বাংলাদেশে আয়করদাতার সংখ্যা এতটা কম কেন?

  • মীর সাব্বির
  • বিবিসি বাংলা
আয়কর মেলা আয়োজন করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

ছবির উৎস, BBC bangla

ছবির ক্যাপশান,

আয়কর রিটার্ন জমা দেয়া সহজ করা এবং লোকজনকে আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করতে গত ৭ বছর যাবত আয়কর মেলা আয়োজন করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে সর্বশেষ অর্থবছরে আয়কর দিয়েছেন মাত্র ১৩ লাখের মত মানুষ।

এবছর সেই সংখ্যা কিছুটা বাড়বে আশা করা হলেও সেটি মোট জনগোষ্ঠির মাত্র এক শতাংশও হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। যদিও গবেষকরা বলছেন, এই সংখ্যা ৪ থেকে ৫ গুণ করার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে প্রত্যক্ষ কর না দিয়ে বা বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দিয়ে একদিকে অনেকে বেঁচে যাচ্ছেন, অন্যদিকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়ছে এবং অপ্রত্যক্ষ করের বোঝা বাড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরেও।

আয়কর রিটার্ন জমা দেয়া সহজ করা এবং লোকজনকে আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করতে গত ৭ বছর যাবত আয়কর মেলা আয়োজন করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। যদিও বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে জনসংখ্যা অনুপাতে আয়করদাতার সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়নি।

"আয়কর দেয়াটা সহজ করা উচিত। এখন যদি দিতে গিয়ে আমাকে ঘুরতে হয়, তাহলেই সমস্যা"- বলছিলেন মেলায় আয়কর রিটার্ন জমা দিতে আসা মনসুর আহমেদ।

বাংলাদেশে সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী আয়কর নিবন্ধন ছিল ১৯ লাখের মতো, যাদের মধ্যে আয়কর দিয়েছেন মাত্র ১৩ লাখের মত মানুষ। এবছর নিবন্ধন প্রায় ২১ লাখ লাখে উন্নীত হয়েছে বলে বলছে রাজস্ব বোর্ড।

ছবির উৎস, BBC bangla

ছবির ক্যাপশান,

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান

গবেষণা সংস্থা, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ বা সিপিডির হিসেবে, আয়কর দেবার যোগ্য, এমন মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখের কম নয়। অন্যান্য কিছু গবেষণায় এই সংখ্যা এক কোটিরও বেশি উল্লেখ করা হচ্ছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এই বিশালসংখ্যক মানুষ যে আয়করের বাইরে থেকে যাচ্ছেন, তার ফলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেমন অর্থসংকট তৈরি হচ্ছে তেমনি বৈদেশিক সাহায্যের ওপরও নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।

"করের একটা বড় ফিলসফি হলো সমাজের মধ্যে আয়ের বৈষম্য কমানো। কিন্তু আমরা দেখছি যে, এই জায়গাটাতে আমরা বেশি অগ্রসর না হয়ে আমাদের আয়ের বৈষম্যের সূচকে খুব ইতিবাচক পরিবর্তন দেখছি না"।

আয়করদাতার সংখ্যা কম হলেও প্রতিবছর বাংলাদেশে বাড়ছে বাজেটের আকার এবং একইসাথে বাড়ছে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা।

ছবির উৎস, BBC bangla

ছবির ক্যাপশান,

আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার জন্য মানুষের লাইন

চলতি বছর আয়কর রেয়াতের কিছু সুবিধা কমে যাওয়ায় কোন কোন আয়করদাতাকে গুণতে হচ্ছে বেশি অর্থ। যেখানে অনেকে আয়কর দিচ্ছেন না, বা বড় ব্যবসায়ীরা ফাঁকি দিচ্ছেন সেখানে মধ্যম আয়ের আয়করদাতাদের ওপর চাপ পড়ায় কেউ কেউ ক্ষুব্ধ।

"গত বছরের তুলনায় আমার প্রায় দুই লাখ টাকা বেশি কর দিতে হচ্ছে। কিন্তু আমার বেতনতো সেই পরিমাণে বাড়েনি। পরিচিত অনেক ব্যবসায়ী দেখছি যে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করে ৫-৭ হাজার টাকা দিয়েই পার পেয়ে যাচ্ছে"- বলেন মেলায় আসা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আদনান ভূঁইয়া।

মধ্যম আয়ের আয়করদাতাদের ওপর চাপ না দিয়ে তবে আয়করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে ঘাটতিটা কোথায়?

"কর বিভাগ কিন্তু বেশ কয়েকবার নতুন করদাতাদের শনাক্ত করতে জরিপ করেছে, কিন্তু সেই জরিপ করে কীভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে সেই জায়গায় এনবিআরের দুর্বলতা রয়েছে। আমার জানামতে ৭-৮ বার সার্ভে করা হয়েছে কিন্তু তার ফলাফলটা মাঠপর্যায়ে ওভাবে আসেনি"- বলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য এম আমিনুর রহমান।

ছবির উৎস, BBC bangla

ছবির ক্যাপশান,

এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট আব্দুল মাতলুব আহমেদ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বলছেন, কর আদায়ে এই ঘাটতি খুব দ্রুতই দূর হবে বলে তারা আশাবাদী।

তিনি বলেন,"ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা-জেলা সব পর্যায়ে আয়কর নিবন্ধনের বিষয়ে সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। আগামীতে আরো বেশি জনগণ কর দেবেন সেই সম্ভাবনা আমরা দেখছি। বাংলাদেশের করদাতা কম বলে যে অপবাদ আছে, সেটা অচিরেই ঘুচবে"।

তবে বাংলাদেশে রাজস্ব আয়ের মূল অংশটি আসে ভ্যাটসহ বিভিন্ন অপ্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে।

আয়কর আদায়ে ঘাটতি রেখে অপ্রত্যক্ষভাবে কর নেয়ার ফলে সমাজে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ।

"অপ্রত্যক্ষ করের ফলে মানুষ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী (অ্যাবিলিটি টু পে) অনুযায়ী কর দিচ্ছে না, যার ফলে গরীব-ধনী নির্বিশেষে সমান হারে কর দিচ্ছে। যেটি কর নীতিমালায় ন্যায়নীতির বিরোধী। সরকারের উচিত হবে অপ্রত্যক্ষ করের আপেক্ষিক মাত্রা ক্রমাগত কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আপেক্ষিক মাত্রা ক্রমাগত বাড়ানো"- বলেন অধ্যাপক আকাশ।

শুধু বৈষম্যই নয়, খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে অর্থনীতির প্রায় ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশ অর্থ করের বাইরে, অর্থাৎ কালো টাকা।

ড. মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, কর আদায়ে ঘাটতির ফলে এই কালো টাকার পরিমাণও বাড়ছে।

"যখন আমরা কর ঠিকমত আদায় করতে পারি না, তখন সেখানে একটা অবৈধ অর্থনীতি কাজ করে। যেমন দেশের থেকে টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। এই জায়গাগুলো একটি অর্থনীতির জন্য ভালো না"।

ছবির উৎস, BBC bangla

ছবির ক্যাপশান,

আয়কর মেলার একটি স্টল

কর দেয়ার জন্য যে সচেতনতা তৈরি জরুরী এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। কিন্তু স্বেচ্ছায় কর দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতি বা অনীহা কাজ করে এটিও স্বীকৃত। তবে সেই অবস্থার এখন অনেকটা পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে করছেন এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট আব্দুল মাতলুব আহমেদ।

তিনি বলেন, রাজস্ব বোর্ড সাথে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও কর দেয়ার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করছে।

সাবেক রাজস্ব বোর্ড কর্মকর্তা আমিনুর রহমান বলছেন, আয়কর দিতে কেউ কেউ স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসলেও কর কর্মকর্তারা যদি নতুন করদাতা শনাক্ত না করতে পারেন তাহলে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো খুব কঠিন হবে।

আয়করের মধ্যেও ৬০ শতাংশ করই আসে কর্পোরেট কর থেকে। মি. রহমান বলছেন, যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এটি আরো বাড়ানো সম্ভব। তবে নতুন করদাতা তৈরির পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ করাটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

অধ্যাপক এম এম আকাশ বলছেন, বড় ধনীদের কর ফাঁকি রোধ করা গেলে সেটি রাজস্ব আদায়ে বড় পরিবর্তন তৈরি করতে পারে। তিনি বলছিলেন, এর আগে নানা প্রণোদনা দিয়েও দেখা গেছে যে সেই কর আদায়ে যথেষ্ট সাফল্য দেখা যায়নি।

"একটা শিক্ষা সরকারের নেয়া উচিত, সুপার রিচদের (বড় ধনী) কাছে তোষণ করে কর আদায় করা যাবে না। তাদের ওপর চাপ দিয়ে কর আদায় করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গিকার খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি তাদের টাকায় রাজনৈতিক দল চালায় তাহলে তাদের ওপর কর আরোপ করলেও সেটা আদায় করা সম্ভব হবে না"।

"করের পুরস্কার দেয়া হলে আমরা দেখি যিনি সবচেয়ে বেশি কর দিয়েছেন তিনি শীর্ষ ধনীদের কেউ নন, তাদের বাইরের কেউ"- বলেন অধ্যাপক আকাশ।

ছবির উৎস, BBC bangla

ছবির ক্যাপশান,

অধ্যাপক এম.এম আকাশ

আয়কর দেয়ার ক্ষেত্রে ভীতি এবং বিশ্বাসের সংকটও অনেক আয়কারদাতার মধ্যে রয়েছে। কর যে স্বচ্ছতার সাথে দেশের উন্নয়ন কাজে ব্যয় হবে সেটা নিয়ে আস্থার অভাব রয়েছে।

ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন "কর দেয়া যে সুনাগরিকের দায়িত্ব সেটা মানুষকে সচেতন করা এবং করের টাকাটা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা দুটোই সমান্তরালভাবে যেতে হবে"।

আস্থা তৈরিতে কর ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন অধ্যাপক এম এম আকাশ।

"সরকার প্রতি বছর জেলা বাজেটের কথা না বলে যদি সত্যি সত্যি জেলা বাজেট করেন, তবে স্থানীয় পর্যায়ে ধনী লোক যারা আছেন তারা কর প্রদানে উৎসাহিত হবেন। কারণ তারা দেখবেন যে করের টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং কি জন্য হচ্ছে সেটাও তারাই ঠিক করে দিচ্ছেন"।

সুতরাং বছর বছর বাড়তে থাকা বাজেটের আকার এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার সাথে তাল মিলিয়ে আয়কর আদায় যে বাড়াতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

তবে একইসাথে বড় ধনীদের কর ফাঁকি দেয়া এবং সুশাসন যদি নিশ্চিত করা না যায় তবে অর্থনীতির আকার বাড়ার সাথে সাথে চাপে পড়বেন নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের মানুষ।