বাংলাদেশের রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মীর কাসেম আলীর উত্থান পর্ব

  • আহ্‌রার হোসেন
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
Mir Qasem Ali

ছবির উৎস, Focus Bangla

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে মীর কাসেম আলীর। ফাইল চিত্র।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য হলেও দলে মীর কাসেম আলী গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন অর্থনৈতিক কারণে।

বিশ্লেষকদের মতে, তিনি ব্যবসা বাণিজ্য ভাল বুঝতেন, গড়ে তুলেছেন একের পর এক সফল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

এমনকি বিদেশ থেকে দলের তহবিলে যেসব আর্থিক সহযোগিতা আসত সেগুলোর ব্যবস্থাপনা ও বিলি বণ্টন করার দায়িত্বও ছিল তার।

মীর কাসেম আলীর উনিশশ পঞ্চাশের দশকে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জে জন্ম। পিতার কর্মসূত্র ছিলেন চট্টগ্রামে।

ষাটের দশকের শেষভাগে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময়েই তিনি জামায়াতে ইসলামীর সেসময়কার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘে যোগ দেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেসব তথ্য প্রমাণ উঠে এসেছে তাতে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষভাগে মি. আলী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক হন।

সেসময় আল বদর বাহিনীরও একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে যান ।

উনিশশ' পঁচাত্তর সালে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তিনি আবার ফিরে আসেন বাংলাদেশে।

ফিরে এসে তিনি নিয়োজিত হন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনটিকে পুনর্গঠনের কাজে।

ছবির ক্যাপশান,

মীর কাসেম আলী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

তিনি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামী ছাত্র সংঘের পরিবর্তিত রূপ ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রথম সভাপতি।

সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক সালাহউদ্দীন বাবরের চোখে যে দুটি কারণে জামায়াতের রাজনীতিতে মি. আলীর গুরুত্ব অপরিসীম তার একটি হল এই ছাত্র শিবিরকে প্রতিষ্ঠা করা।

আর দ্বিতীয় কারণটি হল অর্থনৈতিক।

"উনি ভাল একজন সংগঠক। অনেক প্রতিষ্ঠানকে উনি গড়ে তুলেছেন", বলছিলেন মি. বাবর।

আশির দশক থেকেই নানারকম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন মীর কাসেম আলী।

যুক্ত ছিলেন ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা, কেয়ারি লিমিটেড, ফুয়াদ আল খতিব, রাবিতা আলম আল ইসলামি, দিগন্ত মিডিয়ার মত সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সাথে।

অল্পদিনেই এসব প্রতিষ্ঠানকে জনপ্রিয় ও লাভজনক করে তোলার পেছনে ছিল মি. আলীর ভূমিকা।

এসব কারণে জামায়াতের ইসলামীর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিতি ছিল তার।

ছবির উৎস, Ibn Sina Trust

ছবির ক্যাপশান,

ইবনে সিনা ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে ট্রাস্টি বোর্ডে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে উল্লেখিত ট্রাস্ট্রি বোর্ডের সদস্যদের তালিকায় এখন আর মীর কাসেম আলীর নাম নেই।

সিনিয়র সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবির বলছেন, "আমি শুনেছি, প্রায় চল্লিশটির মত প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি নানাভাবে জড়িত ছিলেন"।

দলের তহবিলে বিদেশ থেকে যে আর্থিক সাহায্য আসত তার দেখভাল, বিলি-বণ্টন ও নানান ব্যবসায় খাটিয়ে বাড়িয়ে তোলার দায়িত্বও মি. আলী পালন করতেন বলে উল্লেখ করছেন আমানুল্লাহ কবির।

যে ব্যক্তিটির অর্থনৈতিক প্রভাব একটি দলে এত ব্যাপক, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রভাব দলটিতে কি হবে?

আমানুল্লাহ কবির বলছেন, কোন প্রভাবই পড়বে না।

"আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে মীর কাসেম আলীর অনুপস্থিতিতেও সেগুলো ঠিকভাবে চলবে"।

"কাজেই তার মৃত্যুর পরে জামায়াত দুর্বল হয়ে যাবে বা অর্থায়নের ব্যাপারটি বিঘ্নিত হবে, এটা মনে করার কোন কারণ আছে বলে আমি মনে করি না", বলছেন মি. কবির।

ছবির উৎস, Islami Bank

ছবির ক্যাপশান,

প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হওয়া সত্বেও অনেকদিন ধরেই ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নেই মীর কাসেম আলী।

২০১২ সালের জুন মাসে গ্রেপ্তার হবার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পর্যন্ত আর কখনোই মুক্তি পাননি মীর কাসেম আলী।

সময়ের মধ্যে নিজের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো দেখভাল করার কোন সুযোগ তার ছিল না, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতেও হয়েছে তাকে।

কিন্তু দেখা গেছে প্রতিষ্ঠানগুলো ভালভাবেই চলেছে এবং এগুলোর আয় রোজগারেও কোন ব্যত্যয় তৈরি হয়নি।