ইতিহাসের সাক্ষী: পেরুর বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাকরণ
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

সরকারি কর্মসূচির ক্ষত এখনও কীভাবে বয়ে বেড়াচ্ছেন বন্ধ্যা নারীরা

১৯৯০এর দশকের শেষ দিকে পেরু সরকারের নেওয়া বিতর্কিত এক পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির আওতায় দুই লক্ষ ৬০ হাজার মহিলাকে বন্ধ্যা করা হয়েছিল।

সরকারি চিকিৎসকরা ৪ বছর ধরে ওই মহিলাদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বন্ধ্যাত্বে বাধ্য করেছিলেন।

১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে দক্ষিণ পেরুর প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় চতুর্থ সন্তানের জন্ম দেওয়া এক নারী ফেলিসিয়া মামানিকন্সাকে জোর করে যখন বন্ধ্যাত্ব অস্ত্রোপচারে বাধ্য করা হয়েছিল তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর ।

দরিদ্র কেচুয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের নারী ফেলিসিয়া ইতিহাসের সাক্ষী অনুষ্ঠানে বর্ণনা করেছেন তার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা।

তিনি বলেছেন অসুস্থ বাচ্চার চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাওয়ার পর কীভাবে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। শিশুকে চিকিৎসা দেওয়ার বদলে কীভাবে তাকে ঠাণ্ডা জলে স্নান করিয়ে অপারেশনের জন্য তৈরি হতে বলেছিলেন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নার্সরা।

তিনি বলেছিলেন তিনি পালাতে চেয়েছিলেন । কিন্তু রাস্তার দিকে বেরনোর মূল দরজাটা বন্ধ ছিল।

''একটা ঘরে অনেক মহিলা মাটিতে গদির ওপর শুয়েছিল। বাকিরা ছিল বিছানায়। নার্সরা আমাকে অজ্ঞান করার জন্য ওষুধ দিয়েছিল, কিন্তু সে ওষুধ কাজ করে নি, ফলে ওরা যখন আমার ওপর অস্ত্রোপচার শুরু করল, তখন আমি ছিলাম জাগা - পুরো জ্ঞান ছিল আমার। যা কিছু হচ্ছিল, আমি সব দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি ডাক্তারের কাছে অভিযোগ করলাম- আমার রক্তপাত হচ্ছে- অনেক রক্তপাত হচ্ছে। ডাক্তার বললেন - না- কিচ্ছু হচ্ছে না- চিন্তা করার কিছু নেই। তিনি বললেন আর তোমার বাচ্চা হবে না- তুমি সরকারকে ধন্যবাদ দাও।''

এধরনর নাটকীয় অভিজ্ঞতা শুধু ফেলিসিয়ার একারই হয়নি ।

পেরুর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দুই লাখ ৬০ হাজার মহিলাকে বন্ধ্যা করা হয়েছিল। এদের অনেকেই ছিলেন ফেলিসিয়ার মত গরীব আদিবাসী মহিলা। আর ফেলিসিয়ার মত অনেকেরই বন্ধ্যাকরণ হয়েছিল তাদের মতের বিরুদ্ধে - কোনরকম আলাপ আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়াই।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption দুর্নীতির অভিযোগে আদালতে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুহিমোরি

১৯৯৫ সালে পেরুর জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুহিমোরির বিতর্কিত পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির অংশ হিসাবে এসব অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্টের যুক্তি ছিল পরিবার পরিকল্পনা তার দারিদ্র দূরীকরণ কৌশলের মূল ভিত।

প্রথমদিকে তার এই পরিকল্পনাকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানানো হয়েছিল। যদিও পেরুর রোমান ক্যাথলিক গির্জা এই কর্মসূচির তীব্র বিরোধিতা করেছিল।

কিছুদিনের মধ্যেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে সফল করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী, নার্স এমনকী ডাক্তাররাও বন্ধ্যাকরণের জন্য সম্ভাব্য মহিলা খুঁজে বের করছেন- তাদের উদ্দেশ্য একটাই- সরকারের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ।

উত্তর পেরুর ছোট একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তার রোহেলিও দেল- কারমে মার্তিনেজ অনুঠানে বলেছেন তিনি প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে পারেন নি। তাকে ও তার টিমকেও দু সপ্তাহে আড়াইশ' মহিলাকে বন্ধ্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন তার ঊর্ধ্বতন অফিসারের কাছে। ডা: মার্টিনেজ ছিলেন পুরোন এবং সিনিয়ার ডাক্তার- তাই তার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাকরণের জন্য চাপ তিনি আমলে নেন নি।

কিন্তু তিনি বলছেন অন্য ডাক্তার ও নার্সরা চাকরি হারানোর ভয়ে এই নির্দেশ অগ্রাহ্য করতে পারেন নি।

''এমন সব কেন্দ্রে মহিলাদের অস্ত্রোপচার করে বন্ধ্যা করা হচ্ছিল, যেখানে অপারেশনের জন্য উপযুক্ত ঘরই নেই। অপারেশনের কোনো ব্যবস্থা বা সরঞ্জাম নেই। চেতনানাশক ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এসব মহিলার অপারেশন করা হয়েছে। রাজধানী লিমায় ডাক্তারদের দ্রুত দিনকয়েকের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল অপারেশন করতে। আমি আমার বসকে সোজা বলে দিয়েছিলাম আমার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এসব করা চলবে না।'' বলেছেন ডা: মার্টিনেজ।

এক বছরের মধ্যে কাজে ইস্তফা দেন ডা: মার্টিনেজ।

তিন বছর পর ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট ফুহিমোরিকে দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।

পেরুর কৌঁসুলিরা বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাকরণের অভিযোগ তদন্ত করতে শুরু করেন। কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে সেই তদন্ত থমকে যায়।

গত বছর পেরুর নতুন সরকার আবার সেইসব মামলার তদন্ত নতুন করে শুরু করেছে এবং বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাকরণের শিকার যারা হয়েছিলেন তাদের তালিকা তৈরি করছে। তাদের সরকারি ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু ফেলিসিয়া মামানিকন্সা বলছেন তার মত মেয়েদের জোর করে বন্ধ্যা করে দেওয়ার কারণে অনেকের সংসার ভেঙে গেছে, স্বামীদের কাছে চরিত্র নিয়ে অনেক অসম্মানের কথা শুনতে হয়েছে।

তিনি বলেছেন এই যে সম্মানহানি - অর্থের বিনিময়ে সে কী আমরা আর কখনও ফিরে পাবো?

ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্ব পরিবেশন করেছেন মানসী বড়ুয়া।

সম্পর্কিত বিষয়