ভারতে রেল দুর্ঘটনায় মাওবাদীদের হাত?

দুর্ঘটনায় পড়ে যাওয়া বগি
ছবির ক্যাপশান,

দুর্ঘটনায় মোট ৩৯জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে

ভারতে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশার সীমান্তে গতকাল মাঝরাত নাগাদ এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রায় জনা চল্লিশেক নিহত ও আরও ৬০জনের মতো আহত হয়েছেন।

ওই দুর্ঘটনায় ভুবনেশ্বর-গামী হীরাখন্ড এক্সপ্রেসের মোট নয়টি কামরা লাইন থেকে ছিটকে পড়ে।

গত নভেম্বরে উত্তর ভারতে কানপুরের কাছে আর একটি মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনায় দেড়শোরও বেশি যাত্রী প্রাণ হারিয়েছিলেন, তারপর দু'মাস যেতে না-যেতেই ভারতীয় রেল আবার একটি বিশাল ট্র্যাজেডির কবলে পড়লো।

এই দুর্ঘটনায় রেল কর্তৃপক্ষ অবশ্য অন্তর্ঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না, কারণ যে এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে আগে মাওবাদী বিদ্রোহীদের হামলা চালানোর নজির আছে।

দুর্ঘটনাগ্রস্ত হীরাখন্ড এক্সপ্রেস ট্রেনটি যখন বস্তারের জগদলপুর শহর থেকে ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বরের দিকে যাচ্ছিল - তখন শনিবার রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ একটি নির্জন এলাকায় ইঞ্জিন থেকে ট্রেনের প্রথম নয়টি কামরা লাইনচ্যুত হয়।

প্রচন্ড আঘাতে ঘুমন্ত যাত্রীদের অনেকেই হতাহত হন, ট্রেনের বেশ কয়েকটি কামরা সম্পূর্ণ দুমড়ে মুচড়ে যায়।

আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Google Map

ভারতীয় রেলের মুখপাত্র অনিল সাক্সেনা এদিন ভোররাতে জানান, "দুর্ঘটনাস্থলটি ওড়িশা-অন্ধ্র সীমান্তের কাছে - নিকটবর্তী শহর হল ওড়িশার রায়গুডা, যদিও দুর্ঘটনাটি ঘটেছে অন্ধ্রের ভিজিয়ানাগ্রাম জেলায়।"

"মাঝরাতেই রেল কর্মকর্তারা সেখানে ছুটে গেছেন, রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভুকে ঘুম ভাঙিয়ে এ খবর দেওয়ার পর তিনিও দিল্লি থেকে সেখানে রওনা দিয়েছেন। অন্ধকার থাকা সত্ত্বেও মেডিক্যাল ভ্যান সেখানে পৌঁছে গেছে, আর ভিক্টিমদের উদ্ধার ও ত্রাণেই আমরা এখন পুরো মনোযোগ দিচ্ছি।"

রবিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দুর্ঘটনায় মোট ৩৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ দোমড়ানো কামরাগুলোর ভেতর থেকে এখনও সবাইকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে রেলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনও মন্তব্য করা হয়নি, তবে রেল কর্মকর্তাদের কথায় ইঙ্গিত মিলেছে তারা এটিকে নিছক একটি সাধারণ দুর্ঘটনা বলে মনে করছেন না।

ছবির উৎস, STRINGER/AFP/Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

রেল দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ সারি করে রাখা হয়েছে

রেলের ওয়ালটেয়ার ডিভিশনের প্রধান চন্দ্রলেখা মুখার্জি বলেন, "এই মুহুর্তে দ্রুত উদ্ধারকাজ শেষ করাটাই আমাদের অগ্রাধিকার, যদিও পরে নিশ্চয় তারা দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করা হবে এবং দোষীদের কড়া শাস্তি দেওয়া হবে। যদি দেখা যায় দুর্ঘটনার পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে, তাহলে পুলিশ তার তদন্ত করবে।"

কেন দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পুলিশি তদন্তের কথা উঠছে, তারও উত্তর ছিল ওই রেল কর্মকর্তার বক্তব্যে।

মিস মুখার্জি জানান, "আমরা দেখেছি রেললাইনের দুজায়গায় ভাঙা ছিল। ট্রেনের চাকা যে মেইন রেল বা স্টক রেলের ওপর থাকে, তার পাশের টাং রেলে অন্তত দুটো জায়গায় কাটা ছিল বলে আমরা লক্ষ্য করেছি। এই বিষয়টা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"

রেললাইন কেটে রেখে এই দুর্ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে, এমনটা ধারণা করা হচ্ছে কারণ অন্ধ্র-ওড়িশা সীমান্তের ওই অঞ্চলে মাওবাদীদের রীতিমতো ভাল প্রভাব আছে।

ভারতীয় রেলবোর্ডের সাবেক সদস্য সুভাষরঞ্জন ঠাকুর বিবিসিকে বলছিলেন অতীতেও সেখানে মাওবাদীদের হামলা চালানোরও নজির আছে।

তিনি বলেন, "যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেই এলাকাটি মাওবাদী-অধ্যুষিত বলেই পরিচিত। অতীতে ২০০৭ সালে ওই একই কোন্নেরু স্টেশনে নকশালরা বড়সড় হামলাও চালিয়েছিল। দুর্ঘটনার পেছনে রেলওয়ে ট্র্যাক, বগি বা পয়েন্টের ত্রুটি ছিল কি না সেটা নিশ্চয় তদন্ত হবে, তবে প্রাথমিকভাবে অন্তর্ঘাতের সম্ভাবনা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।"

ছবির উৎস, STRINGER/AFP/Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ট্রেনের দুমড়ানো কামরা, উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে কর্মীরা

ভারতীয় রেলে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাগুলোর একটি, জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে প্রায় দেড়শো যাত্রীর মৃত্যুও ঘটেছিল মাওবাদীদের হামলাতেই।

মি ঠাকুর বলছিলেন, মাওবাদীদের হামলা ঠেকানো আসলে ভারতীয় রেলের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ।

"আসলে রেললাইন তো পুরোপুরি এক্সপোজড থাকে - তার প্রতিটি ইঞ্চি মেপে মেপে সব সময় নিরাপত্তা টহলদারি চালানো খুব মুশকিল। এই জন্যই রেল হল অন্তর্ঘাতের জন্য সফট টার্গেট। তবে তার পরেও কোনও নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকলে রেল তার পরেও বাড়তি টহলের ব্যবস্থা করে - বিশেষ করে রাতে আমাদের কর্মীরা পায়ে হেঁটে টহল দিয়েওও রেলপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যান", বলছিলেন মি ঠাকুর।

রায়গুডার কাছে গত রাতের ওই দুর্ঘটনায় আদৌ মাওবাদীদের হাত ছিল কি না তা হয়তো তদন্তেই প্রমাণিত হবে।

তবে ভারতীয় রেলে দুর্ঘটনায় প্রতি বছরই গড়ে যে বেশ কয়েকশো যাত্রীর প্রাণহানি হয়ে থাকে, সেই মৃত্যুর মিছিল নতুন বছরেও শুরু হয়ে গেল।