অং সান সু চি ও তার সরকার বালিতে মাথা গুঁজে রেখেছে: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

Image caption বিবিসির সংবাদদাতা দেখেছেন মুসলমানদের বহু গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন তার তীব্র সমালোচনা করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

তার বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একজন পরিচালক জেমস গোমেজ। লন্ডন-ভিত্তিক এই সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক তিনি।

মি. গোমেজ বলেন, "অং সান সু চি তার বক্তব্যের মাধ্যমে আবারও দেখিয়েছেন যে তিনি ও তার সরকার রাখাইন রাজ্যের ভয়াবহ পরিস্থিতির বিষয়ে বালিতে তাদের মাথা গুঁজে রেখেছেন।"

রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়ে চুপ থাকায় বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার মধ্যেই আজ মঙ্গলবার এই প্রথম মুখ খোলেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এই নেত্রী।

টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে অং সান সু চি বলেছেন, রাখাইন থেকে মুসলমানরা কেন পালাচ্ছে সেটা তিনি জানেন না। তার সরকারকে এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন মিজ সু চি-র কিছু বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই প্রথম মুখ খুললেন অং সান সু চি। কিন্তু তিনি তার ভাষণে রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখ করেন নি

তিনি বলেন, "৫ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে যদি রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধ হয়ে যাওয়ার বক্তব্য সত্য হয়, তাহলে গত দু'সপ্তাহে আমরা সেখানে যেসব গ্রাম পুড়ে যেতে যেতে দেখেছি, সেগুলোতে কারা আগুন দিচ্ছে?"

জাতিসংঘের একটি সংস্থা ইউনিসেফের একজন কর্মকর্তা পল এডওয়ার্ডস মিজ সু চি-র বক্তব্যে সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, "আমাদের কেউই আসলে জানি না রাখাইনে কি ঘটছে। কারণ আমরা সেখানে যেতে পারছি না।"

মাত্র তিন সপ্তাহে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে জীবন বাঁচাতে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে গেছেন।

সু চি'র ভাষণ: যে বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলেন তিনি

মুসলিমদের সাথে কথা বলতে চান অং সান সু চি

জাতিসংঘের তরফে সেনাবাহিনীর এই অভিযানকে জাতিগত নিধন হিসেবে উল্লেখ করে সংঘের প্রধান এই অভিযান বন্ধে অং সান সু চি-র হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন। ফলে মিজ সু চি আজ কি বলেন সেদিকে সবারই তীব্র আগ্রহ ছিলো।

অং সান সু চি-র এই ভাষণের পরপরই জাতিসংঘ মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে তাদের কর্মকর্তাদেরকে মিয়ানমারে গিয়ে অবাধে ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, সেখানে আসলেই কি ঘটছে, সেটা তাদের কর্মকর্তারা 'নিজের চোখে' দেখতে চান।

মিজ সু চি অবশ্য তার ভাষণে সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা করেছেন।

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption গত তিন সপ্তাহে মিয়ানমার থেকে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে

এর আগে গত মার্চ মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ এবিষয়ে তদন্ত শুরু করেছিলো। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তদন্তকারীদেরকে সেদেশে যেতে দেয়নি।

মিজ সু চি-র ভাষণের পর জাতিসংঘের তরফে আবারও এই একই দাবি জানানো হয়েছে।

রাখাইন রাজ্য সরকারের সেক্রেটারি তিন মঙ সোয়ে মিজ সু চি-র ভাষণকে অত্যন্ত 'স্বচ্ছ' উল্লেখ করে এর প্রশংসা করেছেন। তবে রাখাইনে মুসলমান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তিনি যেসব অঙ্গীকার করেছেন সে ব্যাপারে তিনি খুব একটা আশাবাদী নন।

"পরিস্থিতি বিস্ফোরণের জন্যে তৈরি। এর জন্যে শুধু একটু স্ফুলিঙ্গ প্রয়োজন।"

তবে চীন ও রাশিয়ার কূটনীতিকরা মিয়ানমারের ডি ফেক্টো নেত্রী অং সান সু চি-র ভাষণকে স্বাগত জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই দুটো দেশের অবস্থান শুরু থেকে মিয়ানমারের পক্ষে। এবারও মিজ সু চির ভাষণের ব্যাপারে দেশ-দুটোর কূটনীতিকদের মুখে একই সুর।

মিয়ানমারে চীনা রাষ্ট্রদূত হং লিয়াং বলেছেন, "চীনের অবস্থান খুব পরিষ্কার। রাখাইনে শান্তি ও স্থিতি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে আমরা তাকে সমর্থন করছি।"

রাশিয়ার কূটনীতিকরাও মিজ সু চি-র বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। মিয়ানমারে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত নিকোলাই এ লিস্তোপাদভ বলেছেন, "রাখাইনে জাতিগত নিধন অভিযান, গণহত্যা- এসবের নিন্দা জানানোর মতো কোন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।"