যানজট সমস্যার সমাধান কোথায়?

চলতি সংসদ অধিবেশনে প্রতি সপ্তাহে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত বিষয়াবলী নিয়ে আয়োজিত ‘সংসদ এ সপ্তাহে’ এর এবারের পর্বটি অনুষ্ঠিত হয় গত ৯ই অক্টোবর, ২০০৯ তারিখে। আকবর হোসেনের সঞ্চালনায় সংসদ এ সপ্তাহের এবারের আয়োজনে অতিথি হিসেবে স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ, বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য আবুল খয়ের ভূঁইয়া। এছাড়া বিশ্লেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা চলতি সপ্তাহে সংসদে আলোচিত বিষয়াবলী ছাড়াও বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এ সপ্তাহে সংসদ অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তাদের বক্তব্য, মতামত প্রদান করেন এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ছিলো সংসদের চলতি সপ্তাহের কার্যক্রম নিয়ে মাহামুদুল করিম চঞ্চলের একটি প্রতিবেদন। প্রতিবেদনের শুরুতেই বলা হয়, এবারের জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলায় ভাষণ প্রদান করার পাশাপাশি বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আব্দুস শহিদ সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব আনেন। সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব আনার কারণ হিসেবে মি শহিদ মনে করেন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সকল বাংলাভাষী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। প্রতিবেদক জানান, সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রস্তাব দেয়ার বিষয়ে সংসদে প্রায় এক ঘন্টার মতো আলোচনা হলেও এর সিংহভাগই ছিলো স্তুতি বাক্য। তবে সরকারি দলের সাংসদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এ প্রসংগে মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রস্তাব দেয়ার ঘোষণা প্রথমে বিরোধী দলের কাছ থেকে আসলে এবং সরকারী দল সেটি সমর্থন করলে সেটি সর্বাঙ্গীন সুন্দর হতো। একই সাথে তিনি (সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত) মনে করেন, ধন্যবাদ প্রস্তাব আনতে না পারলেও বিরোধী দলের অন্ততপক্ষে সংসদে উপস্থিত থাকা উচিত ছিলো।

প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রস্তাবের বিষয়ে সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় একজন মনে করেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে বাংলাতে ভাষন দিবেন এটিই তো স্বাভাবিক।

আরেকজন মনে করেন, বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অনুমোদনের প্রস্তাব দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।আবার আরেকজন মনে করেন, ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে সংসদে এত সময়ক্ষেপণ করা ঠিক হয়নি।

প্রতিবেদক জানান, বিরোধী দল সংসদে অনুপস্থিত থাকলেও অধিবেশনের বাইরে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নিয়ে স্থায়ী সরকার কমিশনের প্রাক্তন সদস্য অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ জানান, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কোন নির্বাহীকে সরাসরি নিদের্শ দিতে পারেন না, তারা শুধুমাত্র পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। তিনি মনে করেন, প্রথম দিকে কিছু কিছু সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকলেও সংসদীয় কমিটির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সেটি দেশের গনতন্ত্রকে আরও সুসংহত করবে।

প্রতিবেদনের পরপরই অধ্যাপক আলী আশরাফের কাছে জানতে চাওয়া হয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রস্তাব দেয়ার প্রাক্কালে অতি প্রশংসার মাধ্যমে সংসদের সময়ের সদ্ব্যবহার নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে সে বিষয়টি তিনি কি ভাবে দেখছেন?

এ প্রসংগে অধ্যাপক আলী আশরাফ মনে করেন, সংসদের কার্যপ্রণালীর সময় মাথায় রাখা উচিত সংসদের প্রকৃত কাজ হচ্ছে দেশের আইন প্রণয়ন এবং জাতীয় নীতি নির্ধারন করা।

এরপর আবুল খয়ের ভূঁইয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয় “প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রস্তাব দেয়ার ঘোষণা প্রথমে বিরোধী দল থেকে আসা উচিত ছিলো”-সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের এমন মন্তব্যের বিষয়ে তিনি কি ভাবছেন?

এ প্রশ্নের জবাবে আবুল খয়ের ভূঁইয়া জানান, বিরোধী দল সংসদে অনুপস্থিত থাকলেও সংসদের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়মিত অংশগ্রহন করছেন। তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় ভাষণ দেয়াকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। একই সাথে তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রস্তাব দেয়ার সিদ্ধান্ত বিরোধী দল থেকে আসলে সেটি আরও অর্থবহ হতো।

এরপর মি আশরাফের কাছে জানতে চাওয়া হয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেয়াটাই স্বাভাবিক কিনা?

মি ভূঁইয়া এ প্রশ্নের জবাবে জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জাতিসংঘে তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে। একইসাথে তিনি জানান, জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় ভাষণ দেয়াটা স্বাভাবিক হলেও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশ এটির চর্চা করে না।

এরপর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কর্মকান্ড নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা সমালোচনার প্রেক্ষিতে মি আশরাফ মনে করেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি মেনেই করতে হবে। তিনি আরও মনে করেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যাতে কার্যপ্রণালী বিধি মেনে চলে এ বিষয়ে দেশবাসী ও গণমাধ্যমের অনেক ভূমিকা আছে।

এরপর মি ভূঁইয়ার কাছে জানতে হয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দল অংশ নিয়ে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন কিনা?

মি ভূঁইয়া এ প্রশ্নের জবাবে জানান, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দল তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

মি আশরাফের কাছে জানতে চাওয়া হয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিরোধী দলের ভূমিকাকে তিনি কিভাবে মূল্যায়িত করবেন?মি আশরাফ এ প্রশ্নের জবাবে জানান, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিরোধী দলের ভূমিকা সমাদৃত এবং গৃহীত হচ্ছে।

এরপর উপস্থাপক জানিয়ে দেন সংসদে এই সপ্তাহের অধিবেশনে মোবাইল কোর্ট বিল (এর ফলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সর্বোচ্চ দুই বছরের শাস্তি প্রদান করতে পারবেন), স্থানীয় সরকার সিটি কর্পোরেশন বিল (এই বিলে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা রাখার বিধান এবং ডেপুটি মেয়র রাখার বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়েছে) এবং স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ বিল (এর ফলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা দাখিল করতে হবে না এবং ঋণখেলাপীরা মনোনয়ন দাখিলের আগের দিন কিস্তি পরিশোধ করে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে পারবেন) পাশ হয়েছে। একইসাথে তিনি জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (তৃতীয় সংশোধনী) বিল এবং জাতির পিতার পরিবারের সদস্যগণের নিরাপত্তা এবং আনুষাঙ্গিক বিষয়ে বিধান প্রণয়নকল্পে আনীত বিল দুটি এ সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত হয়েছে।

এরপর সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুলে ধরা হয় ‘এ সপ্তাহের স্পট লাইট’ নামক প্রতিবেদনে।

এবারের এ সপ্তাহের স্পট লাইটে ইমদাদুল হক মিলন ঢাকা শহরের যানজট নিয়ে আলোকপাত করেন। যানজটের কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যানজটের কারণে ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। রাজধানীতে ধারণ ক্ষমতার তুলনায় বহুগুণ মানুষের বসবাসকেই তিনি এর (যানজটের) কারণ বলে মনে করেন। একইসাথে তিনি মনে করেন, সংসদ সদস্যরা যানজট সমস্যার বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকলেও এটি থেকে মুক্তির পথ নিয়ে কেউ ভাবছেন না।

এরপরই মি. মিলন আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে স্টুডিওতে যোগ দেন। সংসদে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে থেকে ঢাকা শহরের যানজটকে বেছে নেয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, যানজট ঢাকাবাসীর প্রতিদিনকার একটি সমস্যা হয়ে গেছে বলেই তিনি বিষয়টি বেছে নিয়েছেন। তিনি ঢাকা শহরে যানজটের কারণে সৃষ্ট কিছু দুর্ভোগের উদাহরণ দিয়ে মনে করেন, একটি দেশের রাজধানী শহরে এমন যানজট কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

এরপর মি. আশরাফের কাছে জানতে চাওয়া হয়, যানজট নিরসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিনা?

এ প্রশ্নের জবাবে মি আশরাফ মনে করেন, শুধুমাত্র সংসদে আলোচনা করে সরকারের একার পক্ষে যানজট সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তিনি আরও মনে করেন, যানজট সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে, দেশের জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।

এরপর মি ভূঁইয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয় যানজট নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে?

এ প্রসংগে মি ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার যানজট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

ক্ষমতাসীন সময়ে চারদলীয় জোটের পক্ষ থেকে যানজট নিরসনে কি কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো জানতে চাওয়া হলে মি ভূঁইয়া জানান, চারদলীয় জোট সরকার ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে খিলগাঁও উড়াল সেতু নির্মান, প্রাইভেট বাস সার্ভিস ও সিএনজি অটো-রিক্সা চালু করাসহ বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নিয়েছিলো।

অনেকেই অভিযোগ করেন, ‘যানজট নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও সেই তুলনায় অগ্রগতি অনেক কম’- এ প্রসংগে মি মিলনের মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি মনে করেন, দেশের জনসংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে অচিরেই সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দেশের যানজট সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

এরপর মি আশরাফের কাছে জানতে চাওয়া হয় কিভাবে যানজট ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত করা যায়?

এ বিষয়ে মি আশরাফ বলেন, ঢাকা শহরের যানজট একদিনে সৃষ্টি হয়নি। তিনি মনে করেন, রাজধানীর যানজট সমস্যা নিরসনে সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ঢাকা শহরকে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। তিনি মনে করেন, বিরোধী দল সংসদে এসে সরকারকে যানজট নিরসনে বিভিন্ন পরামর্শ দিলে সেটি আরও বেশী কার্যকর হতো।

মি ভূঁইয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয় যানজট সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে কি পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত?

এ বিষয়ে মি ভূঁইয়া বলতে গিয়ে মনে করেন, ঢাকা শহরের যানজট সমস্যা নিরসনে রাজধানী থেকে বিকেন্দ্রীকরণ নীতি অনুসরন করতে হবে।

অনুষ্ঠানের শেষপ্রান্তে স্টুডিওতে যোগ দেন প্রতিবেদক মাহামুদুল করিম চঞ্চল। সঞ্চালক তার কাছে জানতে চান আগামী সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনের সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়গুলি কি কি?

মি চঞ্চল জানান, এ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সংসদে কার্য-উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে আগামী ১৩ই অক্টোবর, ২০০৯ পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন চলবে (অবশ্য জরুরী প্রয়োজনে স্পিকার এ সময়সীমা বৃদ্ধি করতে পারবেন)। সাবেক স্পিকার, সাবেক ডেপুটি স্পিকার এবং সাবেক চিফ হুইপের দুর্নীতি নিয়ে এ সপ্তাহে সংসদে একটি তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপিত হয়েছে জানিয়ে তিনি মনে করেন, সাবেক সাংসদদের দুর্নীতির প্রতিবেদন আগামী সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনের আলোচ্যসূচীতে থাকতে পারে। এছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্র (পি আর এস পি) সংক্রান্ত যে প্রতিবেদনটি এ সপ্তাহে সংসদে আলোচিত হয়েছে সেটিও আগামী সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে আলোচিত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

অনুষ্ঠানটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয় গত ৯ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত সাড়ে দশটায়

সংসদ এ সপ্তাহেপ্রযোজনা করেছেন ক্রেইগ স্কট