পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফের পতন: বিরোধীদের উল্লাস

পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পাশে ভাই শাহবাজ শরিফ

ছবির উৎস, ARIF ALI/AFP/Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

পতন এবং উত্থান? : পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পাশে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী এবং ভাই শাহবাজ শরিফ

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণার পর তিনি পদত্যাগ করেছেন। মিঃ শরিফ তিন বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন, এবং তিন বারই তিনি মেয়াদ শেষ হবার আগেই ক্ষমতা হারিয়েছেন - প্রথমবার রাষ্ট্রপতির সাথে দ্বন্দ্বের জের ধরে পদত্যাগ করেছেন, দ্বিতীয়বার সেনাবাহিনী তাঁকে হটিয়েছে, এবার আদালত।

শুক্রবারের রায়ে আসলো মিঃ শরিফের পরিবারের সম্পদ নিয়ে তদন্তের প্রেক্ষাপটে। দু'বছর আগে পানামা পেপারসে যে তথ্য ফাঁস করা হয়, তাতে দেখা যায় মিঃ শরিফের পরিবারের সদস্যরা অফ-শোর কোম্পানির মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাচার করে থাকতে পারে।

নওয়াজ শরিফ এই অভিযোগ সব সময়ই অস্বীকার করেছেন। কিন্তু পাঁচজন বিচারপতি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেন যে তদন্তে দুর্নীতির যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিচারপতি এজাজ আফজাল খান বলেন, মিঃ শরিফ আর ''সংসদের একজন সৎ সদস্য থাকার যোগ্য নন।''

আদালত দেশের দুর্নীতি-বিরোধী সংস্থাকে মিঃ শরিফ, তাঁর দুই ছেলে, মেয়ে মারিয়াম ও তার স্বামী এবং অর্থমন্ত্রী ইশাক ডার সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

নওয়াজ শরিফের মেয়ে মারিয়াম শরিফের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা হবে।

নওয়াজ শরিফ আর মাত্র এক বছরের কম সময় পরে পাকিস্তানের ইতিহাসে মেয়াদ পূর্ণ করা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছিলেন।

তিনি ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন, এবং ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পর্যন্ত সরকার প্রধান ছিলেন।

মিঃ শরিফের বিরুদ্ধে ১৯৮০র দশক থেকেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। পানামা পেপারসে ২০১৫ সালে যেসব তথ্য ফাঁস করা হয়েছিল, সেগুলো ১৯৯০ দশকের মাঝা-মাঝি সময়ে আরেকটি ফেডারেল তদন্তের অংশ ছিল।

এখন কী হবে?

মিঃ শরিফের উত্তরাধিকারী হিসেবে কে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর ভাই শাহবাজ শরিফকে অনেকেই শক্তিশালী দাবীদার হিসেবে দেখছেন।

জাতীয় সংসদের স্পিকার পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দল, পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন)কে একজন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে অনুমতি দেবেন, যিনি ২০১৮ সালে নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

এই বিষয়ে পিএমএল-এন - সংসদে যাদের সব চেয়ে বেশি আসন আছে - শীঘ্রই একটি বিবৃতি দেবে।

বিরোধী দলগুলোরও সুযোগ থাকবে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য তাদের নিজস্ব প্রার্থী দেয়ার।

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো (এনএবি)কে দুর্নীতি বিরোধী আদালতে মিঃ শরিফ এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে চারটি নোটিস পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।

আদালত এনএবিকে আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে এই নোটিস দাখিল করতে বলেছে। দুর্নীতি বিরোধী আদালতগুলোকে ছয় মাসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে।

বিরোধীদের উল্লাস

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান,

বিরোধীদের উল্লাস: জামাত-এ-ইসলামী দলের প্রধান সিরাজ-উল হক বিরোধী সমর্থকদের সাথে মিষ্টি নিচ্ছেন।

শুক্রবার আদালত প্রাঙ্গণে অনেক মানুষকে বিচারপতিদের রায়কে উল্লাস করে স্বাগত জানাতে দেখা গিয়েছে।

রায় ঘোষণার পরপরই বিরোধী দলের সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পরে। বিভিন্ন খবরে জানা যায়, তারা রাস্তায় স্লোগান দিয়ে আনন্দ করে এবং মিষ্টি বিতরণ করে।

প্রাক্তন ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-এ-ইনসাফ (পিটিআই)-এর ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মেহমুদ কুরেশি দিনটিকে 'ঐতিহাসিক দিন' বলে বর্ণনা করে বলেন, তদন্তকারীরা 'প্রবল চাপ উপেক্ষা করে ন্যায় বিচারের পক্ষে কাজ করেছেন।'

রায় ঘোষণার সময় আদালত ঘিরে ৩,০০০ অতিরিক্ত সশস্ত্র পুলিশ এবং আধা-সামরিক 'পাকিস্তান রেঞ্জার্স' মোতায়েন করা হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

রায় ঘোষণার সময় সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

যে নাটকীয় ঘটনা মাসের পর মাস ধরে গণমাধ্যমে খবরের খোরাক জুগিয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সমর্থন এনেছে এবং তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরাও হয়েছে, এই রায়ের মাধ্যমে সেই নাটক চরম পর্যায়ে চলে গেল।

এই বিভেদ মূলত দলীয় ভিত্তিতেই প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু এ'সব উত্তপ্ত অভিযোগের মাঝে অনেকেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।

তবে মিঃ শরিফই প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন, যাকে পানামা পেপারসে তথ্য ফাঁসের ফলে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং তার স্ত্রী একটি অফ-শোর কোম্পানিতে লক্ষ লক্ষ ডলারের বিনিয়োগ লুকিয়ে রেখেছিলেন বলে পানামা পেপারসে তথ্য ফাঁস হলে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।