উত্তর মেরুতে রেকর্ড তাপমাত্রা

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর উত্তর মেরুতে গত বছরের ডিসেম্বর মাসের তাপমাত্রা গড় তাপমাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ উষ্ণ ছিলো।

বলা হচ্ছে, এই হিট-ওয়েভ বা তাপপ্রবাহ সেখানে তাপমাত্রার রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেন যেসব বিজ্ঞানী, তারা দেখতে পাচ্ছেন, অসময়ে আর্কটিক অঞ্চলের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এবং এজন্যে তারা মানুষের নানা ধরনের কর্মকাণ্ডকেই দায়ী করছেন।

স্যাটেলাইট থেকে সংগ্রহ করা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সেখানকার তাপমাত্রা গড় হিসেবে পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিলো।

ছবির ক্যাপশান,

স্যাটেলাইট থেকে উত্তর মেরুর ওপর নজর রাখা হচ্ছে

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ ইন্সটিটিউটের একজন গবেষক ড. ফ্রিডরিক অটো বলেছেন, শিল্প যুগের আগে এধরনের তাপপ্রবাহের ঘটনা হতো খুবই বিরল।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, উত্তর মেরুতে অস্বাভাবিক হারে এই তাপমাত্রার বৃদ্ধি নিয়ে শুনুন বাংলাদেশে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমুদ্র ও পরিবেশ বিজ্ঞানী সাইদুর রহমান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার।

ছিটকে পড়ছে আইসবার্গ

বিজ্ঞানীরা বড় ধরনের একটি দুঃসংবাদ দিচ্ছেন। তারা বলছেন, এন্টার্কটিকায় খুব বড় আকারের একটি হিমবাহ বা আইসবার্গ প্রায় ভেঙে পড়ছে।

এযাবতকালের সর্ববৃহৎ ১০টি আইসবার্গের একটি এই হিমবাহ। এর আয়তন পাঁচ হাজার বর্গ কিলোমিটার।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি খসে পড়ছে লারসেন সি নামক বরফের এক বিশাল শেল্ফ থেকে। বলা হচ্ছে, গত ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই সেখানে বড় ধরনের একটি ফাটলের সৃষ্টি হয়।

এখন কুড়ি কিলোমিটারের মতো জমাট বরফ ওই হিমবাহটিকে ছিটকে পড়া থেকে ধরে রেখেছে।

ছবির ক্যাপশান,

বিমান থেকে তোলা ফাটলের ছবি

প্রখ্যাত এক সমুদ্র বিজ্ঞানী ড. স্টিফেন রিনটোল বলছেন, যদিও এটি প্রাকৃতিক ঘটনা, তারপরেও জলবায়ু পরিবর্তনে এই ঘটনার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কিছু কারণ আছে।

"এন্টার্কটিকার কিনার ঘেঁষে ভাসমান বরফের এসব শেল্ফ এক ধরনের কর্কের মতো কাজ করে যা এন্টার্কটিক মহাদেশের বরফ ধরে রেখেছে। বরফের এসব শেল্ফ যদি না থাকতো তাহলে আরো অনেক বরফ এই মহাদেশ থেকে ভেসে চলে যেতো। সেগুলো গলে তার পানি গিয়ে পড়তো সমুদ্রে। তখন সেখানে পানির উচ্চতা বেড়ে যেতো," বলেন তিনি।

তিনি জানান, বরফেরে শেল্ফ থেকে এভাবে বরফ খণ্ড খসে গিয়ে হিমবাহ তৈরি হওয়ার ঘটনা খুবই প্রাকৃতিক একটি বিষয়।

ছবির ক্যাপশান,

লারসেন বি ধসে পড়েছিলো ২০০২ সালে

কিন্তু এর ফলে বড় রকমের একটি প্রভাব পড়তে পারে জলবায়ুর পরিবর্তনের ওপরেও। অর্থাৎ বায়ুমণ্ডলে এবং একইসাথে সমুদ্রে এসব বরফের নিচেও তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে।

আর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে বরফের শেল্ফগুলো আরো পাতলা হয়ে গেলে আগামীতে আবারও ভেঙে পড়তে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই হিমশৈলটি ছুটে গেলে বরফের পুরো শেল্ফটিই বড় রকমের হুমকির মুখে পড়তে পারে।

নগরায়নে জেনেটিক পরিবর্তন

সারা পৃথিবীতেই যেভাবে খুব দ্রুত গতিতে শহরের পরিধি বাড়ছে তাতে গাছপালা এবং পশুপাখির জেনেটিক গঠনেও পরিবর্তন ঘটছে বলে এক জরিপে বরা হয়েছে। পরিবেশের জন্যে এসব উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, নগরায়ণের কারণে বহু প্রজাতি নিজেদের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, এমনকি কিছু কিছু প্রজাতি বিলুপ্তও হয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এর ফলে পরিবেশে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।

ছবির ক্যাপশান,

নগরায়নের ফলে বদলে যাচ্ছে উদ্ভিদের জেনেটিক গঠন

তারা বলছেন, এর ফলে বীজের ছড়িয়ে পড়া বাঁধাগ্রস্ত হতে পারে, বদলে যেতে পারে পশুপাখির শারীরিক গঠন, তাদের আচার আচরণ, এমনকি তাদের প্রজননের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, দেখা দিতে পারে নতুন নতুন সংক্রামক ব্যাধি, মারাত্মকভাবে দূষিত হতে পারে চারপাশের পরিবেশ।

এই গবেষণার সাথে যারা জড়িত ছিলেন তাদের একজন যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ড. মেরিনা আলবের্টি।

তিনি বলছেন, সারা বিশ্বেই নগরায়নের ফলে বিবর্তনের ওপরেও তার প্রভাব পড়ছে।

"গবেষণায় আমরা খুব স্পষ্ট দেখেছি, নগরায়নের ফলে শহুরে এলাকায় ফেনোটাইপিক পরিবর্তন ঘটছে। ফেনোটাইপিক পরিবর্তন বলতে বোঝায় কোন প্রাণী বা উদ্ভিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যেমন তাদের আকৃতি ও গঠন, জীবনধারা অথবা আচরণ ইত্যাদিতে পরিবর্তন। সাধারণত প্রকৃতিতে এসবের যে পরিবর্তন ঘটে তার চেয়েও অনেক বেশি পরিবর্তন ঘটেছে শহরাঞ্চলে।"

বীজের ক্ষেত্রে কি ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে তার একটি উদাহরণ এরকম:

"গাছপালার বীজ ছড়ায় বাতাসে। গবেষকরা বলছেন, যেসব বীজ ওজনে ভারী, সেগুলো থেকে ভালো ফল পাওয়া যায়। কারণ এগুলো কাছেই মাটিতে পড়ে যায়। কিন্তু হালকা বীজ বাতাসে উড়ে চলে যায় বহু দূর। আর সেগুলো গিয়ে পড়ে কংক্রিটের ওপর, সেসব বীজ তখন সহজে অঙ্কুরিত হতে পারে না।"

পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, পৃথিবীর যতো জনসংখ্যা তার অর্ধেকেরও বেশি এখন শহরাঞ্চলে বসবাস করে। এবং এই সংখ্যা খুব দ্রুত গতিতেই বাড়ছে।

সারা বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ১৬শোরও বেশি প্রজাতির ওপর ওপর জরিপ চালিয়ে গবেষকরা এসব কথা বলেছেন।

পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা এখন দেখার চেষ্টা করছেন নগরায়নের ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশে এবং জীব বৈচিত্র্যে কি ধরনের বিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।

বিজ্ঞানের আসর পরিবেশন করছেন মিজানুর রহমান খান