একটি ভ্রমণ কাহিনী ও রোহিঙ্গা আদি নিবাস বিতর্ক

Image caption এ বইয়ের একটি লেখা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে

রোহিঙ্গাদের আদি ভূমি কোথায়? মিয়ানমার বরাবরই বলছে রোহিঙ্গাদের আদি নিবাস বাংলাদেশে।

তাঁরা বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে গিয়ে মিয়ানমারের রাখাইনে (পূর্ব নাম আরাকান) বসতি গেড়েছে। মিয়ানমারের সরকার এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী বিষয়টিকে সেভাবেই দেখে।

কিন্তু বাংলাদেশ মনে করে রোহিঙ্গারা কয়েকশ বছর ধরে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে বসবাস করছে এবং তাদের আদি নিবাসের সাথে বাংলাদেশ ভূখন্ডের কোন সম্পর্ক নেই।

এনিয়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন বাংলাদেশের অষ্টম শ্রেণীর একটি পাঠ্য বইয়ের লেখায় বলা হয়েছে, মিয়ানমারের মংডু এলাকায় বসবাসরত মুসলমান এবং হিন্দুরা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে সেখানে গিয়ে বসবাস করছে।

রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের যে বক্তব্য, এ লেখাটি তার বিপরীত।

অর্থাৎ মিয়ানমার বিষয়টিকে যেভাবে দেখে বাংলাদেশের অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্য বইতে বিষয়টি অনেকটা সে রকমভাবেই ফুটে উঠেছে।

অষ্টম শ্রেণীর সাহিত্য-কণিকা বইতে 'মংডুর পথে' শিরোনামে এ ভ্রমণ কাহিনীটি লিখেছেন বিপ্রদাস বড়ুয়া।

বিবিসি বাংলার সাথে আলাপকালে বিপ্রদাস বড়ুয়া জানালেন, প্রায় ১৭ বছর আগে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে তিনি মিয়ানমারের মংডু এলাকা ভ্রমণে গিয়েছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের মংডু ও আশপাশের এলাকা থেকে দেশটির সেনাবাহিনীর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে প্রায় সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

বিপ্রদাস বড়ুয়া তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে লিখেছেন, " সারা মিয়ানমারে আমাদের রিক্সার বদলে পাইক্যা। স্থানীয় মুসলমানরা এর একচেটিয়া চালক। মংডুর ব্যবসাও প্রায় ওদের দখলে,আর হিন্দুরাও আছে। এরা চট্টগ্রাম থেকে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে আছে।"

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption রাখাইনে পোড়া ভিটার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন দুজন রোহিঙ্গা।

কিন্তু এ 'দীর্ঘদিন' বলতে কতদিন বোঝানো হচ্ছে, সেটি এ ভ্রমন কাহিনীতে পরিষ্কার নয়।

লেখক বিপ্রদাস বড়ুয়া মংডু ভ্রমণের সময় সেখানকার বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরায় খাওয়া-দাওয়া করেছেন।

এ রকম একটি ঘটনার বর্ণনা করে তিনি লিখেছেন, "রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো একটি মেয়ে। বাঙালী। লুঙ্গি এবং কোমর-ঢাকা ব্লাউজ পরেছে। মেয়েটি দিব্যি চট্টগ্রামের ভাষায় এটা-ওটা আছে জানিয়ে রাখতে লাগল। ওর নাম ঝরনা। পূর্বপুরুষের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান। আমার পাশের থানা। ওর মতো আরো একজন মেয়ে রান্নাবান্না করে।"

লেখকের এ বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায়, মিয়ানমারের মংডুতে বসবাসরত অনেক মানুষ বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে সেখানে স্থায়ী হয়েছে।

লেখক বিপ্রদাস বড়ুয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি তাৎক্ষনিকভাবে যা দেখেছি তাই লিখেছি। যা শুনেছি তাই লিখেছি। এটা তো গবেষণামূলক বই নয়। কতজন সেখানে গিয়েছে সেটা তো আমি হিসেব করে দেখিনি। তাছাড়া এটা কোন গবেষণামূলক বই নয়। আমি তো কোন ডাটা সংগ্রহ করিনি।"

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, লেখক বিপ্রদাস বড়ুয়া যা লিখেছেন, ইতিহাসের দৃষ্টিতে সেটি কতটা সঠিক? তিনি কি ভুল তথ্য লিখেছেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলছেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার অঞ্চল থেকে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে গিয়েছে। এ কথা সত্যি।

কিন্তু তারা অষ্টম শতকে আরাকান অঞ্চলে গিয়েছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক হোসেন।

তিনি বলেন, "বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের যে জনগোষ্ঠী তারা ১৬ শতকে সেখানে এসেছে। তারা তো এদেশের নাগরিক। তাহলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক হতে পারবে না কেন? এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অভিবাসন হলে নাগরিক হতে কোন সমস্যা নেই।"

অধ্যাপক হোসেন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি 'মংডুর পথে' ভ্রমণকাহিনীটি পাঠ্যপুস্তকে না থাকাই ভালো।

২০১২ সালে এ ভ্রমন কাহিনী যখন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন বিষয়টি নিয়ে তেমন একটা চিন্তা-ভাবনা করেনি পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।

ছবির কপিরাইট DOMINIQUE FAGET
Image caption মিয়ানমার থেকে পালিয়ে অনেক রোহিঙ্গা এ কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।

কারণ সে সময় রোহিঙ্গা সংকট এখনকার মতো ততটা জটিল আকার ধারণ করেনি।

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, 'মংডুর পথে' ভ্রমণকাহিনী নিয়ে যে বিতর্কের তৈরি হয়েছে সেটি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন।

সে কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ ভ্রমনকাহিনী নিয়ে 'ভিন্ন চিন্তা' হতে পারে।

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সে কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাঠ্য বইতে কোন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হবে, সে বিষয়গুলো সুপারিশ করে সম্পাদনা পরিষদ।

দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের নিয়ে এ সম্পাদনা পরিষদ গঠন করা হয়।

অষ্টম শ্রেণীর সাহিত্য-কণিকা বইটির সংকলন, রচনা এবং সম্পাদনার সাথে জড়িত ছিলেন ১১জন শিক্ষাবিদ। যাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড: সৌমিত্র শেখর।

অধ্যাপক শেখর জানাচ্ছেন, 'মংডুর পথে' ভ্রমন কাহিনীটি তিনি সম্পাদনা করেননি।

তবে এ ভ্রমণকাহিনী বাছাই করার পেছনে তাদের যুক্তি ছিল, প্রতিবেশী মিয়ানমার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারনা দেয়া।

অধ্যাপক শেখর বলেন, "এটা ছিল একটা ডায়েরি জাতীয় লেখা। এ লেখাটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে কিভাবে ভ্রমণ ডায়েরি লেখা যায়। ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রায় ৮০টি গদ্য ও কবিতা আমরা বাছাই করেছি। সব সম্পাদক সবগুলো লেখা দেখেননি। একেক জনের ভাগে একেকটা লেখা পড়েছিল। মংডুর ডায়েরি লেখাটির সাথে কোন সম্পাদক জড়িত ছিলেন, সেটি পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বলতে পারবে।"

মিয়ানমার সম্পর্কিত আর কোন ভ্রমণ কাহিনী পাওয়া যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সম্পাদনা পরিষদের সাথে জড়িত আরেকজন অধ্যাপক বলেন, 'মংডুর পথে' ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে তিনি অবগত নন।

লেখক বিপ্রদাস বড়ুয়া মিয়ানমার থেকে ফেরার পর তাঁর ভ্রমনকাহিনী ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় লিখেছেন। সে ভ্রমনকাহিনী নিয়ে ' অপরূপ আরাকান' নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে।

বিপ্রদাস বড়ুয়া বিবিসি বাংলাকে জানান, তাঁর লেখা পাঠ্যপুস্তক বইতে ছাপানোর বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। এনিয়ে কেউ তাঁর সাথে কোন দিন যোগাযোগ করেনি বলে তিনি জানান।

সম্পর্কিত বিষয়