ভারতে অচল রুপি সঙ্কটে বেতন পেতে বহু মানুষের দুর্ভোগ

ভারতে ৫০০ ও ১০০০ রুপি নোট অচল ঘোষণার পর দুর্ভোগ কাটছে না ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ভারতে ৫০০ ও ১০০০ রুপি নোট অচল ঘোষণার পর মানুষের দুর্ভোগ কাটছে না

ভারতে পাঁচশো ও হাজার রুপির পুরনো নোট অচল ঘোষণার পর আজ প্রথম মাসের পয়লা দিনে বেতন পেতে ও দিতে বহু মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

যাদের মাইনে বা পেনশন ব্যাঙ্কে জমা পড়েছে, তারা অনেকেই এখনও সেই টাকা তুলতে পারেননি। আবার যারা নগদে মাইনে পেতে অভ্যস্ত, তাদের মালিকরা টাকা জোগাড় করতে না-পেরে বিকল্প সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছেন।

গৃহপরিচারিকা, গাড়ির চালক বা রাঁধুনিরা অনেকেই জীবনে প্রথম মাইনে পেয়েছেন মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাঙ্ক ট্রান্সফারের মাধ্যমে। ওদিকে বহু ব্যাঙ্ক বা এটিএমেই টাকা ফুরিয়ে গেছে বা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম আসছে।

গত মাসের ৮ তারিখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাটকীয় ঘোষণার পর আজ ১লা ডিসেম্বর, প্রথম মাসমাইনের দিনে আমজনতার সঙ্কট আরও বাড়বে, এই আশঙ্কা ছিলই।

যদিও দেশের কোটি কোটি সরকারি কর্মচারী ও সংগঠিত খাতের বেসরকারি কর্মীরাও আজকাল সরাসরি নিজেদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই বেতন পেয়ে থাকেন, কিন্তু তারপরও সেই মাইনের টাকা তারা প্রয়োজন অনুযায়ী তুলতে পারবেন কি না সেই সন্দেহ ছিল।

দিল্লির ডিফেন্স কলোনিতে একটি শাটার-ফেলা এটিএম মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে তরুণ সাহিল চৌধুরী বলছিলেন সেই আশঙ্কা পুরোপুরি সত্যি হয়েছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption এটিএমগুলোও ঠিকমত কাজ করছে বলে হতাশ মানুষ

তার কথায়, "২৮ তারিখে ব্যাঙ্কে মাইনে জমা পড়ার পর গত তিনদিন ধরে আসছি - কিন্তু ব্যাঙ্কে টাকা ফুরিয়ে যাওয়ায় রোজ ফিরে যেতে হচ্ছে। আমি রাতের শিফটে কাজ করে রোজ সকালে লাইনে দাঁড়াই, কিন্তু প্রতিদিনই হতাশ হতে হয়। অথচ আমি এই সিদ্ধান্তের সমর্থক ছিলাম, কিন্তু এটার বাস্তবায়ন মোটেই ঠিকঠাক হচ্ছে না।"

"আরে সব কিছু ক্যাশলেস হয় না কি? বাসে-ট্রেনে টিকিট কাটবেন কীভাবে? এত অসুবিধা হচ্ছে ... আমার বাড়িওলা বলেছে চেক নেবে না, আর ভাড়া না-পেলে বাড়ি থেকে বের করে দেবে!" বলছেন তিনি।

বৃদ্ধ পেনশনাররাও সাধারণত মাসের গোড়াতেই তাদের গোটা মাসের প্রয়োজনীয় খরচটা ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিস থেকে তুলে রাখেন, কিন্তু এবারে তারাও গভীর সমস্যায়।

পাটনার রামশরণ যাদব যেমন বলছিলেন তিনি সাধারণত প্রতি মাসে ১৫ হাজার করে তোলেন, কিন্তু ব্যাঙ্ক তাকে এখন দশের বেশি দেবে না।

আর চিরকাল তিনি চেক আর পাসবই ব্যবহার করেই টাকা তুলেছেন, কখনও প্লাস্টিক কার্ডের প্রয়োজন হয়নি। এখন কার্ড না-থাকায় ভীষণ মুশকিল হচ্ছে, কারণ 'এত কষ্ট করে কতবার আর লম্বা লাইনে দাঁড়ানো যায়?'

এই সঙ্কটের মধ্যেই অনেকে আবার নতুন নতুন সমাধানও খুঁজে নিচ্ছেন। পেটিএম, ফ্রিচার্জ বা মোবিকুইকের মতো মোবাইল ওয়ালেট গত কয়েকদিনে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে - ভারতের সাইবার ক্যাপিটাল ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা সুরথ বসু তো এমাসে খবরের কাগজের পয়সা মিটিয়েছেন পেটিএম দিয়ে।

মি বসু বিবিসিকে বলছিলেন, "এ মাসে কাজের লোকদের মাইনে দেওয়াটা সত্যিই একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে যখন দেখলাম কাগজওলার নিজস্ব পেটিএম অ্যাকাউন্ট আছে, তখন তার পয়সাটা কিন্তু আমি আমার পেটিএম থেকেই দিয়ে দিলাম। আগে কখনও আমি এটা ব্যবহার করিনি, কাজেই এটা করতে পেরে আমি এবারে বেশ খুশি।"

কিন্তু বাড়ির কাজের লোক, রাঁধুনি, ড্রাইভার, পাড়ার নিরাপত্তারক্ষী - এদের সবার তো পেটিএম বা ওই ধরনের ওয়ালেট নেই?

সুরথ বসু জানাচ্ছেন, "এদের অনেকের অবশ্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে। আমার রান্নার লোকের মাইনে আমি তার অ্যাকাউন্টেই পাঠিয়ে দিয়েছি। আর যাদেরকে তার পরেও ক্যাশে মাইনে দিতে হচ্ছে - তাদেরকে কিছুটা দিয়েছি, আর বলেছি বাকিটা যেমন হাতে টাকা পাব সেভাবে আস্তে আস্তে দেব!"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption জন দুর্ভোগে ভারতের নানা জায়গায় চলছে বিক্ষোভ

ফলে ভারতে অসংগঠিত খাতের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক এ মাসেই প্রথম মাইনে পেলেন ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে - যদিও সেই টাকা কীভাবে তুলতে বা খরচ করতে হবে তাদের অনেকেরই সেই ধারণা নেই।

সুরাটে এক কর্মচারী বলছিলেন সব্জিওলা, দুধওলারাও যাতে কার্ডে টাকা নিতে পারে সরকারের উচিত এখন তার ব্যবস্থা করা।

তিনি জানাচ্ছেন, "আমার স্যালারি অ্যাকাউন্টে আজ ১৮ হাজার জমা পড়লেও দশের বেশি তুলতে পারছি না। এখন যদি শাকসব্জি বা দুধের দোকানে কার্ড সোয়াইপ মেশিনের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলেই আমি খরচ সামলাতে পারব। নয়তো চালাতে হবে কষ্টেসৃষ্টে।"

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যেই বলেছেন, দেশে কালো টাকার কারবার চিরতরে বন্ধ করতে তার লক্ষ্য হল ভারতকে একটি নগদহীন বা 'ক্যাশলেস সোসাইটি' হিসেবে গড়ে তোলা।

কিন্তু নগদের ওপর নির্ভরতা কমানোর এই চেষ্টা যে রীতিমতো যন্ত্রণাদায়ক হতে যাচ্ছে - তা আজ বৃহস্পতিবার স্পষ্ট হয়ে গেছে মাসের পয়লা তারিখে বেতন তোলার দিনেই।

সম্পর্কিত বিষয়