মিশ্র ধর্মের বিয়ে নিয়ে ব্রিটেনে শিখদের মধ্যে বিতর্ক

শিখদের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান

ছবির উৎস, dino jeram

ছবির ক্যাপশান,

শিখদের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান

কয়েক সপ্তাহ আগে একটি মিশ্র ধর্মের বিয়ের প্রতিবাদে লন্ডনের মিডল্যান্ডের গুরুদুয়ারার সামনে বিক্ষোভ করেন একদল শিখ ধর্মাবলম্বী। সেখান থেকে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করে।

কিন্তু এই ঘটনা গুরুদুয়ারায় মিশ্র ধর্মের বিয়ে নিয়ে, ব্রিটেনের শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক তৈরি করেছে। অনেকে মনে করেন, এটা তাদের ধর্মের বিচ্যুতি ঘটাচ্ছে, তাই তারা বিরোধিতা করছেন।

আবার অনেকের মতে, বিয়ে নিয়ে এই বিতর্ক আসলে ব্রিটেনের শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যেই বিভেদ তৈরি করছে।

এ বিষয়ে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছেন বিবিসির সাংবাদিক।

প্রথমেই কথা বলেছেন ডন সিং নামে শিখ সম্প্রদায়ের একজনের সঙ্গে।

প্রতিদিন ভোরের প্রার্থনা করেন ডন সিং। যদিও তিনি পাগড়ি পড়েন না বা দাড়িও রাখেননি, কিন্তু ধর্মে তিনি বিশ্বাস করেন। এ কারণেই তিনি এবং তার খৃষ্ঠান সহধর্মিনী টিনা, শিখ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নিজেরা বিয়ে করেছেন।

কিন্তু আরও অনেকের মতো লেমিংটন পার্কের সাম্প্রতিক ঘটনার আঁচ পেয়েছেন তিনি।

একজন শিখ নারী ও হিন্দু পুরুষের মিশ্র বিয়ের প্রতিবাদে সেখানে বিক্ষোভ হয়েছে। গত কয়েক বছরে এরকম বেশ কয়েকটি বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। দেশের একাধিক গুরুদুয়ারায় অন্য ধর্মের বিয়ে বন্ধে একাধিক গ্রুপ চেষ্টা করেছে।

আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Thinkstock

ছবির ক্যাপশান,

ধর্মীয় কারণে কিরপান নামে একধরনেন ছুরি ব্যবহার করে শিখরা, ব্রিটেনের আইন অনুযায়ী যা বৈধ

রিজিন্দর, যদিও এটা তার ছদ্মনাম, শিখ নারী হলেও একজন খৃষ্ঠান পুরুষকে বিয়ে করেছেন। নিরাপত্তার কারণেই তিনি চান না, তার পরিচয় কেউ জানুক। লন্ডনের একটি গুরুদুয়ুরায় তার বিয়ে হয়।

কিন্তু বিয়ের পুরো সময়টায় তার ভয় হচ্ছিল, হয়তো তাদের বিয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়ে যাবে।

রিজিন্দর বলছিলেন -"এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা শুনেছি। মুখোশ পড়া লোকজন গুরুদুয়ারায় এসে লোকজনকে ঘিরে রেখেছে। আমরা বাইরে একটি পুলিশের গাড়ি মোতায়েন রাখতে সমর্থ হয়েছিলাম। পুরো সময়টায় আমার খারাপ লাগছিল, যেন সত্যি আমরা গোপন কিছু করছি"।

কিন্তু গুরুদুয়ারায় শিখদের মিশ্র বিয়ের নিয়মনীতি কি?

ভারতে ব্রিটিশ রাজত্বের সময় শিখ আচরণবিধি রেহত মারিয়াদা তৈরি হয়, যেখানে পরিস্কারভাবে বলে দেয়া হয়েছে, শিখ বিয়ে বা আনন্দকারাজ শুধুমাত্র দুইজন শিখ ধর্মাবলম্বীর মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। যদিও সব শিখ সব নিয়মকানুন মানেন না।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অনেক গুরুদুয়ারা এসব নিয়মকানুন শিথিল করেছে, আর এ কারণেই জন্ম হয়েছে এ ধরনের বিক্ষোভের।

ছবির উৎস, MANPREET SINGH BADHNI KALAN

ছবির ক্যাপশান,

শিখ নেতারা এক ঘোষণায় জানান গুরুদুয়ারায় শুধুমাত্র শিখদের বিয়ের অনুষ্ঠানই হবে।

কিছুদিন আগে ব্রিটেনের শিখ নেতারা এ বিষয়ে একটি আলোচনায় বসেছিলেন, যেখানে যুক্তরাজ্যের ১৮০টি গুরুদুয়ারার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা সম্মত হন, মিশ্র ধর্মের যুগলরা গুরুদুয়ারায় পূর্ণ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পাবেন না।

কিন্তু কমিটি মেম্বার দিবিন্দর সিং বলছেন, এই যুগলরা গুরুদুয়ারার আর্শীবাদ পাবেন।

"তাদেরকে একেবারে সহায়হীন করে দেয়া হবে না। আনান্দকারেজ অনুষ্ঠানের বদলে তাদের জন্য প্রার্থনা করা হবে। আসলে গুরুদুয়ারা সবসময়েই চেষ্টা করবে তাদের স্বাগত জানাতে, কিন্তু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা আর করা যাবে না"-বলেন দিবিন্দর সিং।

যদিও এই প্রস্তাব ঐচ্ছিক, গুরুদুয়ারার উপরই নির্ভর করবে, তারা এটি অনুসরণ করবে কিনা। তবে বিয়ে নিয়ে এসব আলোচনাকে অনেকেই দেখছেন ব্রিটেনে শিখ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উদারপন্থী আর রক্ষণশীলদের বিরোধ হিসাবে।

ছবির উৎস, Google

ছবির ক্যাপশান,

লেমিংটন পার্কে গুরুদুয়ারায় শিখ নারী ও হিন্দু পুরুষের মিশ্র বিয়ের প্রতিবাদে সেখানে বিক্ষোভ হয়।

অনেকে মনে করেন, তাদের ধর্ম বিচ্যুত হয়ে পড়ছে, তাই সত্যিকারের ধর্মকে ফিরিয়ে আনতে চান। জগরাৎ সিং তাদের একজন।

"তরুণ প্রজন্ম জানে যে, তাদের ধর্মের বিচ্যুতি করা উচিত নয়। গুরু বলেছেন, যতদিন তুমি আমার পথে থাকবে, আমি তোমাকে সাহায্য করবো। বিশ্বের যেখানেই আপনি থাকেন না কেন, সেটা তো আপনি পাল্টাতে পারেন না"।

কিন্তু এরকম চিন্তা আর বিশ্বাস ভীত করে তুলছে রিজিন্দরের মতো অনেককে, যারা অন্য ধর্মের কাউকে বিয়ে করেছেন। তার ভয়, তাকে হয়তো তার ধর্ম থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়া হবে।