দুশো বছরের পুরনো একটি পাঠাগারকে বাঁচানোর যুদ্ধ

পাঠাগারটিতে আছে ৫৫ হাজারেরও বেশি বই
ছবির ক্যাপশান,

পাঠাগারটিতে আছে ৫৫ হাজারেরও বেশি বই

আপনি যখন পাঠাগারটির ভেতরে ঢুকবেন তখন চারপাশের সবকিছু দেখে বিস্ময়ে আপনার দম বন্ধ হয়ে আসতে পারে।

যতোই ভেতরে যাবেন ততোই আপনার চোখে পড়বে একটার পর একটা বিশাল বিশাল বুকশেলফ, সারি সারি করে সাজানো।

একেকটা শেল্ফ মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে।

মনে হতে পারে যে আপনি হয়তো বইয়ের ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে আছেন।

লাইব্রেরিটির নাম মাদ্রাজ লিটেরারি সোসাইটি। এর বয়স ২০৪ বছর।

এটি ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় চেন্নাই শহরের মাঝখানে।

৫৫,০০০ বই

পাঠাগারটিতে আছে ৫৫,০০০ এরও বেশি বই। এখানকার কোন কোন গ্রন্থ বা দলিল ১৫০ থেকে ৩০০ বছর পর্যন্ত পুরনো।

ছবির ক্যাপশান,

পাঠাগারটিকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে একদল তরুণ

পাঠাগারের দালানটি বাইরে থেকে দেখলে লাল ইঁটের তৈরি। নির্মিত হয়েছে ১৯০৫ সালে। এর স্থাপত্য শৈলীতে ব্রিটিশ ভারতের নমুনা স্পষ্ট।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলো ১৮১২ সালে।

কোম্পানির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে প্রশাসন, ভাষা, আইন, ধর্ম, ভারতীয় রীতি নীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যে এটি তৈরি করা হয়েছিলো।

শুরুতে পাঠাগারটি ছিলো সেন্ট জর্জ কেল্লায়। ১৮১২ থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত। তারপর ১৯০৫ সালে এটি বর্তমানে যেখানে অবস্থান করছে সেখানে সরিয়ে আনা হয়েছে।

প্রাচীন সব গ্রন্থ

পাঠাগারটিতে পুরনো যেসব বইপত্তর আছে তার মধ্যে প্রাচীনতম একটি গ্রন্থ হচ্ছে আইজাক নিউটনের 'নাটুরালিস প্রিন্সিপা ম্যাথমাটিকা' বা 'দ্যা ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপালস অফ ন্যাচরাল ফিলসফি।' এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিলো ১৭২৯ সালে।

এছাড়াও আছে ভারতে ব্রিটিশ রাজের সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথার ওপর ভিত্তি করে রচিত গ্রন্থ। যেমন 'দ্যা হিস্ট্রি অফ বাকিংহ্যাম ক্যানাল,' যা ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো।

কোন কোন বইয়ের হাল খুবই করুণ। এগুলো এখনই পুনরুদ্ধার করা জরুরি।

ছবির ক্যাপশান,

অনেক বই এর পাতায় ধুলোবালি জমে নষ্ট হওয়ার পথে

বেহাল দশা

মূল্যবান অনেক বই সেখানে অবহেলা আর অযত্নেই পড়ে আছে, এমনকি বইটির কথা হয়তো জানাও নেই কর্তৃপক্ষের।

অনেক বই পোকায় খেয়ে ফেলেছে, অনেক গ্রন্থে ছাতা পড়ে গেছে, কোন কোনটার বাঁধন খুলে গেছে, আবার কোন কোন বই থেকে পাতাও খসে খসে পড়ছে। কোন কোন বই স্যাঁতস্যাঁতে, সেখানে জলের দাগ খুব স্পষ্ট।

একেকটা বইকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্যে খরচ করতে হবে ৫,০০০ থেকে ১২,০০০ রুপি।

কিন্তু এজন্যে পর্যাপ্ত লোকবল নেই। নেই অর্থকড়িও। অথচ এখনই উদ্যোগ নেওয়া না হলে এসব বই ধুলোবালিতে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

পাঠাগার বাঁচাতে ফেসবুক

এই দুর্দশা থেকে পাঠাগারটিকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছে একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী।

রাজিথ নায়ার নামের এক তরুণ বলেছেন, "এধরনের লাইব্রেরি আমি শুধু সিনেমাতেই দেখেছি। আমাদের ধারণা ছিলো এধরনের প্রাচীন পাঠাগার ও যাদুঘর শুধু ইউরোপেই আছে।"

গত বছরের জুন মাস থেকে অল্পবয়সী প্রচুর ছেলেমেয়ে লাইব্রেরিটির সদস্য হয়েছেন। পাঠাগারটিকে বাঁচাতে তারা নানা ধরনের উদ্যোগও নিচ্ছেন।

এসব কর্মসূচির মধ্যে আছে ওপেন ডে, অর্থাৎ সবার জন্যে পাঠাগারটিকে উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং দর্শকদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো। এছাড়াও তারা ফেসবুকের মতো সোশাল মিডিয়াতেও ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। খোলা হয়েছে ফেসবুক পাতাও।

নতুন করে বই এর ক্যাটালগও তৈরি করছেন তারা।

ছবির ক্যাপশান,

এসব কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিলো ১৭৯৮ সাল থেকে ১৮১০ সালের মধ্যে

এরকম একটি প্রাচীন বই, যার কোন খোঁজ ছিলো না কারো কাছেই কিন্তু শেল্ফের কোন এক কোণায় এটি অযত্ন আর অবহেলায় পড়েছিলো।

এটি কার্টুনের বই। ১৭৯৮ থেকে ১৮১০ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্টুনের একটি সংগ্রহ। প্রখ্যাত রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট জেমস গিলারি এসব কার্টুন এঁকেছেন।

বাকিংহ্যাম ক্যানাল বইটির ওপর একটি প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে কার্টুনের মূল্যবান এই বইটির খোঁজ পান একজন গবেষক।

তিনি বলেন, "এটিতে এমন সব কার্টুন রয়েছে যা তখনকার রাজনীতির এক অসাধারণ দলিল।"

বর্তমানে এই লাইব্রেরিটির সদস্য ৩৫০ জন। তাদের বার্ষিক চাঁদা ৮৫০ রুপি।

কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, এই সদস্য সংখ্যা অন্তত এক হাজার পর্যন্ত বাড়ানো।