সাবেক ডেপুটি স্পীকারের সদস্যপদ বাতিলের সুপারিশ

প্রতি সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত বিষয়াবলী নিয়ে আয়োজিত ‘সংসদ এ সপ্তাহে’ এর এবারের পর্বটি অনুষ্ঠিত হয় গত ১০ই জুলাই, ২০০৯ তারিখে। আকবর হোসেনের সঞ্চালনায় সংসদ এ সপ্তাহের এবারের আয়োজনে অতিথি হিসেবে স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অপু উকিল, বিএনপি’র সংসদ সদস্য সৈয়দা আশরাফী পাপিয়া এবং বিশ্লেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা চলতি সপ্তাহে সংসদে আলোচিত বিষয়াবলী ছাড়াও বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এ সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে তাদের বক্তব্য, মতামত প্রদান করেন এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

এ সপ্তাহের সংসদে অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল বিগত সংসদের সাবেক স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার এবং চিফ হুইপের কথিত দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সংসদীয় কমিটি প্রতিবেদন৻ এ সংসদীয় কমিটির প্রধান ফজলে রাব্বী মিঞা তদন্ত প্রতিবেদনটি সংসদে উত্থাপন করেন। তিনি তার তদন্ত প্রতিবেদনে জাতীয় সংসদের স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার এবং চিফ হুইপের মত গুরুত্বপূর্ণ পদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় (ক) সাবেক স্পীকার ব্যারিস্টার মো জমীরউদ্দিন সরকারের সংসদ সদস্যপদ বাতিল করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি (খ) সাবেক ডেপুটি স্পীকার আকতার হামিদ সিদ্দিকী এবং সাবেক চিফ হুইপ খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করার সুপারিশ করেন।

এ বিষয়ে প্রথমেই সৈয়দা আশরাফী পাপিয়ার তাঁর প্রতিক্রিয়ায় সাবেক স্পীকার, সাবেক ডেপুটি স্পীকার এবং সাবেক চিফ হুইপের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে উদ্দেশ্য বহির্ভূত, ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে দাবি করেন। সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে খতিয়ে দেখার কোন প্রয়োজন আছে কিনা? - এ প্রশ্নের জবাবে তিনি সংসদীয় কমিটি কর্তৃক দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তকে এখতিয়ার বহির্ভূত বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, দেশের যেকোন মানুষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করার ক্ষমতা শুধুমাত্র দুর্নীতি দমন কমিশনেরই আছে।

সাবেক সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে সৈয়দা আশরাফী পাপিয়ার মন্তব্যের প্রেক্ষিতে অপু উকিলের মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, সাবেক তিন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করেই প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। সেইসাথে ১৯৯৪ সালে এক সংশোধনীতে সংসদকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করা হয় (ধারা-১৮) জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটি কর্তৃক সাংসদের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত এখতিয়ার বহির্ভূত নয়। অপু উকিলের কাছে আরও জানতে চাওয়া হয় অভিযুক্ত সাবেক তিন সাংসদের বিরুদ্ধে সংসদীয় কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে যে সুপারিশ করা করা হয়েছে তা বাস্তবায়িত হবে কিনা৻ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, অভিযুক্ত সাংসদদের বিরুদ্ধে সংসদীয় তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে।

এরপর সৈয়দা আশরাফী পাপিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয় সরকার যদি অভিযুক্ত সাংসদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলি বাস্তবায়ন করতে যায় তাহলে বিএনপির অবস্থান কি হবে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী (ধারা-৬৬, অনুচ্ছেদ-১ এবং ধারা-৭০, অনুচ্ছেদ-১) কোন সাংসদের সদস্যপদ বাতিল করার এখতিয়ার সংসদ এবং নির্বাচন কমিশনের নেই। সৈয়দা আশরাফী পাপিয়ার দাবির প্রেক্ষিতে অপু উকিল মনে করেন কারোরই নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে দুর্নীতির পক্ষে সাফাই গাওয়া উচিত নয়।

এ সপ্তাহের সংসদ অধিবেশনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বটি।প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে যেকোন সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করতে পারেন।

চলতি সপ্তাহে একজন সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান সোহ্‌রওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় নেতাদের ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে কিনা? আরেকজন সাংসদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান রাজাকারদের জাতীয়ভাবে ঘৃণা করার জন্য কোন একটি বিশেষ দিনকে জাতীয় ঘৃণা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হবে কিনা? এ সময় সাংসদদের মধ্যে থেকে একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, সংসদ ভবন চত্বরের সামনে ওয়াশিংটন মেমোরিয়ালের অনুরূপ বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়ালের মতো কোন স্মৃতিসৌধ তৈরী করার পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা?

অপু উকিলের কাছে জানতে চাওয়া হয় সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগটির কতটুকু সদ্ব্যবহার করেন? এ প্রশ্নের জবাবে অপু উকিল বলেন, প্রত্যেক সাংসদ সবসময় প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার সুযোগ না পেলেও যারা (সাংসদ) এ সুযোগটি পান তারা এ সুযোগটি যথাযথভাবে ব্যবহার করে দেশ ও জাতিকে উপকৃত করেন।

এরপর সৈয়দা আশরাফী পাপিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয় সংসদে অনুপস্থিতির কারণে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কিনা৻ এ প্রশ্নের জবাবে সৈয়দা আশরাফী পাপিয়া বিএনপির সংসদে অনুপস্থিতির কারণে কিছুটা বঞ্চিত হওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি জানান, সংসদে অনুপস্থিত থেকেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত প্রশ্ন জমা দিয়েছিলেন এবং সেই প্রশ্নের আংশিক উত্তরও তিনি পেয়েছেন।

অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে অপু উকিলের কাছে জানতে চাওয়া হয় প্রধানমন্ত্রী বিব্রত হবেন এমনটি ভেবে সরকারদলীয় সাংসদরা কখনও তাকে (প্রধানমন্ত্রীকে) জটিল প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকেন কিনা? এ আশংকাকে (প্রধানমন্ত্রীকে জটিল প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকার) অস্বীকার করে অপু উকিল জানান, মন্ত্রীদের কাছ থেকে যে প্রশ্নগুলির উত্তর পাবার সম্ভাবনা কম; সেই সকল জটিল প্রশ্নগুলিই প্রধানমন্ত্রীকে করা হয়।

সৈয়দা আশরাফী পাপিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বটি বিএনপি কতটুকু কাজে লাগাতে চায়৻ তিনি জানান, প্রশ্নোত্তর পর্বটি প্রধানমন্ত্রীর একটি সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। তিনি এই সুযোগকে (প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব) কাজে লাগানো দরকার বলে মনে করেন।

এরপর আসাদ চৌধুরীর বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে সংসদে এ সপ্তাহে আলোচিত বিষয়াবলীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি তুলে ধরা হয় ‘এ সপ্তাহের স্পট লাইট’ নামক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে আসাদ চৌধুরী প্রথমেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) শাখার উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, সংসদে ৫ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে সাংসদরা সংসদে সময়মতো না আসার ফলে সৃষ্ট কোরাম সংকটের কারণে। তিনি আরও জানান স্পীকার তার বক্তব্যে সাংসদদের দেরি করে সংসদে আসার কথা স্বীকার করেন। তবে স্পীকার সাংসদদের দেরি করে সংসদে আসার বিষয়ে সাংসদদের পক্ষে যে সাফাই দিয়েছেন সেটি সমীচীন হয়নি বলে তিনি মনে করেন। সবশেষে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন সরকারী দলের সাংসদরা দেরি করে হলেও সংসদে যাচ্ছেন, কিন্তু বিরোধী দল কবে সংসদে আসবে?

এরপরই মি. চৌধুরী আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে স্টুডিওতে যোগ দেন। এ সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কোরাম সংকটকে বেছে নেয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, সংসদ একটি শিক্ষণীয় স্থান এবং সেই স্থানের ধারক হিসেবে সাংসদদের উচিত সময় মেনে চলা। তিনি মনে করেন বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত থাকলে সাংসদদের এবং দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পেত এবং কোরাম সংকটের সৃষ্টি হতো না।

সাংসদরা কেন দেরি করে সংসদে হাজির হন? এ প্রশ্নের জবাবে অপু উকিল জানান, বর্তমান সংসদে এখনও পর্যন্ত কোন কোরাম সংকটের সৃষ্টি হয়নি। তিনি আরও জানান টিআইবি’র রিপোর্টটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে করা হয়েছে। এরপর তাকে প্রশ্ন করা হয়; বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় টিআইবি’র দুর্নীতির প্রতিটি রিপোর্টকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখত কেন৻ জবাবে তিনি বলেন, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের দুর্নীতির কথা সর্বজনবিদিত এবং তাদের (বিগত চারদলীয় জোট সরকারের) দুর্নীতির প্রতিবেদন টিআইবি’র প্রতিবেদনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী সংবাদ মাধ্যমেও এসেছিল। এরপর সৈয়দা আশরাফী পাপিয়া কাছে কোরাম সংকটের বিষয়ে তার মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মহাজোটের সাংসদের মধ্যে সংসদকে কার্যকর করার সদিচ্ছা থাকলে বিরোধী দলকে ছাড়াও তারা (মহাজোট) সংসদের কোরাম সংকট দূর করতে পারে।

মি চৌধুরীর কাছে জানতে চাওয়া হয় সংসদের কার্যক্রম নিয়ে সরকার দলীয় সাংসদ এবং বিরোধী দলীয় সাংসদের মধ্যকার পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে তিনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? উত্তরে মি চৌধুরী বলেন, কথায় কথায় অতীতের জের টানা সরকারীদল এবং বিরোধীদলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তিনি মনে করেন সরকারীদল এবং বিরোধীদল উভয়েরই অতীতের জের টানার সংস্কৃতিকে পরিহার করতে হবে। তবে সেজন্য সরকারী দলেরই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

অনুষ্ঠানটি বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয় গত ১০ই জুলাই, ২০০৯ রাত সাড়ে দশটায়

সংসদ এ সপ্তাহে প্রযোজনা করেছেন ক্রেইগ স্কট