রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঠেকানোর আন্দোলনে সমর্থন কতটা মিলছে

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ঢাকায় রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী হরতালের সময় পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ

ছবির উৎস, SOHEL/ Focus Bangla

ছবির ক্যাপশান,

ঢাকায় রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী হরতালের সময় পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ

সুন্দরবনের কাছে রামপালে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ-কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধের দাবিতে আজ ঢাকায় অর্ধদিবস হরতাল ডেকেছিল তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ এবং বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি।

বাংলাদেশে বামপন্থী দলগুলোর নেতাকর্মী, সমর্থক বা সমমনাদের এই ফোরাম সাত বছর ধরে এই আন্দোলন করছে। প্রথমদিকে সভা-সেমিনার বা গণসংযোগের মতো কম ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে এগুনোর চেষ্টা করেছে।এর ধারাবাহিকতায় একটা পর্যায়ে এসে তারা সমাবেশ, লংমার্চ এবং সর্বশেষ হরতালের মতো কর্মসূচি নিল।

হরতাল তেমন হয়নি কিন্তু তারা মনে করছেন, তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ছোট হলেও বক্তব্যের পিছনে তথ্যসহ যুক্তি থাকায় তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছেন। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ হলে সুন্দরবন ধ্বংস হবে, এই বক্তব্য আন্দোলনকারীরা দেশে জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন।

বিদ্যুৎ-কেন্দ্রটি সুন্দরবনের জন্য পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনবে -- আন্দোলনকারীদের এই বক্তব্যের পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদদের সমর্থন মিলছে।

ঢাকার রাস্তায় বিভিন্ন পেশার কয়েকজনের সাথে কথা বলেও বোঝা গেল দেশের অনেক মানুষই মনে করেন প্রকল্পটি অন্য কোনো জায়গায় নেয়া উচিত। তবে ভিন্নমতও রয়েছে। সরকারকে সমর্থন করছেন অনেকে।

সরকার এখনও অনড়। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, "অনেকে রাজনৈতিক কারণে উন্নয়নের বিপক্ষে রয়েছেন। কিন্তু আমরা বার বার যুক্তি দিয়ে বলছি,উন্নত প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না।"

কিন্তু আন্দোলনকারীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এবং দেশের ভেতরে জনমত বাড়িয়ে বাংলাদেশ এবং ভারত -দুই দেশের উপরই চাপ তৈরি করতে চাইছেন।

তারা মনে করছেন সরকারের শক্ত অবস্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীরা একটা জনমত তৈরি করতে পেরেছেন যেটা রাজনৈতিক অঙ্গনেও নাড়া দিয়েছে। এমনকি প্রধান বিরোধীদল বিএনপিও নৈতিক সমর্থন দিতে বাধ্য হয়েছে।

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এই ইস্যু আন্তর্জাতিক সমর্থনও পেয়েছে। আন্দোলনকারী ফোরামটির নেতা অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেছেন, বিশেষজ্ঞদের সাথে গবেষণা করে তথ্য এবং যুক্তি নিয়ে তারা মাঠে নেমেছেন। এরসাথে পরিবেশ বিপর্যয়ের ইস্যু থাকায় তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।

"সুন্দরবনের প্রতি আন্তর্জাতিক নজর এমনিতেই রয়েছে। সেখানে পরিবেশ দূষণ হলে তার কোনো ভৌগলিক এবং রাজনৈতিক সীমানা থাকে না। সুতরাং যখনই এই তথ্য যাচ্ছে যে, সুন্দরবন ক্ষতি হবে, এমন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। তখন আন্তর্জাতিকভাবে একটা ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে সুন্দরবনকে বিনাশ করতে দেয়া যায় না।"

ছবির ক্যাপশান,

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ঢাকায় এক হরতালের সময় সমাবেশ

বড় সাংগঠনিক শক্তি না থাকলেও আন্দোলনকারীরা ইস্যুটি নিয়ে একনিষ্ঠভাবে দীর্ঘসময় ধরে কাজ করছেন।

এছাড়া বাংলাদেশে ভারতে বিরোধী একটা মনোভাব আছে । আর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যেহেতু ভারতের সাথে যৌথভাবে করা হচ্ছে, ফলে এই বিষয়গুলো দেশের ভিতরে জনমত তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন। তবে ভারতেও পরিবেশবাদিরা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন।

সম্প্রতি ডাভোসে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেক হাসিনাকে। সিনিয়র সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মনে করেন,আন্তর্জাতিক সমর্থনের পিছনে পরিবেশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের যুক্তি অন্যতম শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

"পরিবেশের প্রশ্নে যুক্তিটা ধারালো, সেটা আন্তর্জাতিকভাবে বড় কাজ করেছে।এছাড়া পিছনের কিছু কারণ যদি থাকেও, সেটি স্পষ্ট নয়।পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ইস্যুতে যখন কোনো আন্দোলন হয়, তার পিছনে আন্তর্জাতিক অনেক বড় বড় শক্তির অর্থনৈতিক স্বার্থ থাকে।আমাদের এখানে যদি সেরকম কিছু থেকেও থাকে। তার চাইতে নিজস্ব সুন্দরবনের ইস্যুটা আমাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।"