Shameem Ahmed
আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না

`জোর করেই আমাকে সংবাদ পাঠক বানানো হয়।`

শামীম আহমেদকে বাংলাদেশের টেলিভিশন দর্শকরা চেনেন বহু দিন ধরে। বছরের পর বছর ধরে তারা তাকে দেখেছেন নিয়মিত ইংরেজি সংবাদ পাঠ করতে। কিন্তু কখনও সংবাদ পাঠ করবেন - একথা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি।

"সংবাদ পাঠক হবো একথা আমি কোনদিনও ভাবিনি। মাথায়ও আসেনি। মোটামুটিভাবে বলতে পারেন আমাকে বলপূর্বক এটার মধ্যে ঢোকানো হয়েছিল," বলছিলেন শামীম আহমেদ।

তখন তার বয়স ২২ বছর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। আগরতলা তিনি মাত্রই দেশে ফিরেছেন। উনিশশো বাহাত্তর সালের এপ্রিল মাসে এক পরিচিত জনের খোঁজে তিনি গিয়েছিলেন বাংলাদেশ বেতারের অফিসে। সেখানে দেখলেন রেডিওতে সংবাদ পাঠকের জন্য অডিশন নেয়া হচ্ছে। বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রমের পরিচালক মো. মোহাদ্দেস তাকে অনেকটা জোর করেই অডিশন দিতে বাধ্য করেন এবং এতে তিনি পাশও করেন।

এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশ বেতারের সংবাদ বিভাগের প্রধান সাইফুল বারীর কাছে। মি. বারী শামীম আহমেদকে বহির্বিশ্ব কার্যক্রমে খবর পড়ার জন্য বলেন। মাস তিনেক খবর পড়ার পর বেতারের নিউজ এডিটর ফয়েজ চৌধুরী তাকে অনুরোধ করেন স্থানীয় সংবাদ পড়তে।

Image caption সত্তরের দশকের শেষ দিকে বিটিভিতে খবর পড়ছেন শামীম আহমেদ।

এক মাস পর একদিন নিউজ পড়ে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে আসার পর ফয়েজ চৌধুরী তাকে পরিচয় করিয়ে দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগের তৎকালীন চীফ নিউজ এডিটর হুমায়ূন চৌধুরীর সাথে।

"উনি তখন আমাকে টেলিভিশনে খবর পড়ার জন্য বললেন। আমার এই চেহারা নিয়ে আমি কখনই টিভিতে খবর পড়তে যাবো না, সেকথা আমি ওনাকে জানিয়ে দিলাম। বললাম এ অসম্ভব। উনি বললেন, এসব তুমি আমাদের ওপর ছাড়ো। তুমি কী পারো বা না পারে সেটা পরে দেখা যাবে। এই রকম জোর করেই ব্যাপারটা হলো। কিন্তু ঢুকে যখন পড়লাম তখন নেশা হয়ে গেল।"

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে তখন সংবাদ পাঠকদের জন্য কোন প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা ছিল না। এজন্য বাংলাদেশ বেতার সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউটের পরিচালক প্রফেসর মোহাম্মদ মহীউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিলকে বলেন। অধ্যাপক মহীউদ্দিন শামীম আহমেদের বাবা।

ব্রিটিশ কাউন্সিল তখন সংবাদ পাঠকদের জন্য একটা ছোট ট্রেনিং কোর্সের ব্যবস্থা করে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদ পাঠকদের জন্য সেটাই ছিল প্রথম কোন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।

কিন্তু সংবাদে সঙ্গে শামীম আহমেদের যে যোগাযোগ তা, তার ভাষায়, জোরপূর্বক হলেও কাকতালীয় নয়।

তার দুজন মামা হলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদ এবং আতিকুস সামাদ। আতিকুস সামাদ দীর্ঘদিন কাজ করেছেন বিবিসি বাংলায়। আর আতাউস সামাদের নাম ছড়িয়ে আছে সারা বাংলাদেশে।

ছোটভাই নাফিজ ইমতিয়াজুদ্দিনও তার পথ অনুসরণ করে রেডিও এবং টেলিভিশনে সংবাদ পাঠ করছেন দীর্ঘদিন ধরে।

Image caption খ্যাতনামা পপ গায়ক ক্লিফ রিচার্ডের সঙ্গে।

কিন্তু সেই সময়ে সংবাদ পাঠের নেশাকে চাইলেও পেশাতে পরিণত করতে পারেন নি শামীম আহমেদ। "কারণ সেখান যে পারিশ্রমিক আমরা পেতাম, তা দিয়ে জীবিকা চালানো ছিল কঠিন। আমার লেখাপড়া ছিল মার্কেটিংয়ে। শেষ পর্যন্ত আমি মার্কেটিংয়েই চাকরি করা শুরু করলাম। তবে আমাদের একটা সুবিধে ছিল। চাকরির পরে আমরা এই খন্ডকালীন কাজ করতে পারতাম। এবং আমাদের এমপ্লয়াররা খুশি মনেই এতে সায় দিত।"

সেই সময়ে আট কোটি জনসাধারণের জন্য রেডিও এবং টিভি ছিল একটি। তাই সেখানে সুযোগ পাওয়াও ছিল কঠিন। কিন্তু বেসরকারি একুশে টেলিভিশন চালু হওয়ার পর বদলে গেল সবকিছু। এখন বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে কুড়িটির মতো। সুযোগও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি।

শামীম আহমেদ বলছেন, এত সুযোগ থাকার পরও, এতগুলো টিভি চ্যানেল থাকার পরও হাতে গোনা দু'একটা চ্যানেল বাদে সংবাদ পরিবেশনার মান সার্বিকভাবে পড়ে গিয়েছে।

"আমি উচ্চারণের কথাই যদি বলি, যখন আমরা খবর পড়তাম তখন কোন শব্দের উচ্চারণ নিয়ে বিতর্ক হলে যদি বলা হতো রেডিওতে বা টেলিভিশনে আমি এই উচ্চারণ শুনছি, তখন সেই বিতর্কটা সেখানেই শেষ হয়ে যেত। সেটাই ছিল স্ট্যান্ডার্ড। যেমন, ইংরেজি শব্দের উচ্চারণের জন্য আমরা বিবিসিকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে দেখতাম। এখন মনে হয় না সেটা অনুসরণ করা হয়।"

তিনি বলেন, যারা সংবাদ পাঠ করেন বা যারা টেলিভিশন চালান দর্শকদের প্রতি একটি দায়িত্ব রয়েছে। টেলিভিশন দেখে দর্শকরা যাতে ভাল কিছু শিখতে পারেন সেই চেষ্টাই করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

কিন্তু এখন যারা সংবাদ পরিবেশনের জন্য তৈরি হচ্ছেন তাদের প্রতি শামীম আহমেদের পরামর্শ: কাজটাকে ভালবাসতে হবে, কাজে প্যাশন থাকতে হবে। কাজ শেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। ভাষা, উচ্চারণ ঠিক রাখতে হবে। "প্রমিত বাংলাকে আমরা এখন অবজ্ঞা করি। এটা মেনে নিতে পারি না।"

শামীম আহমেদ বর্তমানে ম্যানেজমেন্ট এবং মিডিয়া কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।

Image caption তারা নিউজের জন্য ২০০৬ সালে সাবেক বিবিসি সংবাদদাতা মার্ক টালির সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন শামীম আহমেদ।

সম্পর্কিত বিষয়