এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়া নিয়ে বিতর্ক

চলতি সংসদ অধিবেশনে প্রতি সপ্তাহে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত বিষয়াবলী নিয়ে আয়োজিত ‘সংসদ এ সপ্তাহে’ এর এবারের পর্বটি অনুষ্ঠিত হয় গত ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ তারিখে। আকবর হোসেনের সঞ্চালনায় সংসদ এ সপ্তাহের এবারের আয়োজনে অতিথি হিসেবে স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এবং সাবেক আইন মন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু, বিরোধী দলের চীফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুক এবং বিশ্লেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী।

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা চলতি সপ্তাহে সংসদে আলোচিত বিষয়াবলী ছাড়াও বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এ সপ্তাহে সংসদ অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তাদের বক্তব্য, মতামত প্রদান করেন এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

অনুষ্ঠানের প্রথমেই উপস্থাপক জানান, সংসদের এ সপ্তাহের অধিবেশনে স্থানীয় সরকার সিটি কর্পোরেশন বিল এবং স্থানীয় সরকার পৌরসভা বিল দুটি সংসদের কার্যসূচীতে থাকলেও উত্থাপিত হয়নি। তিনি আরও জানান, যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ সংশোধন বিল এবং দি প্রেস্টিসাইড সংশোধন বিল সম্পর্কে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। একইসাথে জানানো হয়, সরকারী ভূমি থেকে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ প্রতিরোধ বিল এবং নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ বিল দুটি সংসদে উত্থাপিত হয়েছে এবং বিল দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এরপরই ছিলো সংসদের এ সপ্তাহের কার্যক্রম নিয়ে মাহামুদুল করিম চঞ্চলের একটি প্রতিবেদন। এবারের প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে জনগণের নাভিশ্বাস উঠে গেলেও বিরোধী দল সংসদে যোগ না দেয়ায় এ বিষয়ে সংসদে কোন আলোচনা হয়নি। একই সাথে বলা হয় বিরোধীদল নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি এবং টিপাইমুখ বাঁধ সহ পঁয়ত্রিশটি বিষয়ে আলোচনার জন্য মুলতবি প্রস্তাব দিয়েছিলো। তবে স্পিকার বিরোধী দল প্রস্তাবিত কিছু নোটিশের বিষয় বিদ্যমান আইনে নিষ্পত্তিযোগ্য, কিছু কার্যপ্রণালী বিধির অধীন অন্যান্য বিধির আওতায় নিষ্পত্তিযোগ্য এবং কিছু নোটিশের বিষয়কে অনুমান নির্ভর এবং অস্পষ্ট উল্লেখ করে সেগুলি নাকচ করে দেন।

প্রতিবেদক জানান, সরকারী জোটের সাংসদরা ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে’ টিপাইমুখ বাঁধ এবং সাবেক স্পিকারের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনার দাবি তুলেছেন। প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, তেল গ্যাস চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনার দাবি জানিয়েছেন সরকারী জোটের সাংসদ রাশেদ খান মেনন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার বঙ্গোপসাগরের তিনটি তেল-গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানের জন্য দুটি বিদেশি কোম্পানির সাথে উৎপাদন-বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি সংসদে আলোচিত না হলেও এটি নিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত রয়েছে।

প্রতিবেদনে বিদেশি কোম্পনির সাথে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চুক্তি সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এদেরই একজন বিদেশি কোম্পানির সাথে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের চুক্তিকে দেশের জন্য ইতিবাচক বলে অভিহিত করেন। আরেকজন মনে করেন, খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে দেশীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেয়া উচিত।

প্রতিবেদনে জানা যায়, এই চুক্তিটি (তেল-গ্যাস উত্তোলন সংক্রান্ত) বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে। প্রতিবেদনের পরপরই আব্দুল মতিন খসরুর কাছে জানতে চাওয়া হয় বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব স্পিকারের নাকচ করে দেয়ার বিষয়টি তিনি কিভাবে দেখছেন?

এ প্রসংগে আব্দুল মতিন খসরু বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সংসদের সুনির্দিষ্ট বিধি মেনে সংসদে আলোচিত হওয়া উচিত। তিনি জানান, কি অবস্থার প্রেক্ষিতে সংসদে মুলতবি প্রস্তাব গ্রহন করা যায় সেটি স্পিকারের বিবেচ্য বিষয়। তিনি মনে করেন, প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা সংসদে উপস্থিত থাকলে বিরোধী দলের কোন মুলতবি প্রস্তাবের প্রয়োজন পড়তো না।

এরপর জয়নুল আবদীন ফারুকের কাছে জানতে চাওয়া হয়, বিএনপি কেন সংসদের বাইরে থেকে মুলতবি প্রস্তাব দিয়েছে?এ প্রশ্নের জবাবে জয়নুল আবদীন ফারুক জানান, বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব গ্রহন করার মাধ্যমে সরকারী দল তাদের (বিএনপিকে) সংসদে আনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারতো। তিনি মনে করেন, স্পিকার যে কারণগুলি দেখিয়ে বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন সেগুলি যুক্তিসঙ্গত নয়। তিনি মনে করেন, বিরোধী দলকে সংসদে আনতে সরকারের আন্তরিকতার অভাব আছে।

এরপর মি খসরুর কাছে জানতে চাওয়া হয় বিগত সময়ে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন অবস্থায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা আগামী ৫০ বছরের জ্বালানী মজুদ করার ঘোষণা দিলেও এখন কেন তিনি বিদেশি কোম্পানির সাথে তেল-গ্যাস উৎপাদন-বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করার অনুমোদন দিয়েছেন?

মি খসরু এ প্রশ্নের জবাবে জানান, আগামী ৫০ বছরের জ্বালানী মজুদ রাখার সিদ্ধান্তে সরকার এখনও অটল আছে। তিনি বলেন, দেশের তেল-গ্যাসের প্রকৃত মজুদের পরিমাণ জানার জন্যই বিদেশি কোম্পানিকে গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানের অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে তৎকালীন জোট সরকারের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠেছিলো-এ বিষয়ে মি ফারুকের মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, ক্ষমতাসীন সময়ে বিএনপি খনিজ সম্পদ উত্তোলন সংক্রান্ত বিষয়ে বিদেশি কোন কোম্পানির সাথে চুক্তি করেনি। এ বিষয়ে বিএনপির দলীয় অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে তিনি মনে বলেন, আগে দেশের চাহিদা মিটিয়ে তেল-গ্যাস বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

এরপর রফিকুন নবীর বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে সংসদে আলোচিত বিষয়াবলীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি তুলে ধরা হয় ‘এ সপ্তাহের স্পট লাইট’ নামক প্রতিবেদনে।

এ সপ্তাহের স্পট লাইটে রফিকুন নবী এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি মনে করেন, এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া উচিত। যারা এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিরোধিতা করছেন তিনি তাদেরকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহবান জানান। এরপরই মি. নবী আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে স্টুডিওতে যোগ দেন। সংসদে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে থেকে এশিয়ান হাইওয়েকে বেছে নেয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান যে তিনি মনে করেন, এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হলে বাংলাদেশ লাভবান হবে।

এরপর মি. খসরুর কাছে জানতে চাওয়া হয় দেশের সার্বভৌমত্ব সহ সব বিষয় বিবেচনা করে সরকার এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন কিনা? এ প্রশ্নের জবাবে মি খসরু এশিয়ান হাইওয়েকে আন্তর্জাতিক সড়ক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনিও মনে করেন, এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হলে লাভ বাংলাদেশেই হবে।

এরপর এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে মি ফারুকের মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, এশিয়ান হাইওয়ে ভারত থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে এসে ভারতেই শেষ হয়েছে, এজন্য তারা (বিএনপি) এটির বিরোধিতা করছেন। তিনি আরও জানান, মিয়ানমারের সাথে সংযুক্ত করে পুরো এশিয়া নিয়ে এই হাইওয়ে নির্মাণ করা হলে বিএনপি সেটির বিরোধিতা করবে না।

এরপর মি খসরুর কাছে জানতে চাওয়া হয় এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে বিরোধী দলের আশংকা সরকার কিভাবে নিরসন করবে? এ প্রশ্নের জবাবে মি খসরু জানান, এশিয়ান হাইওয়ের জন্য প্রস্তাবিত তিনটি রুটের মধ্যে এইচ-৪১ রুটটি বাস্তবায়িত হলে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তিনি বলেন, এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে বিরোধী দলের কিছু বলার থাকলে সেটি সংসদে এসে বলা উচিত।

এরপর মি নবীর কাছে জানতে চাওয়া হয় এশিয়ান হাইওয়ের কোন রুটে যুক্ত হলে সেটি বাংলাদেশে দলমত নির্বিশেষে গ্রহনযোগ্য হবে? মি নবী বলেন তিনি মনে করেন, এশিয়ান হাইওয়ের রুট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে।

অনুষ্ঠানের শেষপ্রান্তে স্টুডিওতে যোগ দেন প্রতিবেদক মাহামুদুল করিম চঞ্চল। সঞ্চালক তার কাছে জানতে চান আগামী সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনের সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়গুলি কি কি?মি. চঞ্চল জানান, স্থানীয় সরকার সিটি কর্পোরেশন বিল এবং স্থানীয় সরকার পৌরসভা বিল দুটি আগামী সপ্তাহে সংসদে অনুমোদনের কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ সংশোধন বিল এবং দি প্রেস্টিসাইড সংশোধন বিল দুটিও সংসদে পাশ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

অনুষ্ঠানটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয় গত ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত সাড়ে দশটায়

সংসদ এ সপ্তাহেপ্রযোজনা করেছেন ক্রেইগ স্কট