প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কেন সামাজিক জড়তা?

  • ফারহানা পারভীন
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াতে বাধা কোথায়?
ছবির ক্যাপশান,

স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াতে বাধা কোথায়?

রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প 'ছুটির' প্রধান চরিত্র ফটিক সম্পর্কে বলা হয়েছিল " বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না, এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে"।

ফটিকের বয়েসি কয়েকজনের সাথে আমি কথা বলতে ঢাকার একটি স্কুলে গিয়েছিলাম। ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম। কথা প্রসঙ্গে তাদের বয়োসন্ধিকালের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে কথা উঠতেই লজ্জা আর জড়তা এসে ভর করলো প্রত্যেকের চোখে মুখে। বয়োসন্ধিকালের পরিবর্তন নিয়ে তারা কি জানে?

মেয়ে-নো আইডিয়া,

কোন ক্লাসে পড়ো?

ছেলে-নাইনে

শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন গুলো হয় সেটা নিয়ে কারো সাথে কখনো কথা বলেছো?

মেয়ে-মায়ের সাথে প্রথমে শেয়ার করেছি এখন করিনা,

ছেলে-আসলে বিষয়টা কি?

আরেকজন ছেলে-আমি জানি না

এই ছেলে-মেয়েদের বয়স ১৩ থেকে ১৬র মধ্যে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ১০ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত বয়োসন্ধিকাল, এ সময়টাতে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয় ফলে তারা প্রজননক্ষম হয়।

কিন্তু এই বয়সী বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরী পরিষ্কার ভাবে জানে না তাদের প্রজনন অঙ্গ সম্পর্কে, আর সার্বিক প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাদের ধারনা যে নেই সেটা বলা বাহুল্য।

স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াতে বাধা কোথায়?

ছবির ক্যাপশান,

১৫-১৯ বছরের কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের হার এক হাজারে ১১৩ জন।

বাংলাদেশে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু ধারণা দেয়া আছে। তবে ক্লাসে শিক্ষকেরা অনেকেই বিষয়টি পড়াতে অস্বস্তি বোধ করেন।

এমনকি আমি দেখেছি কয়েকটি স্কুলে এই বয়োসন্ধিকাল নিয়ে যে চ্যাপ্টারগুলো রয়েছে সেগুলো স্টেপল করে আটকে দেয়া অর্থাৎ সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াতে বাধা কোথায়?

কার্ডিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল এ এম এম খায়রুল বাসার বলছিলেন বিষয়টির প্রয়োজন অনস্বীকার্য হলেও সামাজিক অস্বস্তি ও জড়তার কারণেই অনেকে ছেলে-মেয়েদের সাথে সহজ হতে পারেন না। মি. বাসার বলছিলেন "আমাদের সমাজ যেহেতু সেই সচেতন লেভেলে আসে নি তাই সহজে এটা সম্ভব না"।

প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবার থেকে শেখানে হবে নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিখবে সেটা নিয়ে যেমন বিতর্ক রয়েছে তেমনি প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে শেখার ফলে ছেলে-মেয়েদের লাভ হবে নাকি উল্টে ক্ষতি হবে সেটা নিয়েও বিতর্ক আছে।

এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যে কিশোর-কিশোরিদের প্রজনন অঙ্গ সংক্রমিত রোগ বেশি হওয়া এবং তুলনামূলক কম বয়সে কিশোরীদের অন্ত:সত্বা হয়ে পরার উদাহরণ দেন কেও কেও। মি. বাসার বলছিলেন বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ক্লাসে ইতিবাচক কিছু কৌশলে শিক্ষাটা দেয়া যেতে পারে। একই সাথে যৌন হয়রানির বিষয়ে সচেতন করা যেতে পারে তাদের।

তিনি বলছিলেন "হাইজিন ফর্মে শিক্ষাটা দেয়া যেতে পারে আর জেন্ডার সংবেদনশীলতার শিক্ষা দিতে হবে, যাতে করে একে অপরের প্রতি সম্মান দেখায়, যৌন হয়রানির বিষয়ে সতর্ক করা যায়"।

সংকোচ কাটছে না পরিবারে, সমাজে

ছবির ক্যাপশান,

সংকোচ কাটচ্ছে না পরিবারে, সমাজে

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী। এদের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৫০ লাখের উপরে।

একটি শিশু বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় যখন বয়োসন্ধিকালে পৌছায় তখন সেই পরিবর্তনগুলো পরিবারে বাবা-মা বা নিকটজনের দৃষ্টি গোচর হয় সবার আগে। কিছু ক্ষেত্রে মায়েরা মেয়ে সন্তানের দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ না করলেও ছেলে সন্তানদের বেলায় সংকোচ কাটাতে পারেন না।

আফরোজা খন্দকারের দুই সন্তান। বড় ছেলের এখন বয়োসন্ধিকাল। বলছিলেন ছেলের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন খেয়াল করার পরেও তার সাথে কথা বলতে পারছেন না, যার ফলে মা-ছেলের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে দিন দিন।

"আমার ছেলের ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ে, এর গোফ উঠছে, মেজাজ খারাপ থাকে, আমি পরিবর্তনটা ধরতে পারছি কিন্তু লজ্জা কাটিয়ে বলতে পারছি না, সে আমাকে ভুল বুঝছে, বলছে আমি আগের মত তাকে ভালোবাসি না" বলছিলেন তিনি।

প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে না জানার ফলে কী সমস্যা হচ্ছে?

চিকিতসা বিজ্ঞানে বলা হয়, প্রজনন অঙ্গ ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সুস্থ্য ও সঠিক ধারণা থাকলে সেটা একটি কিশোর কিশোরির পরবর্তী মানসিক গঠনে সাহায্য করে। তবে বাংলাদেশের সমাজে যুগ যুগ ধরে চলা সামাজিক জড়তার কারণেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিজ্ঞানসম্মত কোন জ্ঞান ছাড়াই পার করছেন। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংস্থা বাপসা দীর্ঘদিন ধরে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে।

মিরপুরে সংস্থাটির কার্যালয়ে আমার কথা হচ্ছিল সংস্থাটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক শামিমা আখতার চৌধুরির সাথে। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা না থাকার ফলে ঠিক কি ধরণের সমস্যায় পরছে বয়োসন্ধিকালিন কিশোর-কিশোরীরা? তিনি বলছিলেন মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে যেয়ে তারা দেখেছেন মারাত্মক সংক্রমণ রোগে ভুগছে তারা।

ছবির ক্যাপশান,

বাপসার প্রকল্প ব্যবস্থাপক শামিমা আখতার চৌধুরি

তিনি বলছিলেন "অল্প বয়সী ছেলেরা গনোরিয়ায় ভুগছে, লজ্জায় বলতে পারে না। মেয়েরা প্রেগন্যান্ট হচ্ছে কিছু না বুঝেই। আবার অ্যাবরশন করাতে যেয়ে আরো বিপাকে পরছে"।

তিনি বলছিলেন আবার প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণার কারণেই মানসিক অবসাদে ভুগছেন অনেকে। তবে সচেতনতা মূলক কাজে কিশোর-কিশোরিদের কাছ থেকে সাড়া পেলেও, তাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে নানামুখী চ্যালেঞ্জ।

"এক স্কুলে আমাদের বলা হল ছেলে-মেয়েরা যা জানতো না আপনারা সেটাও সুড়সুড়ি দিয়ে জানিয়ে দিলেন। এমন মন-মানসিকতা রয়েছে অনেকের যার ফলে কাজ করতে সমস্যা হয় কিছু জায়গায়" বলছিলেন তিনি।

সরকারের ধীরে চলো নীতি

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী।

প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ সরকারি ও বেসরকারি ভাবে অনেক দিন থেকেই চলে আসছে। তবে কিশোর-কিশোরিদের নিয়ে কাজ করার উদাহরণ হাতে গোনা।বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অব হেল্থ সার্ভে ২০১৪-অনুযায়ী ১৫-১৯ বছরের কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের হার এক হাজারে ১১৩ জন।

এ বয়সসীমার মধ্যে এ হার পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। আর তাই বাংলাদেশে বাল্য বিবাহের মত ঘটনায় মেয়েদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির শঙ্কা যেমন রয়েই যাচ্ছে, তেমনি বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ হচ্ছে। বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

সম্প্রতি জেনারেশন ব্রেকথ্রু নামে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে শিশু-কিশোরদের যেমন জানানো তাদের উদ্দেশ্য তেমনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অর্থাৎ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রশিক্ষণ দেয়াও তাদের লক্ষ্য। প্রজনন স্বাস্থ্যের মত বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করতে এত কাল ক্ষেপন কেন? জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক ড.মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলছিলেন বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে আস্তে ধীরে বিষয়টিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

তিনি বলছিলেন "উন্নত দেশের সাথে তুলনা করলে চলবে না, আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সাথে মিল রেখে ধীরে পরিচালনা করতে চাই, আমাদের সব স্টেকহোল্ডার এর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন"।

এই `ধীরে চলো নীতির` উল্টো দিকে রয়েছে ইন্টারনেট প্রযুক্তি যেখানে অন্তত শহর/নগর এলাকার কিশোর-কিশোরিরা অ্যাডাল্ট কন্টেন্ট,পর্নোগ্রাফিক কন্টেন্ট দেখছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ভুল শিখছে। যার প্রভাব পড়ছে তাদের স্বাস্থ্যে,পরিবার বা সমাজের ওপর। শুধু কিশোর কিশোরি নয় অনেক প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে রয়েছে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতা। এই অসেচতনাতা হয়তবা অনেকের ক্ষেত্রেই সত্য।