ভারতে নোট বাতিল: ৫০ দিনের ভোগান্তি কি ফুরলো?

  • শুভজ্যোতি ঘোষ
  • বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ছবির ক্যাপশান,

ভারতে গত কয়েকদিনে বহু দোকানেই মোবাইল পেমেন্টের সুবিধাওলা অ্যাপ বসিয়ে লেনদেন চালু হয়েছে

ভারতে সরকার গত মাসে সরকার রাতারাতি বড় অঙ্কের যে সব নোট বাতিল ঘোষণা করেছিল, তা ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা আজ শুক্রবার শেষ হয়েছে।

সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মানুষকে পঞ্চাশ দিন 'একটু কষ্ট করতে হবে' বলে যে সময় চেয়েছিলেন সেটাও ফুরিয়েছে।

গত দেড়-দুমাসে এই পদক্ষেপের জেরে ভারতবাসীকে ঠিক কতটা কষ্ট পোহাতে হল? আর মানুষের ভোগান্তি কি আজ ৩০শে ডিসেম্বরেই শেষ, না কি সামনে আরও দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে?

পঞ্চাশ দিন কষ্ট করার ঘোষিত মেয়াদ যখন ফুরিয়ে আসছে, তখন আমজনতা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন দিল্লিতে সরেজমিনে তারই খোঁজখবর নিচ্ছিলাম।

দিল্লির কস্তুরবা গান্ধী মার্গে যেখানে বিবিসি-র দফতর, ঠিক তার নিচেই রয়েছে বেশ কিছু এটিএম। গত পঞ্চাশ দিনের ভেতর সেই মেশিনগুলোতে নতুন নোট এসেছে বড়জোর দুতিনদিন - আর সে খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্র নিমেষে তার সামনে পড়েছে লম্বা লাইন, আর টাকাও ফুরিয়েছে হাওয়ার গতিতে।

প্রধানমন্ত্রী মোদির নোট বাতিলের সিদ্ধান্তকে কালো টাকার বিরুদ্ধে লড়ার সেরা দাওয়াই হিসেবে যারা সমর্থন করেছেন তাদেরও বলতে দ্বিধা নেই গত পঞ্চাশ দিনে সাধারণ মানুষের অসম্ভব কষ্ট হয়েছে।

ছবির ক্যাপশান,

তবে ছোটখাটো বহু ব্যবসাতেই এখনও চলছে শুধুমাত্র নগদ টাকাতেই লেনদেন

হাতে টাকা নেই, ব্যাঙ্ক বা এটিএম থেকে তা তোলারও উপায় নেই - সেটাই সবচেয়ে বড় মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে, বলছিলেন গত কিছুদিন ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়ানো এই মানুষগুলো।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে যদি এই হাল হয়, দেশের গ্রাম বা মফস্বলে যেখানে ব্যাঙ্ক বা এটিএমের সংখ্যা অনেক কম, সেখানে অবস্থা সহজেই অনুমেয়। যে সব ব্যবসা এতদিন পুরোটাই নগদে চলত, সবচেয়ে সঙ্গীণ অবস্থা তাদের।

আর পঞ্চাশ দিন পরেও বাজারে নগদ নোটের জোগান স্বাভাবিক হয়েছে মোটেও বলা যাবে না - এবং সরকারের কথাবার্তা থেকেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সেটা তারা চানও না, বরং চান ডিজিটাল বা মোবাইল পেমেন্টে উৎসাহ দিতে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি আজও এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, "যে দেশে ১০০ কোটিরও বেশি মোবাইল ফোন আছে এবং যেখানে জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বয়সই ৩৫-র কম, তাদের আঙুলের ডগাতেই আসলে রয়েছে দেশের ভবিষ্যৎ।"

ভারত একবার ডিজিটাল কানেক্টিভিটির পথে গেলে রচিত হবে নতুন ইতিহাস, সে প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই তথ্য যেমন ঠিক - তেমনি এটাও ঠিক ভারতের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার আজও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই, মোটামুটি সত্তর ভাগই ডিজিটালি নিরক্ষর। জোর করে তাদের ই-পেমেন্টের দিকে ঠেলে দেওয়াটা মানতে পারছেন না অনেকেই।

তারা কেউ বলছেন এতে সাধারণ গরিব মানুষেরই বেশি কষ্ট হয়েছে - তাদের জীবনযাপনই প্রচন্ড সমস্যায় পড়ে গেছে।

আর যে কালো টাকার কারবারিদের কাবু করতে এই পদক্ষেপ, তাদের যেহেতু কেউ ব্যাঙ্ক বা এটিএমের লাইনে দেখেনি, কিংবা আঁচ করেছে রাজনৈতিক দলের তহবিলে চাঁদা দিয়ে তারা টাকা সাদা করে নিয়েছেন, তাই তাদের ক্ষোভও বেড়েছে বহুগুণ।

ছবির ক্যাপশান,

দিল্লির প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেসে একটি ব্যাঙ্কের এটিএম - দিনের পর দিন টাকা না-আসায় যেটি বাতিল আবর্জনা রাখার গুদামে পরিণত হয়েছে।

তবে যে ছোট দোকানদাররা প্রথমে খুচরোর অভাবে বেজায় নাকাল হয়েছিলেন, তারা অনেকেই বলছেন অবস্থা ধীরে ধীরে শুধরোচ্ছে।

অনেকে দোকানে পেটিএম অ্যাপ বসিয়ে মোবাইলে পেমেন্ট নিচ্ছেন, আর দুহাজারের পর পাঁচশোর নোট আসতে শুরু করাতেও কিছুটা সুবিধা হয়েছে।

এদিকে কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এতদিন সবচেয়ে সরব ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি - তিনি আজও দিল্লিকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সময় থাকতে ভুলটা শুধরে নিন।

তিনি কলকাতায় এদিন এক অনুষ্ঠানে বলেন, "আমরা গণতান্ত্রিক সরকার সব সময় ভাবি কোনও খারাপ কাজ হলে কীভাবে সেটা শুধরোব। না-জেনে ভুল হতেই পারে, তা কোনও দোষের নয়। কিন্তু ভুলটা শুধরে নেওয়াটাই আসল কথা। গায়ের জোরে সমাজটাকে ব্যর্থতার দিকে কিছুতেই ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।"

নোট বাতিলের ঘোষণার পক্ষে-বিপক্ষে ভারতে গত পঞ্চাশ দিনে তর্ক-বিতর্ক কম হয়নি - এবং ভারতের অর্থনীতিতে সেটা যে এক উথালপাথাল এনে দিয়েছে তাও কেউ অস্বীকার করছে না।

কিন্তু ভারতে অনেকেই এখনও নিশ্চিত নন প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াই আদৌ শেষ পর্যন্ত কোনও কাজে আসবে কি না।

একপ্রস্ত কষ্ট করার শেষে তারা এখন প্রবল উৎকন্ঠায় অপেক্ষা করছেন বছরের শেষ দিনে জাতির উদ্দেশে নরেন্দ্র মোদির ভাষণের জন্য - এটা দেখতে যে তা নতুন কী ভোগান্তি বা সুবিধা বয়ে আনে!