১০০ নারী: ছায়ায় লুকানো নারী ক্যামেরাপার্সনরা

নুসরাত নাহার নাজনীন ছবির কপিরাইট Nusrat Nahar
Image caption নুসরাত নাহার নাজনীন

বাংলাদেশে এই মুহুর্তে ২৭টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আছে, যাদের প্রায় সকলেরই সংবাদ এবং সংবাদভিত্তিক নানা অনুষ্ঠানমালা রয়েছে। সেসব অনুষ্ঠান তৈরির সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেন নারীকর্মীরাও।

তবে সংবাদে ক্যামেরার পেছনে কাজ করেন হাতে গোনা অল্প কয়েকজন নারী।

বাংলাদেশে টেলিভিশন সম্প্রচারে গত দুই দশকে অনেক পরিবর্তন হলেও এক্ষেত্রে কেন অগ্রগতি নেই?

নুসরাত নাহার নাজনীন ঢাকার বেসরকারি চ্যানেল সময় টিভির বার্তা বিভাগে ক্যামেরাপার্সন বা ভিডিও জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন।

২০১০ সালে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতেই একটি বেসরকারি চ্যানেলে ক্যামেরাপার্সন হিসেবে কাজ শুরু করেন।

তখন বেশিরভাগ অনুষ্ঠানেই দেখা যেত ক্যামেরা কাঁধে তিনিই হয়ত একমাত্র নারী।

নুসরাত বলছেন গত ছয় বছরে সেই পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি।

"মাঠে যখন কাজ করতে হয়, তখন বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ধরুন মিছিল হচ্ছে, সেখানে হয়ত পুলিশ টিয়ার শেল ছুঁড়ছে বা লাঠিচার্জ করছে। তো এ ধরনের পরিস্থিতি মেয়েদের জন্য একটু চ্যালেঞ্জিং তো বটেই।"

তিনি বলেন, "অনেক প্রতিবন্ধকতার একটি হলো আমাদের সমাজে মেয়েরা ক্যামেরার পেছনে কাজ করবে সেটা অনেকেই ভাবতে পারেন না। তাছাড়া মানুষ ভাবে মেয়েরা 'সফ্ট' ধরণের কাজ করবে।"

ছবির কপিরাইট Nusrat Nahar
Image caption প্রশিক্ষণ নিতে আসা মেয়েদের সংখ্যাও অপ্রতুল।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বেসরকারি চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ।

এই মুহূর্তে দেশে সেই সংখ্যা ৩০টির কাছাকাছি। আর লাইসেন্স পেয়ে সম্প্রচারের অপেক্ষায় রয়েছে আরো কয়েকটি চ্যানেল।

নুসরাত জানাচ্ছেন, এসব চ্যানেলে সব মিলে ক্যামেরাপার্সন বা ভিডিও জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন মাত্র পাঁচজন নারী। এছাড়া শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ করছেন অল্প কয়েকজন।

তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশে পেশাগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের যথেষ্ঠ সুযোগের অভাবও রয়েছে। কিন্তু যারা প্রশিক্ষণ দেন, তাদের বক্তব্য প্রশিক্ষণ নিতে আসা মেয়েদের সংখ্যাও অপ্রতুল।

আর যারা প্রশিক্ষণ নেন সকলেই কি সংবাদে কাজ করেন?

পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের ব্রডকাষ্ট এ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া বিভাগের প্রধান জয় পিটার বলেন, "আমাদের এখানে ডিরেকশন, এডিটিং এবং ক্যামেরা অপারেশন শিখতে আসে মেয়েরা। কিন্তু ক্যামেরা অপারেশনে দেখা যায় প্রতি ১২জনে সর্বোচ্চ মাত্র দুইজন। এর মধ্যে যারা চাকরি পেয়েছে, কিন্তু পরে তারা পেশা পরিবর্তন করে ফেলে।"

তবে, জয় পিটার বলছেন, অল্প হারে হলেও মেয়েদের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সেই হার এখনো চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে যখনই ক্যামেরাপার্সন বা চিত্রগ্রাহক পদে নিয়োগের জন্য লোক খোঁজা হয়, বেশিরভাগ সময় সেখানে নারী কোন আবেদনকারীই থাকেন না বলে জানান বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জ.ই. মামুন।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption জ. ই মামুন ফেসবুক

"মেয়েরা যে টেকনিক্যাল সাইডে কাজ করতে পারে, এ ধারণাই মানুষের ছিল না। তারা যে ভিডিও এডিটিং এর কাজ করতে পারে, তারা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর কাজ করতে পারে, তারা যে ক্যামেরাপার্সন হিসেবে কাজ করতে পারে - এই ধারণা তৈরি হয়েছে গত ১০ বছরে।"

আবার অনেক সময়ই বলা হয়, নিয়োগকারীরা সংবাদ সংগ্রহের জন্য ক্যামেরার পেছনে একজন নারীকে নিয়োগ করতে ঠিক ভরসা পান না।

নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর যোগ্যতা নাকি তার লিঙ্গ পরিচয় কোনটিকে বিবেচনায় নেয়া হয়, এই প্রশ্নের জবাবে মি. মামুন বললেন, দুটো বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হয়।

"নিয়োগের ক্ষেত্রে আামি অবশ্যই চিন্তা করি সে পারবে কিনা - তা সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক। কিন্তু দ্বিধার বিষয়টি হচ্ছে, আমার সহকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো বলেন, আমার পক্ষে তো রাতের শিফ্টে কাজ করা সম্ভব নয়, বা আমি খুব ভোরে অ্যাসাইনমেন্টে যেতে পারবো না। যেটি অনেক সময় নিয়োগকর্তাদের মনে উদ্বেগ তৈরি করে।"

তবে, সময় টিভি নুসরাত বলছিলেন, অনেক নারীই এ পেশায় এলেও দ্রুতই পেশা পরিবর্তন করে ফেলছেন।

আর সেক্ষেত্রে কেবল পরিবার বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করলেই হবে না। একজন চিত্রগ্রাহককে ধরে রাখার জন্য একটি বড় দায়িত্ব নিতে হবে প্রতিষ্ঠানকেও।

আর তাহলেই সংবাদ সংগ্রহ এবং পরিবেশনে নারীদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথেই বাড়বে ক্যামেরার পেছনে নারীদের উপস্থিতিও।

সম্পর্কিত বিষয়