টঙ্গীতে আগুনে বিধ্বস্ত কারখানার নিচে এখনও লাশ থাকার আশঙ্কা

  • আহ্‌রার হোসেন
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ট্যাম্পাকো কারখানায় আগুন লাগার পর

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান,

ট্যাম্পাকো কারখানায় আগুন লাগার পর এখনও সেখানে ভেতরে ভেতরে আগুন জ্বলছে বলছেন দমকল কর্মীরা। (ফাইল চিত্র- ১০ই সেপ্টম্বর)

বাংলাদেশে ঢাকার কাছে টঙ্গীতে একটি বহুতল কারখানা ভবনে গত শনিবার বয়লার বিস্ফোরণের জেরে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধসের পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত সেখানে উদ্ধার তৎপরতা শেষ করা যায়নি।

কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্ধার তৎপরতায় দমকল বাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছে সেনাবাহিনী।

তারা বলছেন ধসে পড়া পুরো ভবনটির ভেতরে আর কোন মৃতদেহ আছে কিনা তা খুঁজে দেখতে আরো দু-একদিন সময় লাগবে।

এদিকে, এই দুর্ঘটনায় যারা নিখোঁজ রয়েছেন তাদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা এখন ছেড়ে দিয়েছেন তাদের স্বজনেরা।

টঙ্গির ট্যাম্পাকো প্যাকেজিং কারখানায় রাতের পালায় কাজ শেষে গত শনিবার সকালবেলা বেরিয়ে আসার কথা ছিল চুন্নু মোল্লার।

কিন্তু বয়লার বিস্ফোরণের মধ্যে দিয়ে কারখানাটিতে একটি ব্যাপক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে চুন্নু মোল্লা নিখোঁজ।

সেই থেকে এখন পর্যন্ত ফরিদপুরে থাকা চুন্নুর পরিবারের সদস্যরা পালা করে কেউ না কেউ টঙ্গি এসে থাকছেন, ছবি হাতে ঘোরাঘুরি করছেন টাম্পাকোর ধ্বংসস্তুপের আশপাশে।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান,

বহু পরিবারের স্বজনেরা এখনও নিখোঁজ।

আজ শনিবার অষ্টম দিনে চুন্নুর বোনজামাই সবুর মোল্লা বিবিসি বাংলাকে বল্লেন, চুন্নুকে জীবিত ফেরত পাওয়ার কোন আশা তারা আর দেখছেন না।

"আমরা নিজের চোখে যারা দেখছি আমরা ভাবতেছি হয়ত সে আর নাই।"

"সে এতটা বে-আক্কেলে না, বেঁচে থাকলে এত বড় একটা ঘটনা টাম্পাকোতে ঘটছে- সে মা-বাবাকে অন্ততপক্ষে জানাবে না।"

আর সেজন্যই তিনি মনে করছেন চুন্নু আর বেঁচে নেই। তবে চুন্নুর বাবামার এখনও আশা ছেলে বেঁচে আছে -এবং সে ফিরে আসবে।

"তারা বলে একটু খোঁজাখুঁজি করো, ওর সন্ধান মিলবে- আমার চুন্নু আসবেই। "

তবে এখন পর্যন্ত ওই দুর্ঘটনায় নিহত যে ৩৪ জনের মৃতদেহ মিলেছে তার মধ্যে চুন্নুকে পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সনাক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ছটি বিকৃত, প্রায় অঙ্গার হয়ে যাওয়া মৃতদেহের মধ্যে চুন্নু আছে কী না, তা জানতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন।

ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পরেই এই পরীক্ষা হওয়ার কথা।

একই পরীক্ষার অপেক্ষায় আছেন লক্ষ্মীপুরের আবু তাহের। তার বাইশ বছরের ছেলে রিয়াদ হোসেন মুরাদও নিখোঁজ টাম্পাকো দুর্ঘটনায়।

"ওর ডিএনএ টেস্ট করবে - এই আশায় আছি," বলছেন আবু তাহের ।

অগ্নিকাণ্ড শুরু হওয়ার পরদিন বিকেল নাগাদই ধসে পড়েছিল বিরাটাকায় কারখানা ভবনটির বেশীরভাগ অংশ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

অগ্নিকাণ্ড শুরু হওয়ার পরদিন বিকেল নাগাদই ধসে পড়েছিল বিরাটাকায় কারখানা ভবনটির বেশীরভাগ অংশ।

তৃতীয়দিন থেকে দমকল বাহিনীর সাথে উদ্ধার তৎপরতায় যোগ দেয় সেনাবাহিনী।

আজ শনিবার অষ্টম দিন এসেও সেই উদ্ধার তৎপরতা চলছে।

গতকালও ধ্বংসস্তুপের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠতে দেখেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

আজও দেখা গেছে ধোঁয়া।

গাজীপুরের স্থানীয় সাংবাদিক, বেসরকারি এনটিভির জেলা প্রতিনিধি নাসির আহমেদ টঙ্গী থেকে ঘটনাস্থলের একটি চিত্র দিয়ে জানান ভিতর থেকে লাশের দুর্গন্ধ বেরচ্ছে।

তিনি বলছেন সেনাবাহিনী এবং দমকলকর্মীরা নাকে মাস্ক পরে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছে এবং কারখানার উপরের অংশ ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে।

"লাশগুলো ভবনে ধ্বংসস্তুপের অনেক নিচে আছে। আমার মনে হয় যেহেতু ভেতর থেকে দুর্গন্ধ আসছে- ভেতরে মৃতদেহ অবশ্যই আছে। "

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এখনও কেন ওই কারখানায় উদ্ধার তৎপরতা শেষ হচ্ছে না? আগুনই বা কেন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না?

দমকল বাহিনীর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান বলছেন দাহ্য পদার্থগুলো যখন স্তরে স্তরে ভেঙে পড়েছে তখন সেগুলোর মধ্যে নানা রাসায়নিক আটকে পড়েছে।

"এগুলোর ভেতরে পানি পৌঁছতে পারে নি। যখনই এগুলো নাড়া দেওয়া হচ্ছে, তখনই এই অতি দাহ্য রাসয়নিকগুলো আবার জ্বলে উঠছে। সেখানে আগুন ধুঁকে ধুঁকে জ্বলছে।"

মিঃ খান বলছেন সে কারণেই এই আগুনকে আয়ত্তে আনতে তাদের সময় লাগছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

১০ই সেপ্টেম্বর ভোরে একটি বয়লার বিস্ফোরণের পর টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরী এলাকার ট্যাম্পাকো নামের এই বহুতল প্যাকেজিং কারখানাটিতে আগুন ধরে যায়।

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দেয়া তথ্য মোতাবেক টাম্পাকো দুর্ঘটনায় এখও দশ জনের মতো মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।

গত শনিবার ভোরে একটি বয়লার বিস্ফোরণের পর টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরী এলাকার ট্যাম্পাকো নামের এই বহুতল প্যাকেজিং কারখানাটিতে আগুন ধরে যায়।

টানা অগ্নিকাণ্ডের এক পর্যায়ে ভবনটির অধিকাংশই ধসে পড়ে।

কারখানাটিতে ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোবাকো কোম্পানির সিগারেটের প্যাকেটের রাংতা, বাংলাদেশের ইস্পহানী ও প্রাণের মতো নামজাদা প্রতিষ্ঠানের খাদ্যপণ্যের মোড়কসহ নানাবিধ ফয়েল পেপার ও প্যাকেজিংয়ের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রস্তুত করা হতো।

কারখানাটিতে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা তিনটি পালায় কাজ চলত এবং এর দুটি বয়লার অব্যাহত ভাবে চলত বলে জানা যাচ্ছে।

এই দুর্ঘটনার জের ধরে কারখানাটির মালিকসহ আটজনের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।