'প্লেবয়' প্রতিষ্ঠাতা হিউ হেফনার: অশ্লীলতা নাকি বিপ্লবের রাজা?

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption হিউ হেফনারের সঙ্গে তাঁর তৃতীয় স্ত্রী ক্রিস্টাল হ্যারিস

'প্লেবয়' ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা হিউ হেফনার মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

প্লেবয় এন্টারপ্রাইজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লস এঞ্জেলেসে নজি বাড়িতে নিজের বাড়ি মি: হেফনারের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

১৯৫৩ সালে বাড়ির রান্নাঘর থেকে 'প্লেবয়' ম্যাগাজিনের প্রকাশনা শুরু করেছিলেন হিউ হেফনার। এক সময় এটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া 'মেনস' ম্যাগাজিনে পরিণত হয়।

এই ম্যাগাজিনটি যখন সাফল্যের শীর্ষে ছিল তখন মাসে এট সর্বোচ্চ ৭০ লাখ কপি পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।

তাঁর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক এই ম্যাগাজিনটি অনেকে 'অশ্লীল' বা নোংরা মনে করলেও, অনেকের কাছে এই ম্যাগাজিনটি যৌন বিপ্লবের অগ্রদূত।

মি: হেফনারের ছেলে কুপার হেফনার বলেছেন "বাবাকে অনেকে মিস করবে"।

বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক বিবৃতিতে কুপার হেফনার বলেন, "তিনি ছিলেন গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি অঙ্গনের একজন অগ্রদূত। তাঁর জীবনযাপন ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি মুক্তচিন্তা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও যৌন স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে গেছেন"।

হিউ হেফনার লাখ লাখ পুরুষের জন্য এক ফ্যান্টাসির দুনিয়া তৈরি করে গেছেন।

তবে অধিকাংশ পাঠকের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য হলো, সেই ফ্যান্টাসির জীবন মি: হেফনার নিজেই যাপন করে গেছেন।

১৯৫০ ও ৬০ এর দশকে অ্যামেরিকানদের মধ্যে নতুন এক প্রজন্ম তৈরি করেছেন যারা ভিন্ন এক স্ট্যান্ডার্ডে জীবনযাপনের মজা নিয়েছেন।

রাজনৈতিক কর্মী এবং মানবপ্রেমিক এই ব্যক্তি শুধুমাত্র একটি ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা করেননি, তিনি এর মাধ্যমে এক ধরনের লাইফস্টাইল তৈরি করে দিয়েছিলেন।

এছাড়া তাঁর চালু করা প্লেবয়ের জনপ্রিয় 'বো-টাই পরা র‍্যাবিট' এর লোগোটি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে স্বীকৃত একটি ব্র্যান্ড।

হিউ মারস্টন হেফনার ১৯২৬ সালের ৯ই এপ্রিল শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা-মা দুজনেই ছিলেন শিক্ষক। তাঁর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল যথেষ্ট দৃঢ়।

মার্কিন সেনাবাহিনীতে একজন লেখক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।

সাইকোলজি বা মনোবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক পাশ করা মি: হেফনার 'এসকোয়ার' নামে একটি মেন'স ম্যাগাজিনের কপিরাইটার হিসেবে কাজ শুরু করেন।

১৯৫৩ সালে প্লেবয় ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ নেন তিনি, প্রথম প্রকাশনার জন্য ৮ হাজার ডলার ধার করেন হেফনার।

তবে প্রথম সংস্করণটি যদি সময়ের মধ্যে বিক্রি না হয় সেই আশঙ্কায় সে সংস্করণ থেকে তারিখ তুলে নেন মি: হেফনার।

আরো পড়তে পারেন:

'এখন আর বংশালের লোকজন অদ্ভুত চোখে তাকায় না'

লুকিয়ে থাকা রোহিঙ্গারা লতাপাতা খেয়ে বেঁচে আছে

ছবির কপিরাইট Getty Images

ম্যাগাজিনের ছবি

মি: হেফনারের মা এক হাজার ডলার দেন প্রকাশনার জন্য।

"আমি যে উদ্যোগ নিয়েছিলাম সেটাতে তার বিশ্বাস থাকার থেকে বড় কথা ছিল তাঁর ছেলের ওপর মানে আমার ওপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিলো" মা সম্পর্কে বলেছিলেন মি: হেফনার।

প্রথমে ম্যাগাজিনের নাম 'স্ট্যাগ পার্টি' রাখার পরিকল্পনা ছিল তাঁর, কিন্তু শেষ মুহুর্তে তিনি নাম পরিবর্তন করেন।

"আপনি কি এটা চিন্তা করে পারেন যে ক্লাবগুলোতে শিং পরিহিত একদল মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে?"

প্লেবয় এর প্রথম এডিশনে ম্যারিলিন মনরোর কয়েকটি নগ্ন ছবি প্রকাশ করা হয়, যেগুলো ২০০ ডলারের বিনিময়ে কিনেছিলেন মি: হেফনার।

ওই ছবিগুলো ১৯৪৯ সালের একটি ক্যালেন্ডারের জন্য তোলা হয়েছিল।

ভাগ্য বা সিদ্ধান্ত যাই বলুন না কেন হেফনারের প্লেবয় প্রকাশনার সময়টা ছিল একদম সঠিক।

মানুষের যৌন আচার আচরণ সম্পর্কিত ব্যবহার, বিশ্বাস ইত্যাদি নিয়ে আলফ্রেড কিনসি'র প্রতিবেদন ছাড়া সেই সময়ে যৌন বিষয়ক কথাবার্তা ছিল একধরনের 'ট্যাবু'র মতো।

"কিনসি ছিল গবেষক। আর আমি ছিলাম পুস্তিকা লেখক" -প্লেবয় প্রকাশের বেশ কিছুদিন পর বলেছিলেন হিউ হেফনার।

প্লেবয় ম্যাগাজিন ছবির কপিরাইট Image copyrightPLAYBOY
Image caption প্লেবয়-এর প্রথম সংস্করণ থেকে তারিখ সরিয়ে নেয়া হয়, যদি সময়ের মধ্যে ম্যাগাজিন বিক্রি না হয় এই আশঙ্কায়।

র‍্যাবিট বা খরগোশ

যুদ্ধ পরবর্তী অ্যামেরিকান সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পুরুষদের মধ্যে প্লেবয় ম্যাগাজিন যেন 'বাইবেলে'র মতো হয়ে উঠে।

ম্যাগাজিনটিতে আঁটোসাঁটো পোশাক পরা নারীদের যে আকর্ষণীয় ছবি দারুণ সমন্বয় করে প্রকাশ হতো এবং যে ধরনের আর্টিকেল প্রকাশ হতো শহরের পঞ্চাশের দশকের পুরুষদের কাছে সেটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

"আমি এটাকে কখনো সেক্স ম্যাগাজিন হিসেবে ভাবিনি। আমি সবসময় এটাকে লাইফস্টাইল ম্যাগজিনই ভেবেছি, আর সেক্স বা যৌনতার বিষয় ছিল এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ" -বলেছিলেন মি: হেফনার।

প্রথম প্রকাশের কয়েক সপ্তাহেই এটির ৫০ হাজারেরও বেশি কপি বিক্রি হয়ে যায়।

হেফনার দেখলেন যে বাজারে পুরুষদের জন্য এই প্রকাশিত এই ম্যাগাজিনটি যথেষ্ট স্থান করে নিল। কারণ সে সময় পুরুষদের জন্য মূলত শিকার, শুটিং এবং ফিশিং বা মাছ ধরার বিষয়গুলোর ওপরেই বেশি জোর দিয়ে ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হতো।

অন্যদিকে ম্যাগাজিনটির আরেকটি বিশেষত্ব ছিলো এর প্রচ্ছদের র‍্যাবিট বা খরগোশ লোগোটি।

বো-টাই পরা ওই র‍্যাবিটের লোগোটি ডিজাইন করেছিলেন আর্ট পল। দশকের পর দশক ধরে এটি দারুণ একটি ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে।

১৯৫৫ সালে চার্লস বোমোন্টের লেখা একটি ছোট গল্প প্রকাশ করেন মি: হেফনার। যে গল্পটির বিষয়বস্তু ছিলে বিশ্বে সমকামী মানুষের সংখ্যা বেশি এবং সোজা পুরুষ অর্থাৎ বিপরীতকামী পুরুষেরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।

কিন্তু এরপর অনেক চিঠি পান যেখানে তাঁর ম্যাগাজিনের গল্পের জন্য ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বহু মানুষ।

"কোনো সমাজে যদি বিপরীতকামী পুরুষেরা নিপীড়নের শিকার হওয়াটা অপরাধ হয় তাহলে সমকামী পুরুষেরদের নিপীড়নের মধ্যে ফেলাটাও অপরাধ"- চিঠির বিষয়গুলো এমনই ছিল।

এর কয়েক বছর পর সমকামী বিয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন "আমাদের সবার অধিকার আদায়ের লড়াই"।

সমাজে পরিবর্তন দরকার এমন প্রচারণাও শুরু করে ম্যাগাজিনটি। যেমন লিবারেল ড্রাগ ল এবং গর্ভপাতের অধিকার দেয়ার বিষয়িগুলোও প্লেবয় ম্যাগাজিনে গুরুত্ব পেতে থাকে।

এর পরের বিশ বছর মার্কেটে আধিপত্য বজায় রেখে চলেছে প্লেবয় ম্যাগাজিনটি। সত্তরের দশকের শুরুতে এটি ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে, সত্তর লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয় ওই সময়।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption জনসম্মুখে মি: হেফনারকে দেখা গেলেও তিনি সবসময় নারী পরিবেষ্টিতই থাকতেন।
ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ম্যাগাজিনটির সফলতার পর প্লেবয় ক্লাব গড়ে উঠে যেখানে খরগোশরূপী নারীদের দেখা যায়।

সম্পর্কিত বিষয়