ইতিহাসের সাক্ষী
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

৭০-য়ে এশিয়ায় হিপিদের প্রিয় ভ্রমণপথে মূল আকর্ষণ কী ছিল

পশ্চিমে ১৯৬০-৭০এর দশকে তরুণদের কাছে হিপি সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর তাদের পছন্দের একটা ভ্রমণ পথ তৈরি হয়েছিল পশ্চিম ইউরোপ থেকে এশিয়ায় । এই ভ্রমণপথ জনপ্রিয় হয়েছিল হিপি ট্রেল নামে।

প্রচলিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা একদল তরুণ তখন লম্বা চুল রাখছে, পুঁতির মালা পরছে-গাঁজা খাচ্ছে- খুঁজছে অন্য জীবনের স্বাদ- তারাই তখন পরিচিত হিপি নামে।

এরকমই এক ব্রিটিশ তরুণ রিচার্ড গ্রেগরি ১৯৭৪ সালের গ্রীষ্মে বেরিয়ে পড়েছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় এক যাত্রায় - তার বয়স তখন ১৮।

"আমি খুঁজছিলাম অ্যাডভেঞ্চার। সেসময় গোপন এক পত্রিকায় একটি বাস যাত্রার বিজ্ঞাপন দেখলাম- যে বাসটা যাচ্ছে লেবানন, আফগানিস্তান, কাশ্মীর ও নেপালে। এই দেশগুলো সম্বন্ধে আমি শুধু এটুকুই জানতাম যে এসব দেশে প্রচুর গাঁজার চাষ হয়। আসলে ওই সময়ে গাঁজা খাওয়ার ব্যাপারে আমার দারুণ উৎসাহ ছিল।"

ছবির কপিরাইট Daniel Berehulak/Getty Images
Image caption ৬০-৭০এর দশকে পশ্চিমে হিপি তরুণদের একটা বড় আকর্ষণ ছিল গাঁজাসেবন। এর টানে তারা ছুটত প্রাচ্যের দেশগুলোয়

রিচার্ড গ্রেগরি মদ চোলাইয়ের কারখানায় তার চাকরি ছেড়ে দিয়ে ওই বাসে সওয়ার হয়েছিলেন শুধু যাবার পথের টিকিট কিনে । সাথে চার মাস পথখরচার জন্য ২০০ পাউন্ড - এই নিয়ে তার চারমাসের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল উত্তর লন্ডন থেকে ।

বাসচালকর ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের মানুষ, সঙ্গে সহকারী একজন ভারতীয় তরুণ- রাম। নানা ধরনের লোক ছিল ওই বাসে।

"সবাই কিন্তু হিপি ছিল না। তরুণ দুই ইংরেজ দম্পতি, একজন তরুণী -ওয়েলসের বাসিন্দা, একজন বয়স্ক ভারতীয় ভদ্রলোক- তিনি নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছিলেন। একজন আমেরিকান, সঙ্গে তার নয় বছরের মেয়ে। আরেকজন জাপানী মেয়ে, আর কয়েকজন ব্যবসায়ী - তারা কার্পেট, ছোটখাট হস্তশিল্পের ব্যবসা করত।"

হিপিদের নিয়ে এই ভ্রমণের ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল ১৯শ ষাটের দশকে। তখন পশ্চিমী দুনিয়ার মানুষ আরও বেশি করে ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতি ও প্রাচ্যের সংস্কৃতির নানা অজানা রহস্য সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠছিলেন।

পাশাপাশি তরুণদের জন্য আরেকটা বড় আকর্ষণ ছিল সস্তায় গাঁজাসেবনের সুযোগ।

বিটলস্‌ শিল্পী গোষ্ঠির ১৯৬৮ সালে বিমানে ভারত যাত্রা তখন তাদের ভক্তদের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু যারা হিপি - যাদের অর্থবল কম, তারা যেত সড়কপথে- তাদের জন্য চালু হয়েছিল এরকম বাস পরিবহন ব্যবস্থা।।

রিচার্ডের বাসের প্রথম গন্তব্য ছিল ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে দিয়ে আফগানিস্তান - গাঁজা উৎপাদনের স্বর্গরাজ্য।

ছবির কপিরাইট MASSOUD HOSSAINI
Image caption আফগানিস্তানের বাজারগুলোতে নানা পশরার পাশাপাশি বিক্রি হতো দারুণ সুন্দর হাতে বোনা কার্পেট।

"পাহাড় আর মরুভূমির দেশ- বেশ কঠিন আবহাওয়া। গাড়িঘোড়া খুবই কম- চারিদিকে প্রচুর গাধা আর উট। কিন্তু মানুষরা দারুণ," বলছিলেন রিচার্ড।

"আমার প্রিয় একটা স্মৃতি আছে - হেরাতের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম- হঠাৎ কয়েকজন লোক এসে আমাকে একটা চায়ের দোকানে নিয়ে গেল। দোকানের ভেতর দেখলাম দেয়াল ঘেঁষে জনা তিরিশেক আফগান বসে চা খাচ্ছে। কয়েকজন লোক মাঝখানে বসে তারযন্ত্র সাধছিল- আর তাদের ঘিরে হাত দিয়ে ড্রাম বাজাচ্ছিল কয়েকজন। হঠাৎ শুরু হল দারুণ সঙ্গীত। ওরা আমাকে টেনে নিয়ে গেল ওদের মাঝে। ওরা কিন্তু ইংরেজি জানত না- আদানপ্রদান সবই হচ্ছিল আকারে ইঙ্গিতে । আমি যতটা পেরেছিলাম যোগ দিয়েছিলাম। দারুণ মজা হয়েছিল ।"

কাবুলে হিপিদের পছন্দের একটা জায়গা ছিল। রাস্তাটার নাম চিকেন স্ট্রিট। সেখানে ছিল সস্তার হোটেল। কারুশিল্পের দোকান।

"আমি যে হোটেলে ছিলাম তার নাম ছিল 'পিস হোটেল'। পাশেই সিগিস নামে নামকরা একটা হোটেল। সেখানে খাবারের বেশ সুনাম ছিল। দাবা খেলার সুযোগ ছিল ওখানে। বাগানে তাদের বিশাল একটা দাবার ছক ছিল। ওখানে সবাই এসে মিলত- সবার সঙ্গে সবার পরিচয় হতো। তখন তো ঘুরে বেড়াবার জন্য কোন গাইডবই ছিল না। ইন্টারনেটও ছিল না। কাজেই বেড়িয়ে যারা ফিরছে তাদের কাছে অন্যরা পরের শহর সম্বন্ধে খোঁজখবর নিত।"

ভারতে তখন হিপিদের যাতায়াত এত বেড়ে গিয়েছিল যে এই হিপি সংস্কৃতির ঢেউ লেগেছিল বলিউড ছবির জগতেও।

রিচার্ডের মনে আছে তারা সকলে যখন তাজমহল বা অন্য কোন দ্রষ্টব্যস্থান দেখতে যেতেন বাচ্চারা দৌড়ে আসত - তাদের বলিউড ছবি "দম মারো দমের" জনপ্রিয় গান শোনাতো।

ওই ভ্রমণপথে রিচার্ডের অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়েছিল কাশ্মীরের শ্রীনগরে। সেখানে লেকের ওপর তিনি ছিলেন একটা হাউসবোটে।

ছবির কপিরাইট Keystone
Image caption ডাল লেকের বিখ্যাত হাউসবোটের জনপ্রিয়তা বহুকালের

"আমার ১৯ বছরের জন্মদিন পালন করেছিলাম সেখানে। সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় জন্মদিন। আমি শালিমার গার্ডেন্সেও গিয়েছিলাম। সেখানে স্থানীয় কিছু ছেলে নিজেদের মধ্যে ক্রিকেট খেলছিল। আমিও ওদের সঙ্গে খেলায় মেতে গেলাম।"

এক সন্ধ্যেবেলা হাউসবোটের মালিক মোহাম্মদ তাকে তার ছেলেদের সঙ্গে শহরে পাঠালেন।

"ওরা আমাকে দারুণ একটা জায়গায় খাওয়াল - তারপর বাজারে খুব সুন্দর সব কার্পেটের দোকানে নিয়ে গেল। ওরা জানত আমি কার্পেট কিনব না। কারণ, আমি সেখান থেকে কাঠমান্ডু যাচ্ছিলাম, আর আমার কাছে অত পয়সাকড়িও ছিল না। আসলে ওরা কার্পেট নিয়ে খুব গর্ববোধ করত। ওরা আমাকে দেখাতে চেয়েছিল ওদের কার্পেটের কাজ কত সুন্দর। এখনও এসব স্মৃতি আমি ভুলিনি," বলছিলেন রিচার্ড।

ওই হিপি ট্রেলের শেষ গন্তব্য কাঠমান্ডুতে ফ্রিক স্ট্রিট। রাস্তার দুধারে নানাধরনের মুখরোচক খাবারের দোকান । সেখানেও তার দারুণ সময় কেটেছিল- বললেন রিচার্ড।

"কিন্তু তখন আমার পকেটের পয়সা ফুরিয়ে গেছে। আমার কোন ধারণাই ছিল না আমি এরপর কী করে চালাব ? আর সেসময়ই শুরু হল আমার আরেক অ্যাডভেঞ্চার।"

"গিয়েছিলাম ভাড়ার বাসে- টিকিট কাটা ছিল- বাস গেছে চেনা পথে, সঙ্গে ছিল লোকজন -কিন্তু ফিরব একা- গণ পরিবহনে- একেবারে অন্য অভিজ্ঞতা। তবে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম- যেখানেই গেছি স্থানীয় মানুষ আমাকে সাহায্য করেছে। বসে আছি- কোথায় যাব কীভাবে যাব জানিনা- কেউ না কেউ এগিয়ে এসেছে- সাহায্য করেছে- খেতে দিয়েছে। এমনকী হতদরিদ্র মানুষদের কাছ থেকেও আমি যে উদারতা পেয়েছি তা ভুলবার নয়।"

ছবির কপিরাইট PRAKASH MATHEMA
Image caption ষাট থেকে সত্তরের দশকে হিপি ট্রেলে ব্যবহৃত সেই পুরনো জমানার বাসগুলো এখনও চলে নেপালে কাঠমাণ্ডুর রাস্তায়

রিচার্ড মনে করেন তার ভাগ্য ভাল ছিল। তাকে কোন বিপদে পড়তে হয়নি।

"তবে আমি এমন লোকদের জানি - যাদের নানা বিপদ হয়েছে। এভাবে পথচলা অনেক কঠিন- অনেক বিপদজনক। কিন্তু আমার কখনও ভয় লাগেনি- এমনকী যখন আফগানিস্তানে বাসে আমার পাশে লোক উঠেছে- সঙ্গে ছাগল আর হাতে বন্দুক নিয়ে। কিন্তু আমি গল্প শুনেছি অন্যদের কাছে - কেউ অসুস্থ হয়েছে। কাউকে জেলে ধরে নিয়ে গেছে।"

হিপিদের এই ভ্রমণপথ নিয়ে উৎসাহে ভাঁটা পড়ে ১৯৭৯সালে। কারণ তখন ইরানে ইসলামী বিপ্লব শুরু হয় এবং আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণের পর ভারতে যাওয়ার ওই সড়কপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

রিচার্ড গ্রেগরি এখন সাইনবোর্ড আঁকেন এবং গানবাজনা করেন।

ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্ব তৈরি করেছেন মানসী বড়ুয়া।