পার্বত্য ভূমি বিরোধ কমিশনের বিরুদ্ধে এবার বাঙালিরা

রাঙামাটি, বান্দরবান আর খাগড়াছড়ি বাংলাদেশের পার্বত্য তিন জেলাতেই রয়েছে ভূমি নিয়ে বিরোধ ছবির কপিরাইট BBC bangla
Image caption রাঙামাটি, বান্দরবান আর খাগড়াছড়ি বাংলাদেশের পার্বত্য তিন জেলাতেই রয়েছে ভূমি নিয়ে বিরোধ

(এই প্রতিবেদনটি দেখতে পাবেন আজ ৩রা নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টায়, চ্যানেল আই-তে 'বিবিসি প্রবাহ' অনুষ্ঠানে।)

দেড় দশক পর আইন সংশোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

পাহাড়িদের পক্ষ থেকে হাজার হাজার আপত্তি তুলে ধরা হলেও বাঙালিরা এখন কমিশনের বিরোধিতা করছে।

রাঙামাটি, বান্দরবান আর খাগড়াছড়ি বাংলাদেশের পার্বত্য তিন জেলাতেই রয়েছে ভূমি নিয়ে বিরোধ। পাহাড়ে জমির দখল, মালিকানা নিয়ে এই সংকট চলছে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে।

আশির দশকে সমতল থেকে বাঙালিদের পুনর্বাসনের পর পাহাড়ে ভূমি সমস্যা শুরু হয়।

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে ভূমি সমস্যা সবচে বেশি খাগড়াছড়িতে।

খাগড়াছড়ির বিপীন বিহারী ৮০র দশকে পাহাড়ি বাঙালী সংঘর্ষের সময় ভারতে শরণার্থী হয়েছিলেন।

দিঘীনালা উপজেলার ছোট মেরুন এলাকায় কার্বারি ছিলেন তিনি। ১৯৯৭ সালে দেশে ফিরে দেখেন পাহাড়ে তাদের ৩৮ একর জমি সব দখল হয়ে গেছে।

ভূমি কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন যে তার জমিতে ক্যাম্প হয়েছে এবং দখল করেছে বাঙালিরা।

ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের পর নতুন কার্যক্রম শুরু হওয়ায় কিছুটা আশান্বিত বিপীন বিহারী।

"এখন ওই জঙ্গলে কোনোরকম জুম কৃষি করে জীবন ধারণ করতেছি। যদি সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করে বা আমাদের জমির একটা সুব্যবস্থা করে তাইলে পেলাম না হইলেতো এই পথের ভিখারী হয়ে জীবন ধারণ করতে হবে।"-বলছিলেন বিপীন বিহারী ।

সরকারি পুনর্বাসনে থাকা লক্ষীরাম চাকমা বলেন তার ১৫ একর জমি ও পাহাড় ছিল যার সবটাই বেদখলে।

তিনি বলেন- "আমরা যখন ভারত চলে গেছি তখন তারা আমাদের সব জাগা জমি দখল করে নিছে। পরে যখন আসছি তখন কাগজ চায়, আমরাতো এটা কাগজপত্র বুঝি না।"

ছবির কপিরাইট BBC bangla
Image caption সরকারি পুনর্বাসনে থাকা একজন বলেছেন তার ১৫ একর জমি ও পাহাড় ছিল যার সবটাই বেদখলে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জম্মু শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তুচিত চাকমা বলেন, ১৯৯৭ সালে চুক্তির পর সরকারিভাবে ভারত থেকে ফিরেছে ১২ হাজার ২২২ পরিবার। আরো ১৪ হাজার পরিবার স্বেচ্ছায় দেশে ফিরেছে।

এছাড়া অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু রয়েছে ৯০,২০৮ পরিবার। এদের অনেকেই তাদের নিজ বাস্তুভিটা ফেরত পায়নি। তাঁর দাবি- "সেটেলার বাঙালিরাই সব পাহাড়িদের জমি দখল করে আছে। সমতল থেকে যাদের আনা হয়েছিল তাদের সম্মানজকন পুনর্বাসন করা হোক।"

গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা বলছেন সরকার তাদের এনেছে। জমি দিয়েছে, থাকতে দিয়েছে। কিন্তু ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের পর তাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। কারণ তাদের বসতি জমির ব্যাপারেও আপত্তি দিয়েছে পাহাড়িরা।

খাগড়াছড়ির দিঘীনালা উপজেলায় বাঙালিপাড়া গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, সরকার তাকে চাষবাসের জন্য যে পৌনে ৫ একর জমি দিয়েছিল সেটি পাহাড়িরা দখল করে নিয়েছে।

পুনর্বাসিত ফাতেমা বেগমের প্রশ্ন, "আমরার মধ্যে আতঙ্ক এইডাই এরা এত বছর পরে বলে বাঙালি উডাই দিব বাঙালি যাইব গিয়া। আমরা এহন কোতায় যামু, কোন যাগা, কেন যামু?"

বাঙালিপাড়ার সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোসলেম উদ্দীন ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সবাই মনে করছে এই কমিশন বাস্তবায়ন হলে বাঙালিদের উচ্ছেদ হতে হবে। কারণ বাঙালিদের বসতবাড়ি গুচ্ছগ্রামের ব্যাপারেও আপত্তি এসেছে।

"পার্বত্য এলাকা বাংলাদেশের এক দশমাংশ। আমরা চাই বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সবাই সমান অধিকার পাক। এখানে পাহাড়িরাও থাকবে বাঙালিরাও থাকবে।"

পার্বত্য এলাকায় দ্বন্দ্ব সংঘাতের মূলে ভূমি বিরোধকেই দায়ী করা হয়।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গত দেড় দশকে পাহাড়িরা কমিশনকে সহযোগিতা করেনি বলে অভিযোগ ছিল।

ছবির কপিরাইট BBC bangla
Image caption পার্বত্য এলাকায় দ্বন্দ্ব সংঘাতের মূলে ভূমি বিরোধকেই দায়ী করা হয়।

আইন সংশোধনের পর এখন বাঙালিদের বিরোধিতার মুখে পড়েছে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন। বাঙালি সংগঠনের পক্ষ থেকে কমিশনের কার্যক্রম প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সারওয়ার জাহান খান বলেন- "এটি একটি একতরফা উপজাতি কমিশন, এই কমিশনের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন চলবে।"

এ বছর আগস্টে 'পার্বত্য চট্টগ্রাম-ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১' সংশোধন হয়। গেজেট প্রকাশের পর ৮ই সেপ্টেম্বর থেকে ৪৫ দিনের সময় বেধে দিয়ে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়।

ভূমি কমিশন চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ারউল হক জানান ওই সময়ে ১৫,৯৬৯টি আবেদন পড়েছে। যার মধ্যে পাহাড়ি-বাঙালি, পাহাড়ি-পাহাড়ি, বাঙালি-পাহাড়ি, বাঙালি-বাঙালি, পাহাড়ি-সরকার এরকম ৭ থেকে৮ ধরনের বিরোধ দেখা যায়।

মি. হক বলেন, "এগুলো সর্টআউট করে আমরা মার্জিনাল লেভেলে যারা আছে ল্যান্ড নিয়ে তাদের কাছে পৌঁছাবো এবং ফিজিক্যালি দেখে বিরোধী পক্ষের উপস্থিতিতে তাদের সুবিধা অসুবিধা বিবেচনা করে এগুলো নিষ্পত্তি করবো। আমরা একটা ডকুমেন্ট দেব, ডকুমেন্ট দিলে তারা স্থায়ীভাবে প্লেইন ল্যান্ডের মতো একটা পজিশনে চলে আসবে"।

কমিশন আইন সংশোধনের পর বাঙালিদের ক্ষোভ এবং আতঙ্ক প্রসঙ্গে মি. হক বলেন, উভয় পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে- "আমি দশটা নিষ্পত্তি করি, দেখুন আপনারা। স্টেকহোল্ডার যারা তারা সেটিসফাইড হচ্ছে কিনা। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে যত দেরি হবে তত জটিলতা বাড়বে।"