লেবাননের দীর্ঘ ও তিক্ত গৃহযুদ্ধ শেষ হয়েছিল কীভাবে

পূর্ব বৈরুতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ওপর সিরীয় বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণে লেবানী সেনাবাহিনীর সবচেয়ে স্পষ্টবক্তা খ্রিস্টান সেনা অধিনায়ক জেনারেল মিশেল আউনকে প্রাসাদ থেকে উৎখাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল লেবাননের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ।

লেবাননের প্রবীণ সাংবাদিক হানা আনবার বিবিসির লুইস হিডালগোকে বলেছেন এই তিক্ত রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ও তা অবসানের কথা।

মিঃ আনবার সেসময় ছিলেন আরবী ভাষার এক সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক। পত্রিকাটির সদরদপ্তর ছিল প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ৫০০ গজের মধ্যে।

"ওই প্রাসাদে আমরা যেতাম প্রত্যেকদিন। আউন তখন ওই এলাকায় হিরো । কারণ যেসব মিলিশিয়া তখন দেশে অসন্তোষের মূলে তাদের তিনি হঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সিরীয়দেরও বিতাড়িত করার অঙ্গীকার করেছেন।সবার জন্য সুখ ও শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।"

কিন্তু মিঃ আনবার বলছেন বাস্তবে তা ঘটে নি।

লেবানন সেনা বাহিনীর অধিনায়ক ম্যারোনাইট খ্রিস্টান মিশেল আউন ১৯৮৮ সালে লেবাননে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠি এবং বিদেশি সমর্থনপুষ্ট উপদলগুলোর মধ্যে তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের পটভূমিতে অর্ন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হন।

ছবির ক্যাপশান,

বাবদা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের সামনে ১৯৮৯র ২৮শে অক্টোবর বিক্ষোভকারীদের সামনে বক্তব্য রাখছেন জেনারেল আউন।

ক্ষমতায় বসার কথা ছিল একজন মুসলমানের, কিন্তু সিরীয়রা সেটা অনুমোদন করে নি। সিরিয়া তখন লেবাননে শক্ত অবস্থানে।

১৯৭৫ সালে প্রায় যুদ্ধ শুরুর সময় থেকেই সিরীয় সৈন্যরা সেখানে অবস্থান করছে।

পরের বছরই আউনকে বরখাস্ত করা হয়, কিন্তু তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হন নি। বদলে তিনি সিরীয়দের বিরুদ্ধে তাঁর ভাষায় "স্বাধীনতার যুদ্ধ" ঘোষণা করেছিলেন - প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাদের তিনি লেবানন ছাড়া করবেন।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী খ্রিষ্টান মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধেও লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। আউন ছিলেন ঘোর সিরিয়া বিরোধী ।

লেবাননে পনের বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে মানুষ ক্লান্ত আর হতাশ হয়ে পড়েছিল। সবচেয়ে বিধ্বংসী ছিল শেষের দুটো বছর।

হানা আনবার বলছেন গোলাগুলি চলত প্রতিদিন। শুরু হত বিকেল চারটা নাগাদ- থামত ভোর চারটেয়।

"এরপর সকাল হলে লোকজন কাজে যেত- বাজারহাট করত। ঘরে কিনে রাখত পর্যাপ্ত মোমবাতি, ট্রানজিস্টার রেডিওর জন্য ব্যাটারি, আর পর্যাপ্ত জনি ওয়াকার হুইস্কির বোতল। বিকেল চারটের মধ্যে ঘরে বা আশ্রয়ে ঢুকে যেত তারা। এভাবেই চলত জীবন।

খাবারের খুবই অভাব ছিল। মিঃ আনবার বলছেন দুঃখকষ্ট ভুলতে মদে আসক্তি জন্মাচ্ছিল মানুষের।

"কী করবে মানুষ? সবকিছু ভোলার ওটাই ছিল একমাত্র রাস্তা। সকালে আপনি বাড়ি থেকে বেরচ্ছেন- জানেন না ফিরে কী দেখবেন- বাড়িটা আস্ত আছে নাকি জানলা দরজা ভেঙে পড়েছে - সবই তো ভাগ্যের উপর।"

পরিবারের সদস্যদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেবার সামর্থ্য আর শারিরীক সক্ষমতা যাদের ছিল -তারা পালিয়েছিল। কিন্তু যাদের তা ছিল না তারা পারে নি, যুদ্ধের মধ্যে আটকে গিয়েছিল।

ছবির ক্যাপশান,

৩০শে সেপ্টেম্বর ১৯৯০ বৈরুতে বাবদা প্রাসাদের সামনে মিশেল আউনের সমর্থকরা

হানা বলেছেন ওই কঠিন দিনগুলোতে কীভাবে তারা সেনাবাহিনীর টেলিফোন, সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবহার করে খবর সংগ্রহ করতেন।

এরপর ১৯৯০এর গ্রীষ্মে সবকিছু বদলে গেল। দোসরা অগাস্ট সিরিয়ার প্রতিবেশি দেশ ইরাক কুয়েত আক্রমণ করল।

আমেরিকা সিরিয়াকে পাশে পেতে চাইল। ইরাককে হঠাতে আমেরিকা তখন যে আন্তর্জাতিক জোট গঠন করছিল তার জন্য সিরিয়াকে পাশে দরকার। এই সহযোগিতার জন্য সিরিয়ার পুরস্কার ছিল লেবানন।

সিরিয়াকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল পূর্ব বৈরুতে তখন যারা বিদ্রোহী বলে পরিচিত তাদের বিদ্রোহ দমন করা হবে। এই বিদ্রোহীদের মধ্যে ছিলেন মিশেল আউন যিনি তখন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ দখল করে বসে আছেন।

শুরু হল ১৫ বছর ধরে সংঘাতে জর্জরিত বৈরুত মুক্ত করতে চরম লড়াই। শুরু হল বৈরুতের আকাশ থেকে তীব্র আক্রমণ।

খবরে বলা হচ্ছে প্রতি মিনিটে তখন ৪০টি করে গোলা ও রকেট ছোঁড়া হচ্ছে । প্রতিদিন গড়ে বিশ জন করে প্রাণ হারাচ্ছে। আহতের সংখ্যা প্রতিদিন শ'খানেক। আনুমানিক হিসাবে দেড় লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যেই মারা গেছে। আসল সংখ্যা বলা হচ্ছে সম্ভবত আরও অনেক বেশি।

ছবির ক্যাপশান,

১৩ই অক্টোবর ১৯৯০- সিরীয় সেনাদের বিজয়োল্লাস

শেষ লড়াইয়ের তারিখ নির্ধারন করা হল ১৩ই অক্টোবর।

বাবদার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ছিল পাহাড়ের উপর। ওই পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা গেল পূর্ব বৈরুতের সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক সাজোঁয়া বহর।

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সবাই আউনকে প্রাসাদ ছেড়ে যাবার জন্য অনুরোধ করেছিল। আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিল- বলেছিল তাকে মন্ত্রীর পদ দেওয়া হবে।

কিন্তু আউন তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন।

তার বক্তব্য ছিল তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে আমেরিকানরা সিরিয়াকে পূর্ব বৈরুতে ঢুকতে দেবে না। কিন্তু তিনি জানতেন না সেগুলো ছিল মিথ্যা আশা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি । শেষদিন পর্যন্ত তিনি সেটা বুঝতে পারেন নি।

আক্রমণ চালানোর গোটা ঘটনাটা ছিল নাটকীয়।

প্রাসাদের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ এবং বিভিন্ন এলাকায় তুমুল লড়াইয়ের মধ্যে আউন এবং তার দুই মন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হল ফরাসি দূতাবাসে ।

সেই দিন পূর্ব বৈরুতে প্রাণ হারিয়েছিল প্রচুর মানুষ।

মিশেল আউনের অনুগত সেনারা মরণপণ লড়াই করেছিল। ঊর্ধ্বতন অনেক সামরিক কর্মকর্তা যারা আটক হয়েছিলেন তাদের সিরিয়া নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের আর কোনো খবর পাওয়া যায় নি।

ছবির ক্যাপশান,

১৩ই অক্টোবর ১৯৯০- মিশেল আউনের অনুগত সেনাদের বন্দী করে পাহারা দিচ্ছে দুজন সিরীয় সৈন্য।

পূর্ব বৈরুতের মানুষ যখন বাঙ্কার থেকে বাইরে আসে তখন তাদের অনেকেই আউনের জন্য শোক প্রকাশ করলেও তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল।

লেবাননের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায় মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরছিল খুশিতে। ট্রাকে করে আসতে শুরু করেছিল খাবারদাবার, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস- যা পূর্ব বৈরুতের মানুষ বহুদিন দেখেনি।

ধীরে ধীরে মানুষ আসলে উপলব্ধি করেছিল কী ঘটেছে- সিরিয়ার ভূমিকা কী ছিল।

বহুদিন পর্যন্ত সিরিয়ার দখলদারিত্ব মানুষকে মেনে নিতে হয়েছিল।

২০০৫ সালে সিরিয়া লেবানন ছেড়ে যায়। ওই বছরই ফ্রান্সে নির্বাসন থেকে ফিরে আসেন জেনারেল মিশেল আউন।

হানা আনবার এখনও থাকেন ও কাজ করেন বৈরুতে।

ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্ব পরিবেশন করেছেন মানসী বড়ুয়া।