বিবিসি বাংলার মুখোমুখি হয়েছিলেন শিমন পেরেস

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption শিমন পেরেসের সঙ্গে ২০০৬ সালে কথা বলেছিলেন বিবিসি বাংলার শাকিল আনোয়ার।

ফিলিস্তিনী সংকট নিয়ে ডকুমেন্টারি সিরিজ করার সময় ইসরায়েলে গিয়ে শিমন পেরেসের সঙ্গে সামনাসামনি সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল আমার । শিমন পেরেস তখন ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকদের একজন।

সময়টা ছিল ২০০৬ সালের মার্চ মাস। ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন। বিরোধী লেবার পার্টি থেকে শিমন পেরেস এহুদ ওলামার্টের ক্ষমতাসীন কাদিমা পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। দল আবার জিতলে তিনি প্রেসিডেন্ট হবেন।

এরকম বোঝাপড়া করেছেন বলে দল বদল করেছেন তিনি -এ নিয়ে তখন বিতর্ক চলছিল। ফলে সাংবাদিকরা সারাক্ষণ তার সাক্ষাৎকারের জন্য চেষ্টা করছিল।

আমিও সাক্ষাৎকারে জন্য তাকে অ্যাপ্রোচ করেছিলাম, কিন্তু ভাবিনি আমাকে তিনি সময় দেবেন।

একদিন আমার মোবাইল ফোনে কল পেলাম। শিমন পেরেসের অফিস থেকে একজন বললেন আগামীকাল দুপুর দেড়টায় আসুন আপনি। আমাকে সময় দিয়েছেন শুনে জেরুজালেমে বিবিসি ব্যুরোর অনেকেই অবাক হয়েছিলেন।

অফিসে ঢোকার মুখেই বেশ বড় বুদ্ধ মূর্তি। জাপান সফরে গিয়ে উপহার পেয়েছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর তার চেম্বারে ডাকলেন। এত বড় আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, নোবেল জয়ী। আমি কিছুটা 'ওভারহোয়েলমড' ছিলাম, চাপ ছিল একটু, আমার প্রশ্নগুলো বুদ্ধিদিপ্ত হবে কীনা।

বেশ আন্তরিকতা দেখিয়েছিলেন। ভারিক্কী চেহারা। আস্তে কথা বলেন। নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে সোফায় নিয়ে বসেছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে চাপ কমে গিয়েছিল। ছবি তুলতে পারবো কীনা - শুনে নিজে একজন স্টাফকে ডেকে এনে আমার সাথে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিলেন।

ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তি প্রক্রিয়ার মূল উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন শিমন পেরেস। বলা হয়ে থাকে, এই শান্তি প্রক্রিয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে আশাবাদী ইসরায়েলী নেতাদের একজন ছিলেন তিনি। কিন্তু কেন তাদের এই শান্তি প্রক্রিয়া পরে আর কাজ করল না- জিজ্ঞেস করেছিলাম।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ফিলিস্তিনীদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ১৯৯৪ সালে ইয়াসের আরাফাতের সঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন শিমন পেরেস।

যে চুক্তি করে তিনি নোবলে পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেটিই ভেস্তে গেছে। তিনি কি এখন অনেুশোচনা করেন?

আমার এ প্রশ্নে সাথে সাথে বলেছিলেন একবারেই ভুল ছিলনা। তার উত্তর ছিল - ঐ চুক্তির বিকল্প ছিল সন্ত্রাস এবং যুদ্ধ।

এখন ফিলিস্তিনে যে সরকার সেটা হয়েছে ঐ চুক্তির জন্য। তাদের যে সীমানা, সেটাও অসলো চুক্তির জন্য। ৫০ শতাংশ ফিলিস্তিনী যে এখন সংঘাত চায়না, সেটা্ও ঐ চুক্তির জন্য। ইসরায়েলের সিংহভাগ মানুষও যে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় সেটাও অসলো চুক্তির জন্য - বলেছিলেন শিমন পেরেস।

কিন্তু তারপরও তো থেকে থেকেই যুদ্ধ হচ্ছে। শান্তি তো আসেনি? ফিলিস্তিনীদের দূরে রাখতে দেওয়াল তুলতে হচ্ছে? - এ যুক্তি অস্বীকার করেন নি মি: পেরেস।

আমার মনে আছে মি: পেরেস বলার চেষ্টা করেছিলেন নেতৃত্বের অভাব ফিলিস্তিনীদের ট্রাজেডি (ঐ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন) - তারা নেতৃত্ব পায়নি।

তিনি আমাকে বলেছিলেন অনেক বিদ্রোহীরাও জাতিকে পথ দেখিয়েছেন, অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনের কথা বলেছিলেন, গান্ধীর কথা বলেছিলেন। ফিলিস্তিনীরা তেমন কোনো নেতা পায়নি যিনি তাদের ঐক্যবদ্ধ করে সাহসী একটি সিদ্ধান্ত নেবেন।

ইসরায়েলের কোন দায় নেই?

শিমন পেরেস আমার এ প্রশ্নের উত্তরে স্বীকার করেছিলেন দায় হয়তো আছে। কিন্তু প্রধান দায় কোনো জাতির নিজের।

ইসরায়েলী - ফিলিস্তিনী সংঘাতের যে কোন শেষ দেখা যাচ্ছে না, এ নিয়ে তার ভাবনা জানতে চেয়ে বুঝতে পেরেছিলাম শিমন পেরেস একজন পুরোদস্তুর জায়োনিস্ট। ইসরায়েলী রাষ্ট্রের কট্টর একজন সমর্থক।

তার একটি বাক্য আমার স্পষ্ট মনে আছে - বলেছিলেন যুদ্ধ করে আরবরা ইসরায়েলের কাছ থেকে কিছু পায়নি। যা তারা পেয়েছে তা শুধু মীমাংসার টেবিলে বসে।

তার কথা ছিল সহিংসতা করে ইয়াসের আরাফাত এবং ফিলিস্তিনীরা ভুল করেছে। মীমাংসার পথে গেলে তারা আরও আগেই রাষ্ট্র পেত।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ইসরায়েলী - ফিলিস্তিনী সংঘাতের যে কোন শেষ দেখা যাচ্ছে না।

ফিলিস্তিনীদের মধ্যে তার ব্যাপারে মনোভাব কি ছিল?

বিভিন্ন ফিলিস্তিনী শহরে আজ যদি মানুষের প্রতিক্রিয়া শোনেন - শুনবেন তারা বলছে - "শিমন পেরেসের হাতে রক্তের দাগ। তিনি শিশু হত্যাকারী।"

দশ বছর আগেও রামাল্লা, নাবলুস বা গাযায় একই ধরণের কথা আমি শুনেছি।

"তিনি শান্তি শান্তি করেন, কিন্তু গাযায় বোমা হামলা বা পশ্চিম তীরে দেয়াল বা অধিকৃত অবৈধ ইহুদি বসতির বিরুদ্ধে তো তিনি কখনও সোচ্চার হননি।"

ফিলিস্তিনীরা আসলেই তাকে শান্তির পক্ষের লোক বলে ভাবত না।

তবে একইসাথে, ইসরায়েলের যারা কট্টরপন্থী , তারাও শিমন পেরেসকে পছন্দ করতেন না। তাদেরও কথা ছিল তিনি ইসরায়েলের শত্রুদের সাথে চুক্তি করেছিলেন।

সম্পর্কিত বিষয়