'তারা যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমার বাবা কই, তখন কোন উত্তর দেয়ার মতো ভাষা আমার থাকে না'

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৪৮জনের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৪৮জনের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে

তিনবছর আটমাস আগে আরো পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে নিখোঁজ হন ঢাকার বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন। প্রতিটা মুহূর্ত তার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে পরিবার।

তাদের দাবি, তার ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনকে প্রায় চার বছর আগে গুম করা হয়েছে।

সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি বিবিসিকে বলছেন, ''এই গুম ব্যাপারটা একটি হত্যাকাণ্ডের যে বেশি ভয়াবহ। বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তার দুইটা ছেলে আছে। তারা যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমার বাবা কই ফুপু, তখন কোন উত্তর দেয়ার মতো ভাষা আমার থাকে না। যখন দেখি কাউকে তুলে নিয়ে গেছে, অনেকদিন পরে তারা যখন ফিরে আসেন, তাদের কাছে নির্যাতনের যে বর্ণনা আমরা শুনি, সেগুলো আমরা প্রতিনিয়ত মনে করি, আমার ভাইকে কি তাহলে এভাবে আটকে রেখেছে, আমার ভাইকেও কি তাহলে এভাবে নির্যাতন করছে?''

২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ মোট ছয়জন নিখোঁজ হন।

আরো পড়তে পারেন:

গুরমিত সিংয়ের বিশাল আশ্রমের ভেতরে যা আছে

জাপানের ওপর দিয়ে উড়ে গেল উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র

নরখাদকের ভয়ে অস্থির এক গ্রামের চিত্র

Image caption র‍্যাবের সদস্যরা ছয়জনকে তুলে নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করা হলেও, সেটি বরাবরই র‍্যাবের পক্ষ থেকে নাকচ করে দেয়া হয়েছে

সানজিদা ইসলাম তুলি বলছেন, ''সেদিন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে আমার ভাই সুমনসহ তার আরো পাঁচ বন্ধুকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদেরকে যারা তুলে নিয়ে যান, তারা অস্ত্র সজ্জিত ছিলেন এবং তাদের পরনে ছিল র‍্যাবের পোশাক। তিনটা ডাবল কেবিন ভ্যান আর একটা সাদা মাইক্রোবাস ছিল এবং এসব গাড়িতেও র‍্যাব-১ লেখা ছিল। রাত সাড়ে আটটার দিকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়।''

তিনি বলছেন, ''যেখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়, তার পাশেই একটি ভবনের নির্মাণ কর্মীরা এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এমনটি আমার ভাইয়ের আরো দুইজন বন্ধু পেছন থেকে পালিয়ে আসতে পারেন, তারাও এসব ঘটনা দেখেছেন।''

তবে বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে র‍্যাবের পক্ষ থেকে।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৪৮জনের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে । গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীও রয়েছেন।

গুম হওয়া কয়েকজনের স্বজনেরা ঈদ উল আজহার আগেই নিখোঁজদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি তুলেছে।

বিএনপির তৎকালীন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমানে ২৫ নম্বর ওয়ার্ড) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাজেদুল ইসলাম সুমন।

ছবির কপিরাইট Focus Bangla
Image caption আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ (ফাইল চিত্র)

সানজিদা ইসলাম তুলি বলছেন, ''তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পরেই আমার মা, বোন, ভাই প্রথমে ভাটারা থানায় যান। কিন্তু র‍্যাব-এ তাদের তুলে নিয়ে গেছে বললে, তারা কোন মামলা বা জিডিও নেননি। এরপর র‍্যাব-একের অফিসে যায়। কিন্তু তারা বারবার অস্বীকার করেন যে, এরকম কাউকে তারা তুলে আনেননি।''

যে ছয়জন সেদিন ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের কেউ আর ফিরে আসেননি বলে জানান তুলি।

তিনি বলছেন, ''তাদের কারো কোন খবর নেই। তিনবছর আটমাস ধরে যারা স্বজন হারা, আমরা প্রতিটা মুহূর্তে একসঙ্গে পার করছি।''

এখনো ভাইয়ে ফিরে পাবার আশা করছেন সানজিদা ইসলাম তুলি আর তার পরিবার।

তিনি বলছেন, ''অবশ্যই আমরা ফিরে পাওয়ার আশা করি। আমার ভাই যদি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী হন, এটা কোন কারণ হতে পারে না তাকে গুম করে ফেলার, নিখোঁজ করে ফেলার।''

এ বিষয়ে বিবিসির আরো খবর:

বাংলাদেশে গুম নিয়ে কেন এই আতঙ্ক-উদ্বেগ?

'অনেক মানুষকে গোপনে আটকে রেখেছে নিরাপত্তা বাহিনী'

সম্পর্কিত বিষয়