সংসদীয় অধিবেশনের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা

প্রতি সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত বিষয়াবলী নিয়ে আয়োজিত ‘সংসদ এ সপ্তাহে’ এর এবারের পর্বটি ছিল অনুষ্ঠিত হয় গত ১৭ই জুলাই, ২০০৯ তারিখে। আকবর হোসেনের সঞ্চালনায় এবারের সংসদ এ সপ্তাহের আয়োজন ছিল সম্প্রতি শেষ হওয়া ৯ম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সার্বিক মূল্যায়ন নিয়ে।

এবারের আয়োজনে অতিথি হিসেবে স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলেন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) শাখার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এছাড়া বিশ্লেষক হিসেবে এবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিভি নির্মাতা এবং চলচ্চিত্রকার মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা সদ্য শেষ হওয়া সংসদ অধিবেশনে আলোচিত বিষয়াবলী ছাড়াও বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে তাদের বক্তব্য, মতামত প্রদান করেন এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

এবারের অনুষ্ঠান শুরু হয় ৯ম জাতীয় সংসদের স্পীকার আব্দুল হামিদের একটি ধারণকৃত সাক্ষাতকার দিয়ে।

সাক্ষাতকারে ৯ম জাতীয় সংসদের ২য় অধিবেশন নিয়ে আব্দুল হামিদের মতামত জানতে চাওয়া হলে আব্দুল হামিদ বিবিসিকে বলেন, এবারের সংসদ অধিবেশন প্রাণবন্ত হলেও প্রধান বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত থাকলে সেটি আরও পূর্ণতা পেত। তিনি মনে করেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার তর্ক বিতর্কের মধ্যে দিয়েই সংসদে ভালো জিনিস বের হয়ে আসে।

এরপর মি হামিদের কাছে জানতে চাওয়া হয় বিগত সংসদের স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার এবং চিফ হুইপের দুর্নীতির অভিযোগকে খতিয়ে দেখার জন্য গঠিত সংসদীয় কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা মুলতবি রাখা হয়েছে কেন?

এ প্রশ্নের জবাবে মি হামিদ জানান, সংসদীয় কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনটি এবারের অধিবেশনের শেষ দিন দেয়ার ফলে আলোচনা কিছুটা বাঁধাগ্রস্ত হলেও আলোচনার সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি।

যেকোন দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখার এখতিয়ার আছে শুধুমাত্র দুর্নীতি দমন কমিশনের; সংসদের নয়, বিরোধীদলের এ বক্তব্যের বিষয়ে তার মতামত জানতে চাওয়া হলে মি হামিদ বলেন, সংসদে যে কোন বিষয়ে তদন্ত করার জন্য সংসদীয় কমিটি গঠন করার এখতিয়ার সংসদের আছে। তিনি জানান, সংসদীয় কমিটির কাজ হচ্ছে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। একইসাথে তিনি জানান, সংসদীয় তদন্তে অভিযুক্তদের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট আদালত বা দুর্নীতি দমন কমিশন রয়েছে।

এরপর তার কাছে জানতে চাওয়া হয় বিরোধীদলকে সংসদে আনা সম্ভব হচ্ছেনা কেন? একইসাথে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় বিরোধীদলকে সংসদে আনতে তিনি কোন প্রকার বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছেন কিনা?

এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বিরোধীদলকে সংসদে আনতে কোন প্রকার বাঁধার সম্মুখীন হওয়ার আশংকা নাকচ করে দেন। তিনি জানান, আনুপাতিক হিসাবে সংসদের সামনের সারিতে বিএনপির ৪টি আসন পাওয়ার কথা থাকলেও তিনি তাদেরকে (বিএনপিকে) ৫টি আসন বরাদ্দ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'প্রধান বিরোধীদলে এমন কোন ব্যক্তি (সাংসদ) নেই যাদের ২য় সারির আসন দিলে সমস্যা।' সেইসাথে তিনি যোগ করেন, আওয়ামী লীগের প্রথম সারির সাংসদ এবং সাবেক মন্ত্রীদেরকে বিএনপি তাদের ক্ষমতাসীন সময়ে ২য় সারির আসন দিয়েছিল।

“স্পীকার আসন বিন্যাসের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে ভূমিকা পালন করতে পারছেন না।“ বিরোধী দলের এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে মি হামিদের মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, আসনবিন্যাস নিয়ে তার সাথে আলোচনার সময় বিএনপি যে কথা বলে মিডিয়ার সামনে সেটি বলেন না। তিনি মনে করেন, যে রাজনৈতিক সমস্যার কারণে বিএনপি সংসদে আসতে পারছেন না সেটি মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করতে না পেরে বিএনপি সরকারের উপর দোষ চাপাচ্ছেন।

এরপর তাকে প্রশ্ন করা হয়, সংসদের আর্থিক পরিচালনার বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের জায়গাটি আরও উপরে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা?

মি হামিদ বলেন, সংসদের আর্থিক পরিচালনার বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের জায়গাটি আরও উপরে নিয়ে চেষ্টা তিনি অব্যাহত রাখবেন। তবে এক্ষেত্রে তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

এরপর ৯ম জাতীয় সংসদের ২য় অধিবেশন নিয়ে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বাজেট অধিবেশনে কারণে ২য় অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিরোধী দলের অনুপস্থিতি সংসদের প্রাণবন্তভাব কিছুটা ক্ষুণ্ণ করেছে।

এ বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামানের কাছে জানতে চাওয়া হয় ২য় অধিবেশন থেকেই বিরোধী দলের সংসদে অনুপস্থিতি কতটুকু প্রত্যাশিত ছিল? এ প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান জানান, বিরোধী দলের সংসদ বর্জন মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না। সেইসাথে তিনি মনে করেন আসন বিন্যাসের যে যুক্তি দেখিয়ে বিএনপি সংসদ বর্জন করেছেন সেটি সংসদ বর্জনের জন্য উপযুক্ত যুক্তি নয়। তিনি আরও মনে করেন এবারের সংসদ অধিবেশনে কিছু ইতিবাচক গুণগত পরিবর্তন এসেছে।

এরপর মি সিদ্দিকীর কাছে জানতে চাওয়া হয় এবারের সংসদ অধিবেশনে সাংসদরা যে বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলছেন সেখানে তারা (সাংসদরা) সুনির্দিষ্টভাবে গুণগত কথা কতটুকু বলতে পারছেন?মি সিদ্দিকী বলেন, সংসদে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিয়ে আলোচনা প্রশংসিত নিয়ে হলেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সমালোচিত হয়েছে। তিনি জানান, বিহত অধিবেশনে সরকার দলীয় সাংসদরা কিছু কিছু বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন।

মি জামানের কাছে জানতে চাওয়া হয় বাজেট আলোচনার বাইরে এবারের সংসদের কোন বিষয়টি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে? এ প্রসংগে মি জামান প্রথমেই উল্লেখ করেন সদ্য পাশ হওয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের কথা। এর পাশাপাশি বিদেশী নাগরিকদের সাথে বাংলাদেশী নাগরিকদের বিবাহ এবং অধিকার সংক্রান্ত বিলটাকেও তিনি ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন। সবশেষে তিনি উল্লেখ করেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল আইনের সংশোধনীকে পাশ হওয়াকে। তিনি মনে করেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল আইন পাশ হওয়ার ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ দেশের বিচারিক কার্যক্রম সহজতর হবে।

৯ম জাতীয় সংসদের ২য় অধিবেশনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের যে প্রস্তাবনাটি উঠেছে সেটিই বাজেটের বাইরে মি সিদ্দিকীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি মনে করেন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কোন প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন যে তিনি মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার একটি নেতিবাচক প্রভাব আমাদের উচ্চ আদালতের উপরও পড়েছে।

মি জামানও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে মি সিদ্দিকীর সাথে একমত পোষণ করেন। এরপর এবারের পর্বের বিশ্লেষক মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর দৃষ্টিতে ৯ম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয় ‘এ সপ্তাহের স্পট লাইট’ নামক প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনের প্রথমেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকী মনে করেন দেশের সব কর্মকান্ডের মূলে সংসদের থাকার কথা থাকলেও এদেশে এখনও সেটির বাস্তবায়ন হয়নি। তার মতে সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশ এখনও প্রস্তুত নয়। তিনি আরও মনে করেন, এদেশের প্রতিটি পরিবারে গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করা গেলেই কেবলমাত্র সত্যিকারের সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব হবে।

এরপর মি সিদ্দিকীর কাছে জানতে চাওয়া হয় সংসদ নিয়ে মানুষের বিপুল প্রত্যাশা থাকলেও সংসদের কার্যক্রম নিয়ে মানুষের আস্থার অভাব দূর করা যাচ্ছে না কেন? এ প্রশ্নের জবাবে মি সিদ্দিকী মনে করেন সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্মটি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে না পারার কারণেই সংসদের কার্যক্রম নিয়ে মানুষের অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে। একইসাথে তিনি মনে করেন বিগত সময়ে বিভিন্ন সাংসদের অপকর্মের খবর জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়ায় সংসদের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধাবোধ কমে গেছে। তিনি জানান প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রে বিভিন্ন মতের প্রকাশ ঘটবে এবং এতে (মত প্রকাশে) কেউ বাঁধা দিতে পারবে না।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংসদের অপকর্ম এবং দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে মি জামানের কাছে প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশের সংসদ নিয়ে এত সমালোচনার প্রয়োজন আছে কি?

এ প্রশ্নের জবাবে মি জামান মনে করেন একটি ব্যর্থতা দিয়ে আরেকটি ব্যর্থতাকে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। তিনি আরও মনে করেন একজন সংসদ সদস্যের মৌলিক ভূমিকা কি এবং কোথায় সে বিষয়ে সাংসদদের সম্যক্‌ ধারণা থাকা উচিত।

সংসদের আগামী অধিবেশনে সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা কতটুকু প্রতিফলিত হবে? এ প্রশ্নের জবাবে মি সিদ্দিকী বলেন, সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা পুরণের চাবিকাঠি নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন দলের যোগ্য নেতৃত্বের উপর। তিনি মনে করেন সাংসদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন হলেও সাংসদরা সাধারণত এটি (আইন প্রণয়ন) নিয়ে কথা না বলে শুধুমাত্র স্থানীয় উন্নয়নের কথা বলে থাকেন।

এরপর মি জামানের কাছে জানতে চাওয়া হয় আগামীতে সংসদকে মূল (আইন প্রণয়নকারী) ভূমিকায় দেখার জন্য তিনি কতটুকু আশাবাদী? মি জামান এ ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করে জানান বিগত সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়ের সংসদ অধিবেশনে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সবশেষে তিনি মনে করেন, সংসদের ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা বজায় রাখার মূল দায়িত্ব সরকারী দলের হলেও বিরোধী দলের উপর এর কিছুটা দায় বর্তায়।

অনুষ্ঠানটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয় গত ১৭ই জুলাই, ২০০৯ রাত সাড়ে দশটায়

সংসদ এ সপ্তাহেপ্রযোজনা করেছেন ক্রেইগ স্কট