অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ

প্রতি সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত বিষয়াবলী নিয়ে আয়োজিত ‘সংসদ এ সপ্তাহে’ এর প্রথম আয়োজন ছিল গত ২৬শে জুন, ২০০৯ তারিখে। আকবর হোসেনের সঞ্চালনায় সংসদ এ সপ্তাহের প্রথম অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ, বিএনপি’র সংসদ সদস্য মওদুদ আহমেদ এবং বিশ্লেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. মিজানুর রহমান শেলী। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা চলতি সপ্তাহে সংসদে আলোচিত বিষয়াবলী ছাড়াও বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এ সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তাদের বক্তব্য, মতামত প্রদান করেন এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

অনুষ্ঠানটি শুরু হয় মাহামুদুল করিম চঞ্চলের একটি প্রতিবেদন দিয়ে। এ প্রতিবেদনে বলা হয় কালো টাকা সাদা করার পুরোনো ইস্যুতে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জাতীয় সংসদ (উল্লেখ্য, এবারের বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রয়েছে)। প্রতিবেদনে জানা যায়, কালো টাকা সাদা করা নিয়ে খোদ সরকারী দলের সাংসদরাই দ্বিধাবিভক্ত। তাদের (সরকারদলীয় সাংসদ) কেউ বলেন, কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্তটি যথার্থ আবার কেউবা মনে করেন এ সুযোগ সংবিধান পরিপন্থী। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় টিপাইমুখের বাঁধ বর্তমানে দেশের অন্যতম আলোচিত ইস্যু হলেও সংসদে বিষয়টি নিয়ে তেমন কোন আলোচনা হয়নি। একই সাথে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি টিপাইমুখ প্রকল্প স্থলে প্রতিনিধি দল পাঠানোর সুপারিশ করলেও সরকারদলীয় মন্ত্রীরা এ (টিপাইমুখ প্রকল্প) ব্যাপারে কোন মতামত দিচ্ছেন না বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। সবশেষে প্রতিবেদক জানান, বিএনপি সংসদে অনুপস্থিত থাকলেও সংসদের বাইরে টিপাইমুখের বাঁধ সংক্রান্ত নানা দাবি এবং কর্মসূচী নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে।

বিএনপি নেতা জয়নাল আবদীন ফারুক প্রতিবেদককে বলেন, বিএনপি সংসদের আভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে অংশ না নিলেও জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে মিডিয়ার মাধ্যমে দলের (বিএনপির) কথাগুলি জাতির সামনে তুলে ধরছে। তিনি জানান টিপাইমুখের বাঁধ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশের সিলেট, নোয়াখালী এবং কুমিল্লা অঞ্চলে ফারাক্কা বাঁধের চেয়েও ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। তিনি আরও জানান টিপাইমুখের বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে বিএনপি আন্দোলনে যাবে।

এ সপ্তাহে টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যুটি সংসদে উত্থাপন করেন সরকারী জোটের সাংসদ রাশেদ খান মেনন। বর্তমানে বিষয়টি (টিপাইমুখের বাঁধ) নিয়ে বিএনপি রাজনীতি করছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে বিএনপি কোন আলোচনা করেননি। তিনি আরও জানান সরকার যেন টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে নীরব ভূমিকা পালন না করেন সেজন্য তিনি এ প্রসংগটি সংসদে তুলে ধরেছেন।

প্রতিবেদনে সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে জনগণ সরকার এবং বিরোধী দলের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট নয়। তাদেরই একজন জানান, টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে সরকার জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছে না। আরেকজন মনে করেন, টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে সরকারের যতটা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা উচিত, সরকার তা রাখতে পারছেন না। এসময় আরেকজন নাগরিক জানান তিনি মনে করেন, বিরোধী দল রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার জন্য টিপাইমুখের বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতা করছেন।

প্রতিবেদনের শেষ প্রান্তে প্রতিবেদক বলেন, কালো টাকা সমস্যার সমাধান অর্থমন্ত্রীর হাতে থাকলেও টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের উপায় জাতি জানতে চায়।

এসময় তোফায়েল আহমেদের কাছে জানতে চাওয়া হয় টিপাইমুখের বাঁধ ইস্যুটি কেন সংসদে আলোচিত হচ্ছে না? এ প্রসংগে তোফায়েল আহমেদ বলছেন, বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত থাকলে টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে সংসদে আলোচনা হতো। তিনি আরও মনে করেন বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোন কিছু গ্রহন না করার ঘোষণা দিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য প্রদান করেছেন সেটিই টিপাইমুখ বাঁধ সংক্রান্ত সকল সংশয় দূর করার জন্য যথেষ্ট। তিনি জানান, টিপাইমুখের বাঁধ পরিদর্শনে বিশেষজ্ঞ এবং সংসদীয় কমিটি যাবে। তিনি আরও জানান, টিপাইমুখের বাঁধ পরিদর্শনের জন্য বিএনপি থেকেও বিশেষজ্ঞ আহবান করা হয়েছে।

মওদুদ আহমেদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সংসদের বাইরে প্রধান জাতীয় ইস্যুর মর্যাদা দিয়েও টিপাইমুখ বাঁধের মতো ইস্যু নিয়ে বিএনপি সংসদে গিয়ে আলোচনা করছে না কেন? মওদুদ আহমেদ বলেন, টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা জাতির কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তিনি মতে টিপাইমুখ বাঁধ সংক্রান্ত যে তথ্যগুলি এদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছে সেগুলি (তথ্য) জনসমক্ষে উপস্থাপন করা উচিত। তিনি টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রীর কিছু মন্তব্যকে দুর্ভাগ্যজনক বলে আখ্যায়িত করেন। তবে তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে না যাওয়ার বক্তব্যটি দেশের জন্য ইতিবাচক। তিনি জানান, টিপাইমুখের বাঁধ পরিদর্শনের জন্য বিএনপি থেকে বিশেষজ্ঞ পাঠানোর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে৻

এরপর মহাজোটের সাংসদ রাশেদ খান মেনন টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে সরকারকে শক্ত ভূমিকা পালন করার যে আহবান জানিয়েছেন সেটি সম্পর্কে তোফায়েল আহমেদের মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বাংলাদেশের স্বার্থ বিরুদ্ধ যেকোন কিছু প্রতিহত করতে সরকার বদ্ধপরিকর৻

ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে (২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত) বিএনপি টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে নিশ্চুপ ছিল এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে মওদুদ আহমেদ বলেন, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রতিটি পর্যায়ে টিপাইমুখের বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, টিপাইমুখের বাঁধ ইস্যুটি বিগত ৬ মাসে যতটা বিকশিত হয়েছে, বর্তমান সরকারের আগের ৭ বছরেও ততটা বিকশিত হতে পারেনি। তিনি মনে করেন টিপাইমুখের বাঁধ ইস্যুটি বর্তমানে কিছুটা পরিপক্কতা পেয়েছে; তাই বিষয়টি নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

এরপর তোফায়েল আহমেদের কাছে জানতে চাওয়া হয় টিপাইমুখের বাঁধ নিয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে? এর উত্তরে তোফায়েল আহমেদ বলেন, টিপাইমুখের বাঁধ পরিদর্শনে যে প্রতিনিধি দল যাবে তাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভারতের সাথে আলোচনা করে বাংলাদেশের পক্ষেই পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এরপর ড. মিজানুর রহমান শেলীর বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে সংসদে এ সপ্তাহে আলোচিত বিষয়াবলীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি তুলে ধরা হয় ‘এ সপ্তাহের স্পট লাইট’ নামক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে ড. মিজানুর রহমান শেলী বলেন, তিনি মনে করেন সাম্প্রতিককালে সংসদে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কালো টাকাকে সাদা করার সুযোগ প্রদান। তিনি মূলতঃ কর ফাঁকি দেয়া অর্থ এবং অপ্রদর্শিত অর্থকেই কালো টাকা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কালো টাকার পরিমাণ ৭ লক্ষ কোটি টাকা। তিনি আরও জানান, টাকা সাদা করার এ সুযোগ দানের মাধ্যমে কালো টাকাকে অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসার একটি চেষ্টা করা হচ্ছে।

এরপরই মি. শেলী আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে স্টুডিওতে যোগ দেন। কালো টাকা বৈধ করা প্রসংগে তিনি বলেন, টাকা সাদা করার বিষয়টি নিয়ে সাংসদদের মধ্যে মতভেদ আছে। তিনি বলেন, কালো টাকা সাদা করার প্রসংগে নৈতিকতার পাশাপাশি বাস্তবতাও বিচার করতে হবে। এছাড়া অপ্রদর্শিত অর্থকে বৈধ করার করহারের (১০ শতাংশ) সাথে নিয়মিত করদাতাদের কর হারের বৈষম্যের নিরসন হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আসলেই অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিনা? - এ প্রশ্নের জবাবে মওদুদ আহমেদ বলেন, তিনি মনে করেন অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ কখনই সাদা হবে না, কিন্তু বৈধভাবে আয়কৃত অর্থের কর ফাঁকি দেয়া হলে সেই অর্থকে সাদা করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। তিনি মনে করেন, এই বৈধকৃত অর্থ উৎপাদনখাতে বিনিয়োগ করলে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। একইসাথে তিনি মনে করেন, কালো টাকা বৈধ করার এই সুযোগ একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দেয়া উচিত।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করার অঙ্গীকার কালো টাকা সাদা করতে দেয়ার সুযোগের সাথে সাংঘর্ষিক কিনা? - এ প্রশ্নের জবাবে তোফায়েল আহমেদ বলেন, তাঁর মতে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং কালো টাকা সাদা করতে দেয়ার সুযোগ প্রদানের বিষয় দুটি পরস্পরবিরোধী নয়। তিনি আরও যোগ করেন, অপ্রদর্শিত অর্থকে আইনের মধ্যে এবং অর্থনীতির বৈধ স্রোতে আনার জন্যই কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে বর্তমান সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এ সুযোগ প্রদান করেছে। অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার বিষয়ে বাজেটে কোন সংশোধনী আসার সুযোগ আছে কিনা? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাঁর ধারণা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বলবৎ থাকবে।

কালো টাকা সাদা করার বিষয়টি কিভাবে দেখছেন? এ প্রশ্নের জবাবে মওদুদ আহমেদ জানান, কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ যতবারই দেয়া হয়েছে ততবারই বিনিয়োগের খাত নির্দিষ্ট করে দেয়া হলেও বর্তমান সরকার বিষয়টিকে সম্প্রসারিত করেছেন।

সবশেষে অতিথিদের সাথে স্টুডিওতে যোগ দেন প্রতিবেদক মাহামুদুল করিম চঞ্চল। সঞ্চালক তার কাছে জানতে চান আগামী সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়গুলি কি কি? মি. চঞ্চল জানান, আগামী সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে সম্ভাব্য মূল আলোচিত বিষয় হবে বাজেট পাশ হওয়া।

অনুষ্ঠানটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয় গত ২৬শে জুন, ২০০৯ রাত সাড়ে দশটায়

সংসদ এ সপ্তাহে প্রযোজনা করেছেন ক্রেইগ স্কট