেন, বর্তমান সমাজে মোবাইল ফোনে ছবি তুলে মেয়েদের অবমাননা করার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। মোবাইল ফোনের এই নেতিবাচক দিকগুলি বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করার জন্য তিনি জাতীয় সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

এ সপ্তাহের স্পট লাইটের পরপরই সেলিনা হোসেন আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে স্টুডিওতে যোগ দেন। চলতি সপ্তাহে সংসদে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে থেকে মোবাইল ফোনের বিষয়টি বেছে নেয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে মোবাইল ফোন এর বিভিন্ন নেতিবাচক ব্যবহার তাঁকে এ বিষয়টি নির্বাচন করতে প্রভাবিত করেছে। একইসাথে তিনি মনে করেন, মোবাইল ফোনের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক নেতিবাচক দিকগুলি যাতে প্রসারিত হতে না পারে এজন্য সংসদে আলোচনার মাধ্যমে এ সংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়ন করা উচিত।

এরপর মি বুলুর কাছে জানতে চাওয়া হয় মোবাইল ফোনের নেতিবাচক ব্যবহার নিয়ে সেলিনা হোসেন যে অভিযোগ করেছেন তাঁরা (বিএনপি) সে বিষয়টি কতটা গুরুত্বের সাথে দেখছেন?

এ প্রসংগে মি বুলু মোবাইল ফোনের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অপব্যবহার দিক নিয়ে সেলিনা হোসেনের সাথে একমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, মোবাইল ফোনের নেতিবাচক ব্যবহারের বিরুদ্ধে সংসদে আলোচনা করে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা উচিত।

মোবাইল ফোনের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অপব্যবহার নিয়ে মি রহমানের মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য বিরোধী দলকে সাংসদে আমন্ত্রণ জানান। তিনি মনে করেন, মোবাইল ফোনের নেতিবাচক ব্যবহার বন্ধ করার লক্ষ্যে সংসদ থেকে একটি নীতিমালা প্রস্তুত করা গেলে সবাই সেটি মানতে বাধ্য হবেন।

এরপর সেলিনা হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয় আর কোন মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়া না হলে এটি বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে?

সেলিনা হোসেন বিষয়টি নিয়ে বলতে গিয়ে মনে করেন, জনগনকে একটি মানসম্মত সেবা দেয়ার জন্য বাজারে প্রতিযোগিতার প্রয়োজন আছে। তিনি আরও মনে করেন, প্রতিযোগিতা থাকলে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে ভালো সেবা প্রদানের একটি প্রবনতা তৈরি হয়।

বিষয়টি নিয়ে মি বুলু সেলিনা হোসেনর সাথে একমত পোষণ করেন।

এরপর মি রহমানকে বলা হয় অনেকের মতে সমাজের চাহিদার সাথে সংগতি রেখেই মোবাইলের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন এবং অফার দেয়া হচ্ছে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় সংসদে আইন প্রণয়ন করে মোবাইল সংক্রান্ত এই চাহিদাগুলি বন্ধ করা যাবে কিনা?

এর জবাবে মি রহমান মনে করেন, মোবাইল ফোনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সংসদে আলোচনা হলে একটি ফলাফল আসবে। তিনি আরও জানান, বিটিসিএলকে আরও উন্নত করে মোবাইল সেবার আধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার জন্যেই ভবিষ্যতে আর কোন মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শেষপ্রান্তে স্টুডিওতে যোগ দেন প্রতিবেদক মাহামুদুল করিম চঞ্চল। সঞ্চালক তার কাছে জানতে চান আগামী সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়গুলি কি কি?

মি. চঞ্চল জানান, সংসদে আগামী সপ্তাহে দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি) নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তিনি আরও জানান, সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপসের উপর বোমা হামলার বিষয় নিয়ে আগামী সপ্তাহের সংসদে একটি সাধারন আলোচনার কথা রয়েছে। এর পাশপাশি স্থানীয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বিলটি আগামী সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে পাশ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয় গত ৩০শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত সাড়ে দশটায়

সংসদ এ সপ্তাহেপ্রযোজনা করেছেন ক্রেইগ স্কট