আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের গুদাম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প জনজীবন হুমকীতে ফেলেছে

Image caption অগ্নিকাণ্ডে বিধ্বস্ত টাম্পাকো কারখানা।

বাংলাদেশে সম্প্রতি টঙ্গির একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৩৯জন শ্রমিক নিহত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস বলছে সে কারখানাটিতে রাসায়নিক পদার্থ থাকায় আগুন ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল।

এ অগ্নিকাণ্ডে আশপাশের কয়েকটি বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন শিল্প কারখানার পাশে বসবাসের ঘর-বাড়ি তৈরি করা এবং আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের গুদামসহ ঝুঁকিপূর্ণ ছোটখাটো শিল্প গড়ে উঠেছে।

এ পরিস্থিতি জনজীবনের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

টঙ্গির বিসিক শিল্প এলাকা ঘেঁষে পূর্ব আরিচ পাড়া মহল্লা। এখনকার অধিকাংশ বাড়ি টিনের তৈরি। এ বাড়িগুলোর পাশেই অনেক শিল্প কারখানা দেখা যাচ্ছে।

এ শিল্প কারখানাগুলোর অনেক কাঁচামাল এ এলাকায় রাখা হয়। সম্প্রতি টাম্পাকো কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর এ এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

আরিচ পাড়ার বাসিন্দা শাহিনুর আক্তার বলছেন শিল্প কারখানার পাশেই তার বাড়ি হওয়ায় যে কোন সময় দুর্ঘটনা নিয়ে তিনি আতঙ্কে থাকেন। তিনি বলছেন, টাম্পাকো কারখানায় বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ড তার মনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

শাহিনুর আক্তার বলেন, " এই খানে শিল্প এলাকা হওয়ার আগেই আমাদের বাড়ি ছিল। শিল্প এলাকা হইছে পরে। এখন আমরা কোথায় যাব? আমাদের পুরা এলাকায় কেমিক্যালের গুদাম আছে । "

শিল্প কারখানার পাশেই বাড়ি হওয়ায় এক সময় অনেকে বেশ খুশি হয়েছিলেন। দুর্ঘটনা নিয়ে কোন চিন্তা কারো মাঝেই ছিল না। যারা ভাড়া থাকেন তারাও এসব বাড়িকে সুবিধাজনক হিসেবেই মনে করতেন।

Image caption শাহিনুর আক্তার, টঙ্গির বাসিন্দা।

আর যারা বাড়ির মালিক তারা বেশি ভাড়া পাওয়ায় বেশ খুশি ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা সামিউল ইসলাম বলছেন টাম্পাকো কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের আগে এ বিষয়গুলো নিয়ে তাদের মাঝে কোন চিন্তা ছিলনা।

সামিউল ইসলাম বর্ণনায়, " আতংক তো ইদানিং হচ্ছে। যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে না? কারখানার পাশে বাড়ি থাকায় আমাদের সুবিধা আছে। কিন্তু একই সাথে আতংকও আছে।"

যেসব জায়গা শিল্প এলাকা হিসেবে স্বীকৃত, শুধু সেসব জায়গা ঘেঁষেই যে বাড়ি ঘর আছে তা নয়।

ঢাকা শহরের ভেতরে আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত বহু জায়গায় বাড়ির নিচে কিংবা জনবসতি ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের ছোটখাটো শিল্প।

এসব জায়গায় কোন দুর্ঘটনা হলে সেটি মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।

Image caption টাম্পাকো কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার তৎপরতায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

ঢাকার এটি মিরপুরে কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেল অনেক বাড়ির নিচে দেখা যাচ্ছে নানা ধরনের ছোটখাটো শিল্প গড়ে উঠেছে।

যেমন ওয়েল্ডিং কারখানা, গ্যাস কার্টার দিয়ে লোহার পাত কাটার দোকান - আরো নানা ধরনের দোকান।

এসব দোকানে যে কোন ধরনের দুর্ঘটনা বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।

মিরপুরের বিশিল এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, " আমরা যে চিপার ভিতরে থাকি, ভালো একটা রাস্তাও নাই। অনেক টেনশনে থাকি আমরা। উপায় নাই। এখান থেকে কাজে যাওয়া সহজ। এজন্য বাসা ভাড়া নিছি।"

আবাসিক এলাকায় যে কোন ধরনের ছোটখাটো কারখানা - অর্থাৎ যেখান থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হতে পারে, সেগুলো নিয়ে অনেক মানুষের মধ্যেই কোন সচেতনতা নেই।

Image caption পুরনো ঢাকার একজন কেমিক্যাল ব্যবসায়ী।

ভাড়াটিয়ারা বক্তব্য হচ্ছে - এনিয়ে তাদের কোন করনীয় নেই। কিন্তু যারা বাড়ির মালিক তারা কেন আবাসিক বিল্ডিংয়ের নিচে ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প ভাড়া দিচ্ছেন?

মিরপুরের একজন বাড়ির মালিক বলছিলেন, " এইটা তেমন কোন সমস্যা হয়না। যারা এগুলো নিয়ে কাজ করে, তাদের সমস্যা। আমাদের তো সমস্যা নাই।"

প্রায় ছয় বছর আগে ঢাকার পুরনো অংশে নিমতলীর এক বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে ১১৭জন নিহত হয়েছিলেন। বলা হয়েছিল, সে বাড়ির নিচে রাসায়নিক পদার্থের গুদাম থাকায় আগুণ বেশ দ্রুত ছড়িয়েছিল।

সে ঘটনার পর ঢাকার পুরনো অংশে বাড়ির নিচ থেকে রাসায়নিক পদার্থের গুদাম সরিয়ে নেবার জন্য অনেকেই আন্দোলন করেছিল।

পুরনো ঢাকার আরমানিটোলা এলাকা ঘুরে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ বাড়ির নিচে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থের গুদাম।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসেব অনুযায়ী ঢাকার পুরনো অংশে এ ধরনের কয়েক হাজার দোকান আছে। বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ব্যবহারের জন্য এসব রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়।

Image caption আবু নাসের খান, পরিবেশবাদী।

আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক পদার্থের দোকানসহ অন্য যে কোন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প সরিয়ে নিতে আন্দোলন করেছিল পরিবেশবাদীরা।

কিন্তু ছয় বছরেও এর কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আবু নাসের খান বলছেন, আবাসিক এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পগুলোর দিকে যেমন নজর দিতে হবে, তেমনি বড় কারখানায় রাসায়নিক পদার্থের ব্যবস্থাপনা যেন দক্ষতার সাথে করা হয় সেদিকেও নজরদারী বাড়ানো দরকার।

আবু নাসের খান বলেন, " মানুষজনকে সচেতন করতে হবে। যারা ভাড়া দিচ্ছে এবং যারা ভাড়া নিচ্ছে, উভয়কে সচেতন করতে হবে। কেমিক্যালের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে তাদেরকে বুঝাতে হবে। এবং এর বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে আইনের আশ্রয় নিতে হবে।"

Image caption ড: মুস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পায়নের জন্য রাসায়নিক পদার্থ অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়। কিন্তু এর সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন এবং কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে এটা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে অনেকের কোন ধারনা নেই।

অধ্যাপক রহমান বলেন, কোন রাসায়নিক পদার্থ যখন আগুনের সংস্পর্শে আসে তখন সেটি দ্রুত আগুনকে ছড়িয়ে দেয়।

সেজন্য কেমিক্যাল এমন জায়গায় রাখতে হয়, যেটি মানুষের বসবাসের জায়গা নয়। কোন কারখানা যদি ঘন জনবসতির মধ্যে থাকে তখন সেখানে দুর্ঘটনা হলে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যায়।

বিভিন্ন সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এরই মধ্যে সুপারিশ করেছে আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম বা অন্য যে কোন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প সরিয়ে নেয়া। কিন্তু এ বিষয়গুলোকে সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে?

Image caption শিল্পমন্ত্রী আমীর হোসনে আমু।

শিল্পমন্ত্রী আমীর হোসেন আমু জানালেন, কেমিক্যাল গুদামগুলো সরিয়ে নেবার জন্য কেরানীগঞ্জে জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং যত শীঘ্রই সম্ভব এগুলো সরিয়ে নেবার ব্যবস্থা করা হবে।

শহরের ভেতরে যেসব ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠেছে সেগুলোও আলাদা জায়গায় সরিয়ে নেবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে শিল্পমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এলাকায় এসব শিল্প সরিয়ে নেয়া একমাত্র সমাধান নয়। সেসব শিল্প এলাকার পাশে আবার নতুন করে যেন ঘনবসতি গড়ে না উঠে সেদিকে নজর দেয়াটা জরুরী।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর