ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মুহররমের চাঁদা দিয়ে হিন্দু রোগীর চিকিৎসা

ছবির কপিরাইট .
Image caption সমাজ সংঘ ক্লাবের সামনে তার সদস্যরা

ভারতে যখন একের এক ঘটনায় হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্বের কাহিনী উঠে আসছে, তার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলমান সম্প্রীতির এক দৃষ্টান্ত তৈরী করেছেন।

মুহররমের মিছিলের জন্য তোলা চাঁদা তাঁরা ব্যয় করছেন ক্যান্সার আক্রান্ত এক হিন্দুর চিকিৎসায়। আবার মসজিদের ইমামকে দিয়েও এলাকার মানুষের কাছে চিকিৎসার জন্য আরও বেশী চাঁদা জোগাড়ের ব্যবস্থা করেছেন তাঁরা।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, এটাই পশ্চিমবঙ্গের সত্যিকারের সম্প্রীতির ছবি যেটা কিছু রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে বদল করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অশান্তি বাঁধানোর চেষ্টা করছে।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বড় শহর খড়্গপুরের পুরাতন বাজার এলাকায় প্রতি বছরই বড় করে মুহররমের মিছিল বেরয়। এবছরও এলাকার সমাজ সংঘ ক্লাব মিছিলের প্রস্তুতি নিয়েছিল, চাঁদা তোলাও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যেই খবর পাওয়া যায় এলাকারই বছর পঁয়ত্রিশের যুবক আবীর ভুঁইয়া ক্যান্সারে আক্রান্ত - তার চিকিৎসা চলছে কলকাতায়।

একটি ছোট মোবাইল রিচার্জ করার দোকান চালান মি. ভুঁইয়া - দেখাশোনা করার মতোও কেউ নেই পরিবারে।

সেই খবর পেয়েই ক্লাব কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন এবছর না হয় মিছিল বন্ধই থাকল - আগে একজন মানুষকে বাঁচানোর তো চেষ্টা করা যাক।

সমাজ সংঘ ক্লাবের পরামর্শদাতা শেখ বিলাল বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমার একটা ভাই অসুস্থ হয়ে কাৎরাবে, আর তার বাড়ির সামনে দিয়ে আমরা মহরমের মিছিল নিয়ে যাব! ঠিক ওদের বাড়ির দরজা দিয়েই আমাদের মিছিলটা প্রতিবছর যায়। কিন্তু এবছর ওই খবরটা পেয়ে আমি ক্লাবের বাকি সকলের সঙ্গে কথা বলি। সবারই মত ছিল যে মুহররমের মিছিল তো পরের বছরও হবে, এবার একটা মানুষকে বাঁচাতে চেষ্টা করি আমরা।"

চাঁদা যেমন তোলা চলছিল, তেমনই চলেছে। আবার এলাকার ধনীদের কাছ থেকেও বড় অঙ্কের সাহায্য চাওয়া হচ্ছে আর মসজিদের ইমামকে দিয়েও ঘোষণা করানো হয়েছে যাতে সবাই মি. ভুঁইয়ার চিকিৎসার জন্য সাহায্য করেন।

ছবির কপিরাইট RIZWAN TABASSUM
Image caption মুহররমের তাজিয়া মিছিল

এই মুহররমের মিছিল করাকে কেন্দ্র করেই কিছুদিন আগে লড়াই হাইকোর্ট অবধি পৌঁছিয়েছিল। দুর্গাপুজোর বিসর্জন আর মহরম একই সময়ে পড়ে যাওয়ায় রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছিল মুহররমের মিছিলের জন্য একদিন পুজোর বিসর্জন বন্ধ থাকবে। কিন্তু কয়েকজন হিন্দু আদালতের কাছে গিয়ে আবেদন করেছিলেন যে এই সরকারী সিদ্ধান্তের কারণে তাদের ধর্মাচরণের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।

হিন্দুত্বাবাদী সংগঠনগুলোও প্রচার শুরু করেছিল যে রাজ্য সরকার মুসলমান তোষণের জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শেখ বিলাল অবশ্য বলছিলেন, "কেন এই হিন্দু মুসলমান বিভেদটা থাকবে? আমরা সবাই তো মানুষ! আজ ওর বিপদে আমি দাঁড়াব পাশে গিয়ে, কাল আমার কিছু হলে ওরা আসবে - এটাই তো হওয়া উচিত দেশে।"

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গেও সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি নষ্ট হয়েছে, অশান্তি, দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিত ভট্টাচার্য বলছিলেন সেটা কিছু রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে তৈরী করেছে, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে দুই ধর্মের সম্প্রীতির এই ছবিটাই স্বাভাবিক

"দেশভাগের আগে - পরে এই পশ্চিমবঙ্গ অনেক দাঙ্গা দেখেছে। কিন্তু এই রাজ্যের ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল সেসব দাঙ্গার স্মৃতি মুছে ফেলে দুই ধর্মের মানুষ একসঙ্গে জীবনযাপন করেন, পাশাপাশি বাস করেন এটাই ঘটনা। এটা আমরা তাই বলেই থাকি যে এই সম্প্রীতির বার্তাই কিন্তু দাঙ্গার ভয়াবহতার স্মৃতিকে কিছুটা মুছে দিয়েছে," বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।

তাঁর কথায়, "কিন্তু মুশকিল হল নানা রঙের কিছু রাজনৈতিক দল কখনও সখনও নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার কাজে লাগিয়েছে, সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়েছে, প্ররোচণা দিয়েছে। যদিও বড় মাত্রায় তারা সেই কাজে এখনও সফল হয় নি।"

ভারতেই গত বছর তিনেকে এমন অনেক ঘটনা হয়েছে, যেখানে শুধুমাত্র বাড়িতে গোমাংস রাখার সন্দেহবশে এক মুসলমান ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আরেক মুসলমান যুবক ব্যাগে করে গোমাংস নিয়ে যাচ্ছে - এই গুজব ছড়িয়ে ট্রেনের মধ্যে পিটিয়ে মারা হয়েছে। গোমাংস বহন করার সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে আরও বেশ কয়েকজনকে।

পশ্চিমবঙ্গের খড়্গপুরের এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ছবির পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ওইসব হিংসাত্মক ঘটনাগুলোও একই রকমের সত্যি।

সম্পর্কিত বিষয়