তৃণমূল ছাড়লেন মমতার ‘ছায়াসঙ্গী', গন্তব্য বিজেপি?

মমতা ব্যাণার্জি ও মুকুল রায় ছবির কপিরাইট DIBYANGSHU SARKAR
Image caption মমতা ব্যাণার্জি ও মুকুল রায় (ফাইল ছবি)

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের এক সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ও ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী মুকুল রায় আজ তার দল ছাড়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি পদত্যাগ করছেন পার্লামেন্টের সদস্যপদ থেকেও।

তাকে এক সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সবচেয়ে আস্থাভাজন বলে মনে করা হত, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন গড়ে তোলার জন্যও অনেকে মুকুল রায়কেই কৃতিত্ব দেন।

তবে গত বেশ কিছুদিন ধরেই শাসক দল বিজেপির সঙ্গে মাখামাখির অভিযোগে দলের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ছিল, আজ সেই বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হল। সাথে সাথে কলকাতা এবং দিল্লির রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষো শুরু হয়েছে মি রায় হয়ো বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন।

তবে মুকুল রায়ের বিজেপিতে যোগদানের ব্যাপারে এখনও কোনও প্রস্তাব নেই বলেই দলটি দাবি করেছে।

প্রায় কুড়ি বছর আগে মমতা ব্যানার্জি যখন কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল দলটি গঠন করেন, সেই তখন থেকেই মুকুল রায় ছিলেন কার্যত তার রাজনৈতিক সচিব, ছায়াসঙ্গী ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুচর।

এমন কী, মমতা ব্যানার্জি দিল্লিতে তার ছেড়ে আসা রেলমন্ত্রীর পদেও বেছে নিয়েছিলেন তার এই প্রিয়পাত্রকেই - আর দিল্লিতে মুকুল রায়ের বাসভবনই ছিল তৃণমূলের কার্যালয় তথা রাজধানীতে মমতা ব্যানার্জির ঠিকানা।

সেই মুকুল রায়ই এদিন কলকাতায় তড়িঘড়ি সাংবাদিক বৈঠক ডেকে জানিয়ে দিলেন তৃণমূলের সঙ্গে তিনি সব সম্পর্ক ত্যাগ করছেন।

তিনি জানান, "১৯৯৭-র ১৭ ডিসেম্বর তৃণমূলের জন্মলগ্নে আমি ছিলাম প্রথম স্বাক্ষরকারী। কিন্তু আজ আমি অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে দলের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যপদ থেকে ই-মেইল পাঠিয়ে ইস্তফা দিচ্ছি। রাজ্যসভায় দলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছিলাম - তার মেয়াদের এখনও আট মাসের মতো বাকি - পুজোর পর তা থেকেও ইস্তফা দিয়ে দেব"।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা ইস্যুতে আসিয়ান জোটে মালয়েশিয়ার বিদ্রোহ

ছবির কপিরাইট RAVEENDRAN
Image caption ২০১২ সালে ভারতের রেলমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিচ্ছেন মুকুল রায়

তৃণমূল ছাড়ার নেপথ্যে

তবে তিনি ঠিক কী কারণে তৃণমূল ছাড়লেন, মুকুল রায় আজ তার কোনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। শুধু জানিয়েছেন, যে দিন পার্লামেন্টের সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেবেন সে দিনই তিনি সে কথা ভেঙে বলবেন।

মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে মুকুল রায়ের সম্পর্কে অবশ্য গত বছর তিনেক ধরেই নানা ওঠাপড়া চলছিল - তবু গত বছর পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে মুকুল রায়কে দলে পুনর্বাসন দেওয়া হয়।

মমতা ব্যানার্জি সে সময় এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন, বিজেপিই না কি তাকে ব্ল্যাকমেল করে তৃণমূল থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইছিল।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন বলেছিলেন, "বিজেপি মুকুলকে খুব ডিস্টার্ব করছিল। ওকে যেভাবে রাজনৈতিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছিল, সেগুলো ঠিক নয়। আমি তো ওকে আগলেই রেখেছিলাম, কিন্তু হয়তো ও বেচারাকে এমনভাবে মানসিক চাপে ফেলেছিল যে মুকুল হয়তো কিছুটা সরে গিয়েছিল। তবে সেটা তেমন কিছু নয়!"

কিন্তু যে তৃণমূল কংগ্রেসে মমতা ব্যানার্জিই প্রথম ও শেষ কথা বলে ধরা হয়, সেখানে একজন মুকুল রায়ের গুরুত্ব ঠিক কোথায়?

দলের বিদ্রোহী এমপি কুনাল ঘোষ - যিনি দুজনকেই বহু বছর খুব কাছ থেকে দেখেছেন - তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "শুধু মমতা ব্যানার্জির জনপ্রিয়তা দিয়ে কিন্তু নির্বাচনী সাফল্য আসত না - এর পাশাপাশি সাংগঠনিক ও আনুষঙ্গিক আরও নানা ব্যাপারও কিন্তু থাকে, যার অনেকটাই মুকুলদা দেখতেন।"

"মানে আমি বলতে চাইছি মমতা ব্যানার্জি তো সেই '৯২ সালেই ব্রিগেডে বামফ্রন্ট সরকারের মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছিলেন - তাহলে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হতে সেই ২০১১ সাল হয়ে গেল কেন? ব্যক্তি মমতা ব্যানার্জির জনপ্রিয়তা তো বরাবরই ছিল, তাই না?"

আসলে সেই জনপ্রিয়তাকে রাজনীতির নানা জটিল অঙ্ক কষে ভোটবাক্সে এনে ফেলার অন্যতম কারিগরই ছিলেন মুকুল রায়, মনে করেন কুনাল ঘোষ।

"মমতার সমর্থনে হাওয়াটাকে তিল তিল করে একটা সাংগঠনিক চেহারা দেওয়া, কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্ককে সঙ্গে রাখা, পাহাড়ের নেতা বিমল গুরুংকে ডুয়ার্সে কাজে লাগানো, জঙ্গলমহলের মাওবাদীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমঝোতায় আসা, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের পর শহরের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত ও বুদ্ধিজীবীদের পরিবর্তন, সিপিএমের বিক্ষুব্ধ অংশকে কাছে টানা ও মিডিয়ার একটা অংশের প্রচার - এই সবগুলোর পেছনেই কিন্তু মুকুল রায় ছিলেন একটা বড় ফ্যাক্টর", বলছিলেন তিনি।

এই কারণেই তিস্তা চুক্তি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে দরকষাকষিই হোক কিংবা নির্বাচন কমিশনে আর্জি পেশ - দিল্লিতেও তৃণমূলের মুখ ছিলেন মুকুল রায়। রাজ্যেও প্রতিটি জেলার বুথ স্তরের দলীয় কর্মীদেরও তিনি না কি নামে চিনতেন।

আরও পড়ুন: মমতা ব্যানার্জীর মাথার জন্য ১১লক্ষ রুপির 'পুরস্কার' ঘোষণা বিজেপি নেতার

ছবির কপিরাইট MONEY SHARMA
Image caption বিজেপি নেতা এবং অর্থমন্ত্রী অরুন জেটলি। তার সাথে মুকুল রায়ের কথিত ঘনিষ্ঠতা নিয়ে তৃণমূলের ভেতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

বিজেপির সাথে মুকুলের ঘনিষ্ঠতা

কিন্তু পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাই শেষ পর্যন্ত তৃণমূলে মুকুল রায়ের পতন ডেকে আনল।

বিজেপি নেতা সিদ্ধার্থনাথ সিং এদিন অবশ্য বলেছেন, তৃণমূল থেকে দলত্যাগের হিড়িক পড়বে এটা প্রত্যাশিত হলেও মুকুল রায় বিজেপিতে যোগ দেবেন - এমন কোনও প্রস্তাব আছে বলে তার জানা নেই।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস এর মধ্যেই তাকে ছবছরের জন্য বহিষ্কার করার কথা ঘোষণা করেছে - আর এখন নিজে নতুন দল গড়া কিংবা বিজেপিতে যাওয়াই মুকুল রায়ের রাজনৈতিক ভবিতব্য বলে পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন।

কিন্তু নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রধান মেন্টর মমতা ব্যানার্জিকে তিনি কতটা বেগ দিতে পারেন, এখন দেখার বিষয় মূলত সেটাই।

সম্পর্কিত বিষয়