“কার হাতে থুইয়া গেলারে, হায়রে স্বামী”

টাঙ্গাইলে বয়লার বিষ্ফোরণ
Image caption স্বামীর ছবি হাতে নিয়ে বিলাপ করছেন টাঙ্গাইলের নুরুন্নাহার। পাশে তার ননদ।

ঈদ করতে শনিবারই টাঙ্গাইলের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা জহিরুল ইসলামের।

শুক্রবার রাতের পালায় টঙ্গীর টাম্পাকো নামের প্যাকেজিং কারখানায় কাজ করছিলেন তিনি।

সকালে কাজ শেষেই বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবেন।

টাঙ্গাইলে তার অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী নুরুন্নাহার ও ছয় বছরের শিশুকন্যা।

সকালে বয়লার বিস্ফোরণের ফলে আগুন ধরে যাওয়ার পর থেকেই আর খোঁজ নেই মি. ইসলামের।

তাই স্বামীকে খুঁজতে ঢাকায় চলে এসেছেন নুরুন্নাহার।

গতকাল রাতভর ঢাকার হাসপাতালে হাসপাতালে ছুটে বেরিয়েছেন।

কোথাও খুঁজে না পেয়ে দুপুরবেলা টঙ্গী স্টেশন রোডের একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বিলাপ করছিলেন।

হাতে স্বামীর লেমিনেটিং করা একটি রঙিন ছবি।

এই প্রতিবেদনের শিরোনাম তার বিলাপেরই ভাষা।

Image caption রাজেশের পরিবারের লোকজন তার ছবি হাতে বসে আছে। বাড়িতে রাজেশের স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

আরেকটু দূরে আহসানউল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভারের একটি পিলারের গোঁড়ায় বেশ কয়েকজন মানুষ।

নারী এবং পুরুষ।

সবার হাতে একটি করে ছবি।

একই ব্যক্তির ছবি।

এই ব্যক্তিটির নাম রাজেশ বাবু।

তিনি ছিল টাম্পাকোর একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী।

সকালের পালায় কাজ করবার জন্য একটু আগে ভাগেই কারখানায় গিয়েছিলেন তিনি।

তিনিও দুর্ঘটনায় নিখোঁজদের একজন।

"বাংলাদেশ মেডিকেল, টঙ্গী মেডিকেল, কুর্মিটোলা, ঢাকা মেডিকেল—কোনো জায়গা বাদ দিইনি। সারারাত আমরা খুঁজেছি। সারা রাত। নাই আমার বাচ্চা"। আমাকে বলছিলেন আর বিলাপ করছিলেন রাজেশের মা মীনা রানী।

"এখন একটু আমাগো ঢুকতে দেন। একটু হাতায় মাতায় দেখি। কিচ্ছুতো পাব। একটু মনকে বুঝ দিমু। এইহানে বইয়া কী করি? সবাইরে দেখি। আমার বাচ্চারে তো দেখি না"।

মীনা রানী জানাচ্ছেন, বাড়িতে রাজেশের স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

তিনি একটু পর পর স্বামীর খোঁজ করছেন, আর না পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন।

"কী জবাব দেব বউয়ের কাছে, কন আপনারা? আমি তো এখানে ফকিরের মত বইয়া রইছি। লজ্জায় ঘরে যাইতেছি না"। বলছেন মীনা রানী।

Image caption টাম্পাকোর অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজদের সঠিক সংখ্যা অজানা।

ভবনটির ভেতরে ঠিক কি পরিমাণে মানুষ আটকা পড়েছে তা স্পষ্ট নয়, জহিরুল ইসলামের স্ত্রী বা রাজেশের মায়ের মত আরও কিছু মানুষকে ছবি হাতে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে কারখানাটির আশপাশে।

দুর্ঘটনাস্থলের কাছে একটি সরকারি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে গাজীপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হাশেম বলছেন, তারা ১০ জন নিখোঁজ ব্যক্তির বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেছেন।

তবে কারখানাটির একজন পুরনো কর্মী রফিকুল ইসলামের ভাষ্যমতে তার হিসেবেই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে ধসে পড়া ভবনটির ভেতরে অন্তত ৫০ জন মানুষ আটকে পড়েছে, যাদের কোন খোঁজ নেই।

রফিকুল ইসলামের চাচা মোহাম্মদ ইসমাইলও কারখানাটির একজন পুরনো কর্মী এবং দুর্ঘটনার সময় তিনি কারখানাটির ভেতরেই ছিলেন।

তাকেও এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।

রফিকুল ইসলামের ধারণা, তার চাচা-সহ বাকী যারা নিখোঁজ রয়েছেন তাদের সবাইই কারখানাটির ভেতরে আটকে পড়েছেন।

৩৬ ঘণ্টার বেশী সময় ধরে যে ভবনটিতে আগুন জ্বলছে, যে ভবনটির বেশীরভাগ অংশই ধসে পড়েছে, সেই ভবনটির ভেতরে যদি কোন মানুষ আটকে পড়ে তাদের ভাগ্যে কি ঘটে থাকতে পারে?

বলবার অপেক্ষা রাখে না!

সম্পর্কিত বিষয়