ভারতে নোট কাণ্ড: বিয়েবাড়ি আর কৃষকদের কিছু ছাড়

  • অমিতাভ ভট্টশালী
  • বিবিসি, কলকাতা
ছবির ক্যাপশান,

ভারতের ব্যাংক আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে প্রতিদিনই পড়ছে লম্বা লাইন

ভারতে, ৫০০ আর ১০০০ রুপির নোট অচল হয়ে যাওয়ার ফলে কৃষকরা যে বড়সড় সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, তার সমাধান করতে আজ সেদেশের সরকার বলেছে, অনুমোদিত শস্য ঋণের বরাদ্দ রুপি চাষিরা তুলে নিতে পারবেন তাদের দৈনন্দিন কৃষিকাজের জন্য।

আবার কৃষক-বাজারগুলি চালু রাখতে ব্যবসায়ীদেরও প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে অনুমতি দিয়েছে সরকার।

কয়েক লক্ষ নিম্ন বিভাগের সরকারী কর্মচারীকে অগ্রিম বেতন দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছে ভারত সরকার।

একই সঙ্গে অচল নোট বদল করার সীমা অর্ধেকের বেশী কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের সমস্যা আরও বাড়ল বলেই মনে করা হচ্ছে।

ধান কাটা আর রবি শস্যবীজ রোয়ার সময় এটা - এক কথায় চাষের ভরা মরসুম। আর তার মধ্যেই গত সপ্তাহে অচল ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল মোট চালু নোটের প্রায় ৮৫%।

৫০০ আর ১০০০ রুপির নোট অচল হয়ে যাওয়ার ফলে কৃষকেরা একদিকে যেমন খরিফ মরসুমের ধান কাটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন দৈনন্দিন খরচের মতো টাকা হাতে না থাকায়, অন্যদিকে রবি মরসুমের ফসল রোয়ার কাজেও দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছিলেন অনেক কৃষক।

ছবির ক্যাপশান,

নোট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষকদের কিছুটা ছাড় দিয়েছে ভারতের সরকার

এই সমস্যার সমাধান করতে ভারতের অর্থ বিষয়ক সচিব শক্তি কান্ত দাস আজ ঘোষণা করেন, "সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষকরা তাঁদের অনুমোদিত কৃষি-ঋণ থেকে প্রতি সপ্তাহে ২৫ হাজার রুপি করে তুলতে পারবেন। কৃষকরা চাষের মরসুমে যাতে সার-বীজ প্রভৃতি ঠিক মতো যোগাড় করতে পারেন, সেজন্যই এই ব্যবস্থা। অন্য দিকে কৃষিজাত পণ্য যাতে ঠিকমতো বেচাকেনা করা যায়, তা নিশ্চিত করতে কৃষক বাজারগুলিতে নিবন্ধনকৃত ব্যবসায়ীরা প্রতি সপ্তাহে ৫০ হাজার রুপি পর্যন্ত ব্যাঙ্ক থেকে তুলতে পারবেন।"

পশ্চিমবঙ্গের শস্যভাণ্ডার বলে পরিচিত বর্ধমান জেলার কৃষক অনুপম বারিক অবশ্য সন্দিহান যে এই নতুন ঘোষণায় তাঁর কতটা সুবিধা হবে।

"আমরা তো ঋণটা আগেই নিয়ে ধানচাষ করে ফেলেছি। বাড়িতে প্রায় একশো বস্তা ধান পড়ে আছে - দুই লক্ষ রুপি দাম পাওয়া যাবে। কিন্তু বিক্রি করতে সাহস পাচ্ছি না কারণ সেই রুপি ব্যাঙ্কে জমা দিতে গেলে জেরার মুখে পড়তে হবে বলে শুনছি। ওদিকে আলুর বীজ রোয়ার সময়ও দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে - সার-বীজও যোগাড় করা যাচ্ছে না, মজুরদের টাকা দিতে পারছি না। আজকের এই নতুন ঘোষণায় আমাদের কী সুবিধাটা হবে?" প্রশ্ন মি. বারিকের।

একদিকে যেমন চাষের মরসুম তেমনই এটা ভারতে বিয়েরও মরসুম। নোট অচলের ঘোষণার পরে সেই সব পরিবারগুলির মাথায় হাত পড়ে গিয়েছিল, যাদের বাড়িতে ছেলে অথবা মেয়ের বিয়ে সামনেই।

বিয়ে এমন একটা অনুষ্ঠান যেখানে মূলত নগদ অর্থেই সব খরচ মেটাতে হয়। কলকাতার বাসিন্দা অনুপ চক্রবর্তী বলছিলেন ছেলের বিয়ের আয়োজন ফেলে তাঁদের নিয়মিত ব্যাঙ্কে গিয়ে লাইন দিতে হচ্ছে নগদ অর্থ যোগাড় করার জন্য।

"যে ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দিয়েছে সরকার, তাতে কী বিয়ের আয়োজন করা যায়? সবাইকে অনুরোধ করছি চেকে টাকা নেওয়ার জন্য। কেউ মানছে, কেউ মানতে চাইছে না। আর কদিন পরেই ছেলের বিয়ে, সেসব ছেড়ে রোজ ব্যাঙ্কে লাইন দিতে হচ্ছে," বলছিলেন মি. চক্রবর্তী।

ছবির ক্যাপশান,

নোট সংকটের মধ্যে সম্প্রতি দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের খনি-সম্রাট বলে পরিচিত ও বি জে পি-র প্রাক্তন মন্ত্রী জনার্দন রেড্ডি তাঁর মেয়ের ব্যয়বহুল বিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে

এঁদের সমস্যা কিছুটা লাঘব করতে অর্থ বিষয়ক সচিব শক্তি কান্ত দাস আজ জানিয়েছেন, যেসব পরিবারে বিয়ে রয়েছে, তাঁরা পরিবার পিছু আড়াই লক্ষ রুপি পর্যন্ত ব্যাঙ্ক থেকে তুলতে পারবেন।

কিন্তু অনুপ চক্রবর্তী বলছিলেন এই ঊর্ধ্বসীমা অন্তত তাঁর ছেলে বিয়ের জন্য যথেষ্ট নয়।

ঘটনাচক্রে আজকের ঘোষণার ঠিক আগেই দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের খনি-সম্রাট বলে পরিচিত ও বি জে পি-র প্রাক্তন মন্ত্রী জনার্দন রেড্ডি তাঁর মেয়ের বিয়েতে এত রুপি খরচ করেছেন, যাতে সেটিকে বিশ্বের সবথেকে ব্যয়বহুল বিয়ের অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম বলে ধরা হচ্ছে।

আনুমানিক প্রায় ৫০০ কোটি রুপি খরচ করা হয়েছে ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে।

যখন নগদ অর্থের সমস্যায় লক্ষ লক্ষ মানুষ জেরবার, ঠিক সেই সময়েই বি জে পি-র এক প্রাক্তন মন্ত্রীর এই বিপুল অর্থ ব্যয় করা নিয়ে ভারতে যথেষ্ট বিতর্কও চলছে।