ভারতে রুপির নোট অচলে ভোগান্তিতে বিদেশি পর্যটকরা

  • শুভজ্যোতি ঘোষ
  • বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ছবির ক্যাপশান,

ভারতে আসা পর্যটকদের অনেককে সফর বাতিল করে ফিরে যেতে হয়েছে।

ভারতে পাঁচশো ও হাজার রুপির পুরনো নোট অচল হয়ে যাওয়ার পর যে হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, তাদের দুর্দশা লাঘব করার জন্য সরকারের উদ্যোগ এখনও এক পা-ও এগোয়নি।

দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ স্বীকার করেছে, এই লক্ষ্যে গঠিত আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটি গত ১০দিনের ভেতরেও তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করতে পারেনি।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ-সহ নানা দেশ থেকে ভারতে আসা পর্যটকরা টাকা ভাঙাতে বিরাট সমস্যায় পড়েছেন - অনেককে সফর বাতিল করে ফিরেও যেতে হয়েছে।

কলকাতায় বাংলাদেশের উপদূতাবাস অবশ্য বিবিসিকে জানিয়েছে, চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা বাংলাদেশী রোগীদের সাহায্য করতে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।

৮ নভেম্বর মধ্যরাতের পর ভারতে পাঁচশো ও হাজারের নোট অচল হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েন এদেশে আসা বিদেশিরা - কারণ ভারতের কোনও পরিচয়পত্র দেখিয়ে এদেশের ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসে টাকা বদলানোর সুযোগ তাদের ছিল না, এবং এখনও তা নেই।

হাতে নতুন নোট না-থাকায় মানি-চেঞ্জার বা ফরেক্স ডিলাররাও তাদের বিদেশি অর্থ বদলে দিতে পারছিলেন না।

১৫ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয় - যাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বিদেশি নাগরিকদের এই ভোগান্তিটা লাঘব করা। কিন্তু সেই কমিটি তৈরি হওয়ার দশদিন পরও তারা আজ পর্যন্ত কোনও প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে পারেনি।

ছবির ক্যাপশান,

হায়দ্রাবাদে পোস্ট অফিসে টাকা ভাঙাতে এসেছিলেন এই মহিলারা। সময় শেষ হওয়ার পর পুলিশ তাদের চলে যেতে বলেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ এদিন জানান, "বিদেশি পর্যটক বা চিকিৎসার জন্য আসা বিদেশিদের সমস্যাগুলো দেখার জন্য যে আন্ত:মন্ত্রণালয় টাস্ক ফোর্স গড়া হয়েছিল, তারা নিয়মিত বৈঠক করলেও এখনও কোনও সুপারিশ করতে পারেনি।"

"আসলে একটা বৈঠকেই সব ঠিক করা সম্ভব নয়, নানা দিক বিবেচনা করেই এই টাস্ক ফোর্স তাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো জানাবেন - তাই সময় লাগছে", জানিয়েছেন তিনি।

পশ্চিমী দেশগুলোর পর্যটকরা অধিকাংশই ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন বলে তাদের সমস্যা কিছুটা কম হচ্ছে - কিন্তু বাংলাদেশ থেকে নগদ টাকা, রুপি বা ডলার নিয়ে আসা পর্যটকরাই এখন সবচেয়ে বিপাকে।

যাদের প্রিয়জনরা ভারতের নানা হাসপাতালে ভর্তি, তারা কীভাবে মোটা অঙ্কের বিল মেটাবেন সেটাও এখন একটা বড় দুশ্চিন্তা।

কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রদূত জকি আহাদ বিবিসিকে বলছিলেন, বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখার জন্য তারা এর মধ্যেই কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেছেন।

তিনি জানান, "হাসপাতালগুলো যে অধিদপ্তরের আওতায়, তাদেরকে গত ১০ তারিখেই চিঠি লিখে আমরা বলেছি আমাদের রোগীদের বিষয়টা যাতে সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হয় সে জন্য তারা যেন হাসপাতালগুলোকে অনুরোধ করেন।"

"আসলে টাকা তো আছে সবার কাছেই, কিন্তু ডিমনিটাইজেশনের কারণে তারা পেমেন্ট করতে অসুবিধায় পড়ছেন। কিন্তু এজন্য যেন তাদের চিকিৎসা কোনও ভাবেই বন্ধ না-হয়, সেই ব্যবস্থা করাটাই ছিল আমাদের লেখার উদ্দেশ্য", বলছিলেন মি আহাদ।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাঙ্কের যে শাখাটি কলকাতা শহরে রয়েছে, সুরাহার আশায় অনেক বাংলাদেশী পর্যটক ভিড় করছেন সেখানেও - যদিও সেখানে তাদের সাহায্য করার অবকাশ সীমিত, বলছিলেন ডেপুটি হাইকমিশনার।

তিনি জানান, সোনালী ব্যাঙ্কের ওই শাখাটিও ভারতের মনিটরি পলিসির আওতাতেই কাজ করছে - এবং বাংলাদেশীরা যদি দেশ থেকে আসার সময় তাদের পাসপোর্টে ডলার 'এনডোর্স' করিয়ে আনেন, সেটুকুই কেবল ওখানে ভাঙানো সম্ভব।

ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রগুলোও পর্যটকদের বিশেষ কাজে আসছে না, কারণ তাদের নিজেদের কাছেই নতুন নোটের সরবরাহ অপ্রতুল।

আয়ুশ ফোরেক্সের সুরিন্দর শর্মা যেমন বলছিলেন, "অল্পস্বল্প পরিমাণ হলে আমরা সেটা ভাঙিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু বড় অঙ্কের ফরেন এক্সচেঞ্জ ভাঙানোর উপায় নেই। কারণ সাপ্লাই কম, আর আমাদের লেনদেন বজায় রাখার জন্যও তো হাতে কিছু রাখতে হবে!"

এই চরম বিশৃঙ্খলা আর হেনস্থার মধ্যেই ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং এদিন পার্লামেন্টে সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে বলেছেন, নোট বাতিলের নামে যা হয়েছে তা একটা 'সংগঠিত ও আইনসিদ্ধ লুঠতরাজ' ছাড়া কিছু নয়।

দেশের প্রবৃদ্ধি এতে অন্তত ২ শতাংশ কমে যাবে বলেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন - যদিও এই সিদ্ধান্ত কোনও মতেই পালটাবে না, এটাই সরকারের অবস্থান।