বিনাবিচারে আটক বন্দীদের মুক্তির জন্য আইনী উদ্যোগ

  • আহ্‌রার হোসেন
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশ, জেল

ছবির উৎস, STR

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশে বিনাবিচারে কারাবন্দী লোকের সংখ্যা কত তা অজানা

বাংলাদেশে কারাগারগুলোতে ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিনাাবিচারে আটক থাকা বন্দীদের আইনী সহায়তা এবং পর্যায়ক্রমে মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের এক নির্দেশের পর। দেশের ৬৭টি কারাগারে এরকম বন্দীর সংখ্যা কত - তা কারো জানা নেই।

সম্প্রতি চার ব্যক্তিকে বিনা বিচারে বহু বছর কারাগারে আটকে রাখার এক ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট বেরুনোর পর এর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে হাইকোর্ট।

সুপরিচিত আইনজীবী এবং সাবেক আইন মন্ত্রী শফিক আহমেদ বলছেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছে যার মূল কথা হচ্ছে : প্রত্যেক জেলায় যে 'লিগ্যাল এইড' কমিটিগুলো আছে তারা এবং কারাগারগুলোর প্রিজনার ইন-চার্জ মিলে বিনাবিচারে কতজন বন্দী আটক আছেন তার একটি তালিকা তৈরি করবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, গত সপ্তাহেই সুপ্রিম কোর্ট থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি কারাগারের প্রধানের কাছে সেই নির্দেশনাটি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ।

এই তালিকা অনুযায়ী লিগ্যাল এইড তাদের আইনগত সহায়তা দেবে এবং মুক্ত করার ব্যবস্থা করবে - বলেন মি. আহমেদ।

সারা বাংলাদেশের যে সাতষট্টিটি কারাগার রয়েছে - সেগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বিনাবিচারে আটক বন্দীর সংখ্যা কত সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন তথ্য নেই।

ছবির উৎস, FARJANA KHAN GODHULY

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

যে চারজন বিনাবিচারে আটক থাকা বন্দীর ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট বেরিয়েছে, এবং তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হাইকোর্ট - তারা বিভিন্ন মামলায় সর্বনিম্ন চৌদ্দ এবং সর্বোচ্চ ১৮ বছর ধরে কারাগারে আটক থাকলেও এখনও তাদের মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়নি।

গত সপ্তাহান্তেই এমনই আরেকজন বন্দীকে ১৫ বছর আটক থাকার পর হাইকোর্টের নির্দেশে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়।

মূলত ঢাকার একজন টিভি সাংবাদিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারিত হবার পর এসব ঘটনা উচ্চ আদালতের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশে এরকম বহু ঘটনা রয়েছে। শুধুমাত্র কাশিমপুর কারাগারেই এই মুহুর্তে ৫ বছরের বেশী সময় ধরে বিচারাধীন মামলার আসামী রয়েছেন ত্রিশ জন।

ঢাকার শ্যামপুরে একটি হত্যা মামলার আসামী হিসেবে গত ১৭ বছর ধরে কারাবন্দী চাঁন মিয়া। মতিঝিলের সেন্টু কামাল কারাগারে আছেন ১৫ বছর ধরে, মাদারীপুরের মকবুল হোসেন ১৬ বছর এবং কুমিল্লার বিল্লাল হোসেন চৌদ্দ বছর ধরে কারাবন্দী।

এরা সবাই আলাদা আলাদা হত্যা মামলার আসামী, সবাই রয়েছেন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে, এবং এদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর আজো নিষ্পত্তি হয় নি।

ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশন, চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের প্রতিবেদক মাসুদুর রহমানের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এদের খবর।

এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে আমলে নিয়েই বাংলাদেশের হাইকোর্ট রবিবারএকটি রুল জারি করে জানতে চেয়েছে, এদেরকে আটকে রাখা কেন অবৈধ নয়।

ছবির উৎস, ফোকাসবাংলা

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশের নতুন কেন্দ্রীয় কারাগার

সেই সাথে এদেরকে আগামী চৌঠা ডিসেম্বর মামলার নথিপত্র সহ এদেরকে আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মাসুদুর রহমান এর আগেও আরেক কারাবন্দীকে নিয়ে আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলেন এবং সেই প্রতিবেদন প্রচারিত হবার পর মো: শিপন নামে ১৬ বছর ধরে বিনা বিচারে বন্দী এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে মুক্তি দেবার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।

শিপনকে গত সপ্তাহান্তেই কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। সে এখন ঢাকার পুরনো অংশের সূত্রাপরে পরিবারের সাথে বাস করছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে।

কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বনিক বিবিসিকে বলছেন, কারাগারটিতে এ ধরণের বিচারাধীন মামলার আরো কিছু আসামী রয়েছে।

অবশ্য সারা বাংলাদেশের বাকী যে সাতষট্টিটি কারাগার রয়েছে সেগুলোতে এরকম দীর্ঘদিন ধরে বিনা বিচারে বন্দীর সংখ্যা কত সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন তথ্য নেই।

তবে বাংলাদেশে বিচার কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়টি সর্বজন বিদিত এবং এরকম বন্দীর সংখ্যা যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হবে সেটা কাশিমপুর কারাগারের এই বিনা বিচারে বন্দীর সংখ্যা দেখেই অনুমান করা যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এরা কেন এই পরিস্থিতিতে পড়েছেন? বিচার কার্যক্রম শেষ হতে যদি দীর্ঘ সময় লেগে যায়, তাহলে তারা জামিন পাচ্ছেন না কেন?

বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত আইনজীবী এবং সাবেক আইন মন্ত্রী শফিক আহমেদ বলছেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছে যার মূল কথা হচ্ছে : কারাগারগুলোতে ৫ বছরের অধিক সময় ধরে বিনা বিচারে আটকে থাকা আসামীদের সংখ্যা এবং বৃত্তান্ত যত দ্রুত সম্ভব পাঠিয়ে দিতে হবে।

আর জেলাগুলোর লিগ্যাল এইড কমিটিকে বলা হয়েছে, এদের মধ্যে যাদের আইনজীবী নিয়োগ করবার সঙ্গতি নেই তাদেরকে প্রয়োজনীয় আইনী সহায়তা দিতে হবে।