ভারতে ৫০০ আর ১০০০ রুপীর নোট নিষিদ্ধ: দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ

  • অমিতাভ ভট্টশালী
  • বিবিসি বাংলা, কলকাতা
ছবির ক্যাপশান,

ভারতে এখন ৫০০ আর ১০০০ রুপীর নোট বৈধ নয়

ভারতে মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে ৫০০ আর ১০০০ রুপীর নোট অচল হয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এক ঘোষণার পরে।

জাতির উদ্দেশে দেওয়া মি" মোদীর ভাষণের পরেই বহু মানুষ ছুটে গিয়েছিলেন ব্যাঙ্কের এটিএম কাউন্টারগুলোতে। লাইন দিয়েছিলেন একশো টাকার নোট পাওয়ার আশায়।

সাধারণত এটিএম মেশিন থেকে বেশীরভাগ ৫০০ আর কয়েকটি ১০০ টাকার নোট বের হয়। তাই অনেকেই বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় কিছু একশো টাকার নোট জোগাড় করতে পেরেছেন।

"সামনের এটিএম কাউন্টারে ভোর চারটে পর্যন্তও লোক ছিল," বলছিলেন দক্ষিণ কলকাতার এক চা দোকানী। তাঁর দোকানে হাজির সকলের মুখেই একটা বিষয় নিয়েই আলোচনা চলছিল।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা থেকে কলকাতায় গৃহকর্মের কাজ করতে আসা কয়েকজন নারী বলছিলেন, "প্রথমেতো বুঝতেই পারিনি কী বলছে লোকে, কেন ৫০০ টাকার নোট চলবে না! যে বাড়িগুলোতে কাজ করি, সেখানে তো আমাদের মাইনে দেয় ৫০০ টাকার নোটে। এখন ঘরে যে কয়েকটা ১০০ টাকা আছে, সেগুলো দিয়েই চালাতে হবে কয়দিন।"

ওই চায়ের দোকান থেকে গিয়েছিলাম কাছের একটি রেল স্টেশনে। দিনমজুরীর কাজ পাওয়ার আশায় বহু মানুষ জড়ো হন শেয়ালদা দক্ষিণ শাখার এইসব স্টেশনে।

এঁদের একজন রঙের মিস্ত্রী। তিনি বললেন, "আমার দুটো বাড়িতে রঙের কাজ চলছিল। দুটোই বন্ধ রাখতে হয়েছে আজকে। বাড়ির মালিকরা বলেছে ১০০ টাকার নোটে মজুরী দিতে পারবে না আর ৫০০, ১০০০ অচল। আজ পুরো হাত খালি আমার। কিন্তু সরকার যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন মানতেতো হবেই।"

ছবির ক্যাপশান,

এই দোকানী গতকালের রোজগার কয়েকটা ৫০০ রুপীর নোট আজ পাইকারী বাজারে চালাতে পারেননি।

আরও কয়েকজন দিনমজুর বলছিলেন, "আমরা বহুদূর থেকে এসেছি, কিন্তু কোনও কাজ পেলাম না আজ। দুটো মজুর নিয়ে গেলে ৬০০ বা ৭০০ টাকা মজুরী দেবে - তাও ৫০০ টাকার নোটে। কিন্তু সেই টাকা দুজনে ভাগ করব কী করে? নোটটা তো আর ছিঁড়ে দুভাগ করে দুজনে নিতে পারব না।"

"আমার ঘরে সঞ্চয় করে রাখা কয়েকটা ৫০০ টাকার নোট আছে, এখন সেগুলো চালাব কী করে সেটাই ভাবছি। দোকান-বাজার - কোথাও তো ৫০০ টাকার নোট নিচ্ছে না আর। বাড়িতে বাচ্চা রয়েছে, তাদের খাবার যোগাড় করব কীভাবে জানি না," বললেন আরেক দিনমজুর।

পাশে বসে চা খাচ্ছিলেন কয়েকজন বয়স্ক মানুষ, যাঁদের মধ্যে ছিলেন কয়েকজন পেনশনভোগীও।

এঁরা বলছিলেন, "কালো টাকা বাজেয়াপ্ত করার এই সিদ্ধান্তটা একেবারে ঠিক আছে। আমাদের হয়তো দুদিন একটু অসুবিধা হবে, কিন্তু দেশের উপকারে লাগে এমন কোনও কাজে সেটুকু মেনে নিতে হবে। তবে ব্যাঙ্ক খুললে যেন টাকা জমা দেওয়ার ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা না করা হয়, সেদিকটাও যেন সরকার খেয়াল রাখে।"

"ধুর কালো টাকা-ফাকা কিছুই বন্ধ করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, পাকিস্তান থেকে যে জাল নোট আসে, সেগুলো বন্ধ হবে হয়তো," পাশ থেকে বললেন আরেকজন।

ছবির ক্যাপশান,

পেনশন ভাতা নেয়া বয়স্ক কয়জনের মন্তব্য হলো দেশের উপকারে কাজ করলেও মানুষের যেন হয়রানি না হয় সরকারের সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।

চায়ের দোকানী অবশ্য বলছিলেন, "আমার দোকান চালাতে অসুবিধা হচ্ছে না। চা খেতে এসে তো কেউ আর ৫০০ বা ১০০০ টাকার নোট দেয় না। তাই বেঁচে গেছি।"

ওই স্টেশনের পাশেই বাজার। সেখানকার দোকানীরা কিন্তু ওই চা-দোকানীর মতো বেঁচে যেতে পারেননি।

"কাল দোকানদারী করে যা পেয়েছিলাম, তাতে অনেকগুলো ৫০০ টাকার নোট ছিল। পাইকারী বাজারে আজ সেগুলো দিয়ে কিছুই কিনতে পারলাম না! এদিকে খদ্দেরও আজ সকাল থেকে কম, বেশিরভাগইতো ৫০০ টাকার নোট নিয়েই বাজারে আসে। কয়েকজন চেনা খদ্দেরকে ধারেও সব্জি দিয়েছি - দুদিন পরে দাম দিয়ে যাবে," বলছিলেন এক সবজি বিক্রেতা।

অনেকেই বলছিলেন যে আজ সকাল থেকেই বাজারে অন্যদিনের তুলনায় কম মানুষ এসেছেন।

"বাড়িতে যে কিছু ১০০ টাকার নোট রাখা আছে, সেগুলো দিয়েই চালাতে হবে কয়েকদিন। সরকারী সিদ্ধান্ত না মেনেতো উপায় নেই," বাজার করতে করতে বলছিলেন এক ক্রেতা।

ছবির ক্যাপশান,

ভারতের বাজারে ২০০০ রুপীর নোট

তবে অনেকেরই বাড়িতে ১০০ টাকার নোট খুব বেশি রাখা ছিল না কারণ খুব সহজেই আজকাল ৫০০ টাকার নোট দিয়ে কেনাকাটা করা যায়। ঝামেলায় পড়েছেন সেই সব মানুষ।

"কী মুশকিল দেখুন তো। ৫০০ টাকার নোট অচল, এদিকে বাড়িতে মাংস নিয়ে যেতে হবে, ১০০ টাকার নোটও বেশী নেই। ভাগ্যিস দোকানদার চেনাশোনা, তাই পরে টাকা দেব বলে মাংসটা নিতে পারলাম",বলছিলেন বাজারে মাংস কিনতে আসা এক ক্রেতা।

কলকাতার রাস্তা-ঘাটে যেমন আজ সর্বত্রই নোট অচল হওয়া নিয়েই আলোচনা চলছে, পিছিয়ে নেই সামাজিক মাধ্যমও। ফেসবুক-টুইটারে গত রাত থেকেই কেউ রাগত বা কেউ মজার পোস্ট শেয়ার করছেন বা কমেন্ট করছেন।

ছবিও ঘুরছে অনেক রকম: অচল হয়ে যাওয়া ৫০০ বা ১০০০ টাকার নোটগুলো দিয়ে কী কী করা যেতে পারে, তা নিয়ে।

কেউ যেমন টয়লেট পেপার রোলের বদলে ৫০০ টাকার নোট ফটোশপ করে লাগিয়েছেন, কেউ ছাগলের খাদ্য হিসাবে গামলার মধ্যে অচল নোটের বান্ডিলের ছবি দিয়েছেন, কেউ সেগুলোতে মুড়ি-চানাচুর-বাদামভাজা ভরে ছবি তুলে দিয়েছেন ফেসবুকে!