বিজ্ঞানের সাড়াজাগানো কল্পকাহিনি 'স্টার ট্রেক' সিরিজ তৈরি হল যেভাবে

১৯৬৬ সালে টেলিভিশনে বিজ্ঞানের এক কল্পকাহিনি ভিত্তিক সিরিয়াল সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটা নতুন ধারার সূচনা করেছিল।

ওই বছর ৮ই সেপ্টেম্বর আমেরিকার টিভি দর্শকরা টেলিভিশনের পর্দায় প্রথম দেখেছিলেন বিজ্ঞানের কল্পকাহিনী নিয়ে সিরিয়াল- স্টার ট্রেক।

দর্শকদের জন্য ছিল স্টারশিপ এন্টারপ্রাইজ নভোযানে মহাকাশচারীদের কিংবদন্তী মহাকাশযাত্রার কাহিনি যে মহাকাশযান ঘুরে বেড়াবে এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে। খুঁজে বেড়াবে নতুন জীবনের চিহ্ন- নতুন সভ্যতা - এবং যাবে এমন জায়গায় যেখানে আগে কেউ কখনও যায় নি।

ভাবনাটা অভিনব হলেও ওই ভাবনা বাস্তবায়নের কাজটা সহজ হয় নি।

ওই সিরিয়াল তৈরি একমাত্র তুলনীয় ছিল প্রতি সপ্তাহে বিজ্ঞানের কল্পলোক নিয়ে একটি নতুন চলচ্চিত্র তৈরি করার সঙ্গে। বিষয়টা এতটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে শ্যুটিং-এর পর পোস্ট প্রোডাকশানের দায়িত্বে যিনি ছিলেন তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারাই গেলেন বলছিলেন হার্ব সোলো যিনি ১৯৬০এর দশকে একজন অনুষ্ঠান পরিচালক ছিলেন।

যে স্টুডিওর সঙ্গে তিনি কাজ করতেন সেই স্টুডিওর মালিক হার্ব-কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন নতুন শো তৈরির বিষয়ে চিন্তাভাবনা করতে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবেই তরুণ এক লেখকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। লেখকের নাম জিন রডেনবেরি।

ছবির ক্যাপশান,

জিন রডেনবেরি - স্টার ট্রেকের উদ্ভাবক

মিঃ রডেনবেরি ছিলেন খুবই নার্ভাস প্রকৃতির- কিছুটা এলোমেলো- আর নিজের ওপর আস্থাহীন। খুবই দায়সারাভাবে, তিনি তার শোর আইডিয়া শুনিয়েছিলেন বলে বলেন হার্ব। ''সেই প্রথম আমি স্টার ট্রেক শব্দদুটো শুনি।''

তখনই স্টার ট্রেকের আইডিয়া তার মনে ধরে আর তার সৃজনীপ্রতিভা সক্রিয় হয়ে ওঠে এই কল্পকাহিনি নিয়ে সিরিয়াল তৈরির লক্ষ্যে ।

''আমার শুনেই মনে হয় যে মহাজগতে অ্যাভেঞ্চারের কাহিনি নিয়ে একটা টেলিভিশন সিরিজ তৈরি করলে তা দারুণ হবে। এরপর জিন তার কাহিনি সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত যখন জানাল- বলল সে কীভাবে কাহিনিটা এগিয়ে নিতে চায় তখন আমরা সিরিজ তৈরির সিদ্ধান্ত নিলাম এবং জিনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলাম।''

এরপর হার্ব ও জিন গড়ে তুললেন স্টার ট্রেক জগতের একটা নিজস্ব চেহারা।

মিঃ স্পক বলে যে চরিত্রটি ছিল প্রথমে তার রং করা হয়েছিল পুরো লাল- তার কানদুটো ছিল ছুঁচলো, সেইসঙ্গে তার একটা ছুঁচলো লেজও রাখা হয়েছিল। ''আমি জিন রডেনবেরিকে বলেছিলাম -একটা টেলিভিশন সিরিজে যদি এমন কোনো চরিত্র থাকে যাকে শয়তানের মত দেখতে, তাহলে কেউ সেই টিভি সিরিজে অর্থ বিনিয়োগ করবে না।''

হার্ব বলেছেন মনে রাখতে হবে সেটা ছিল ১৯৬৪-৬৫ সালের কথা । সেটা তথ্যপ্রযুক্তি বা কম্প্যুটারের যুগ নয়।

''ধরুন আমরা দেখাতে চাইছি মহাশূণ্য দিয়ে ছুটে চলেছে একটা নভোযান । আমাদের আলাদা করে তারাভরা আকাশের ছবি তুলতে হবে, আলাদা করে নভোযানের ছুটে চলার ছবি তুলতে হবে। তারপর আকাশের ছবির ওপর নভোযানের ছবি সুপার ইম্পোজ করে তবেই দৃশ্যটা তৈরি করতে হবে। এটা শুধু খরচের ব্যাপারই নয়- খুবই সময়সাপেক্ষ কাজ।''

ছবির ক্যাপশান,

স্টারশিপ এন্টারপ্রাইজ নভোযানের মডেল

আমেরিকান টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনবিসি স্টার ট্রেক নিতে আগ্রহী হয়েছিল । কিন্তু ১৯৬৫ সালে পরীক্ষামূলক পাইলট তৈরি করার পর এনবিসির অর্থদাতারা কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি তোলেন।

''ছবিতে একটা দৃশ্য ছিল - যেখানে অভিনেত্রী সুজান অলিভারকে সবুজ শরীরে দেখানো হয়েছিল। ওই চরিত্রে তার সারা গায়ে সবুজ রঙ করে তাকে নাচানো হয়েছিল। এনবিসির বিপণন বিভাগ যখন পর্বটা দেখে সেটা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে পাঠায়- তখন তারা ওটা প্রত্যাখান করে।''

স্টার ট্রেকের সুপরিচিত থিম সঙ্গীত এবং আনুষঙ্গিক সঙ্গীত রচনার কাজ করেন আলেকজান্ডার কারেজ নামে একজন বিশিষ্ট সুরকার- বন্ধুদের কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন স্যান্ডি নামে।

এই সিরিজের জন্য মহাকাশের আবহকে তিনি সাফল্যের সগে তুলে ধরেছিলেন।

প্রথম পরীক্ষামূলক পর্ব নিয়ে কিছু বিপত্তি হলেও দ্বিতীয় পরীক্ষামূলক পর্বটি খুবই সফল হয়েছিল এবং এনবিসি সেটি দেখার পর ১৬টি পর্ব তাদের চ্যানেলে দেখানোর জন্য চুক্তি করে। এরপর শুরু হয় সাপ্তাহিক পর্ব তৈরির কাজ।

১৯৬৬ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার স্টার ট্রেকের প্রথম পর্ব প্রচারিত হয় এনবিসি নেটওয়ার্কে।

হার্ব বলছেন মানুষ এই আনকোরা নতুন ধাঁচের টিভি সিরিজ কীভাবে নেবে তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন। আগে থেকেই কিছু কিছু বিরূপ সমালোচনা ছাপা হচ্ছিল ।

''প্রথম পর্ব প্রচারের পরদিন আমি যখন স্টুডিওতে গেলাম- সবাই আমার দিকে তাকিয়ে শুধু একটু হাসল- মনে হল এটা প্রচার হয়েছে - এতেই খুশি হওয়া উচিত। অভিনেতা- অভিনেত্রী এবং সেটে যারা কাজ করেছিলেন তাদের খুশি মনে হল না। কেউ কেউ তাদের ইতিমধ্যেই বলেছে- এটা কার্টুন শো। কেউ বলেছে- এটা বাচ্চাদের কাহিনি। রেটিং-এ ভাল করেনি স্টার ট্রেক। যারা ভক্ত তারা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে- কিন্তু তারা হাতে গোণা ক'জন।''

ছবির ক্যাপশান,

স্টারশিপ এন্টারপ্রাইজের ক্যাপ্টেন জেমস টি কার্কের ভূমিকায় ক্যানাডীয় অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনার

সিরিজটি তৈরি করার বিপুল ব্যয় এবং দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে অনবরত সংগ্রামের মধ্যেও স্টুডিওর মালিক সবসময়েই এই সিরিজকে উৎসাহ দিয়েছেন।

কিন্তু ১৯৬৯সালে সিরিজের রেটিং বা দর্শকসংখ্যা পড়তে শুরু করলে উনআশি পর্বের পর এনবিসি স্টার ট্রেক দেখানোর চুক্তিটি বাতিল করে দেয়।

''তখন সিরিজটি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। আমরাও অভিজ্ঞতা দিয়ে এটির উৎকর্ষ বাড়ানোর চেষ্টা করছি। দর্শকের সংখ্যা যদিও কম- কিন্তু যারা দেখছে তারা অন্ধ ভক্ত হয়ে উঠেছে। স্পষ্ট তাদের মতামত জানাচ্ছে। তিনবছর সিরিজটি চলেছিল - তারপর স্টার ট্রেক বন্ধ হয়ে গেল।''

তবে সেই বছরই পরের দিকে স্টার ট্রেকের আবার পুনরুজ্জীবন ঘটল - এবার শুধু আমেরিকায় নয়- আন্তর্জাতিকভাবেও।

ছবির ক্যাপশান,

স্টার ট্রেক টিভি সিরিজে মিঃ স্পকের চরিত্রে আমেরিকান অভিনেতা লেনার্ড নিময়

সিরিজটি ব্রিটেনে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। শনিবার বিকেল সোয়া ৫টার যে জনপ্রিয় স্লটে বিবিসির নিজস্ব বিজ্ঞানের কল্পকাহিনি ড: হু ধারাবাহিক দেখানো হতো সেই স্লটে দেখানো শুরু হল স্টার ট্রেক।

হার্ব বলেছেন বিজ্ঞানের কল্পকাহিনি মানুষ যে ভালবাসে এটা ছিল তার প্রমাণ। ''আমরা আলাদা কোনো উদ্যোগ নিই নি- কিন্তু পুরুষ, নারী এমনকী শিশুরাও এই ধারাবাহিক উপভোগ করেছে। ''

''আমরা যা করেছিলাম তার জন্য আমি গর্বিত। আমরা দারুণ ভাল অভিনেতা - অভিনেত্রীদের আনতে পেরেছিলাম- দক্ষ কলাকুশলীদের পাশে পেয়েছিলাম। হ্যাঁ- প্রথমদিকে কিছু সমস্যা হয়েছিল - কিন্তু শেষপর্যন্ত আমরা দারুণ উপভোগ্য একটা শো উপহার দিতে পেরেছিলাম বলেই আমি মনে করি।''

ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্ব পরিবেশন করেছেন মানসী বড়ুয়া।