বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতি বিতর্কে নতুন মাত্রা

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ছবির কপিরাইট Focus Bangla
Image caption প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ জানতে পারার পর আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরা তাঁর সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন বলে দাবি করছে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট।

সরকারের সঙ্গে এক দীর্ঘ প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বের পর যেভাবে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে ছুটি নিয়ে গতকাল শুক্রবার দেশ ছাড়তে হয়, তা নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যেই আজ সুপ্রিম কোর্টের তরফে একথা জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ছাড়ার আগে বিচারপতি সিনহা গতকাল সাংবাদিকদের কাছে বিলি করা এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, যেভাবে প্রধানমন্ত্রী থেকে মন্ত্রীরা তার সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তিনি বিব্রত। তিনি একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও আশংকা প্রকাশ করেছিলেন।

দায়িত্বে থাকা কোন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই বিবৃতি দিয়ে এক গাদা অভিযোগের কথা প্রকাশ করছে, এটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলামের স্বাক্ষর করা এই বিবৃতি এখন রয়েছে সুপ্রিম কোর্টেরই ওয়েব সাইটে যেটি প্রকাশ করা হয়েছে আজই। এতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার গতকাল বিলি করা বিবৃতিতে বিভ্রান্তিমূলক বলে বর্ণনা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন:

প্রধান বিচারপতি বললেন, তিনি সুস্থ আছেন

প্রধান বিচারপতির ছুটি নিয়ে কেন এতো সন্দেহ-বিতর্ক?

'বিচারপতি সিনহা জানিয়েছেন তিনি ক্যান্সারের রোগী' - বিবিসিকে আইনমন্ত্রী

বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ১১ টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্বলিত কিছু তথ্য রয়েছে দেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের কাছে, যার দালিলিক তথ্যাদি তিনি হস্তান্তর করেছেন আপিল বিভাগের অন্য পাঁচজন বিচারপতির কাছে।

যে পাঁচজন বিচারপতির পক্ষে রেজিস্ট্রার জেনারেলের স্বাক্ষরে এই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে তাঁরা হলেন মো: ইমান আলী, মো: আবদুল ওয়াহাব মিঞা, সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং মির্জা হোসেইন হায়দার।

তবে এই বিচারপতিদের বক্তব্য তাদের কাছ থেকে আলাদা করে জানা যায় নি।

বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিবিসি বাংলাকে বলছেন তিনি বিবৃতিটি দেখেছেন। এই বিবৃতির বক্তব্যগুলো সম্পর্কে তিনি আগেও জানতেন, কিন্তু তিনি বলেন "বিচারবিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য আমরা আগে কিছু বলিনি।"

তথ্যগুলো এসেছে একদম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সরাসরি রাষ্ট্রপতির গোচরে এনেছেন। রাষ্ট্রপতিও অন্যান্য বিচারকদের গোচরে এনেছেন।"

এই বিবৃতি সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন "বিচারপতিরা যেহেতু আলাদা আলাদা করে কোন বক্তব্য দেন না, যেহেতু সেটার রেওয়াজ নেই বাংলাদেশে, সেহেতু রেজিস্ট্রার জেনারেলের স্বাক্ষরে এটা আজ প্রকাশ করা হয়েছে।"

বিবিসি এই বিবৃতিটির সত্যতা যাচাই করার জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে যোগাযোগ করেছিল। নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক তার দপ্তরের একজন কর্মকর্তা এমন একটি বিবৃতির কথা জানিয়েছেন। তবে যে পাঁচজন বিচারপতিদের নাম তাতে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশে ষোড়শ সংশোধনীকে ঘিরে সরকার ও প্রধান বিচারপতির একধরনের টানাপোড়েন চলছিল।

এর এক পর্যায়ে আইনমন্ত্রী বিবিসিকে জানান বিচারপতি সিনহা তাকে জানিয়েছেন যে তিনি ক্যান্সারের রোগী। এরপরই জানা যায় প্রধান বিচারপতি ছুটিতে যাচ্ছেন। সে নিয়ে চলমান বিতর্কের মাঝেই এস কে সিনহা গতরাতে দেশের বাইরে চলে যান।

কিন্তু যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের হাতে দিয়ে যান কিছু লিখিত বক্তব্য যা সরকারের দেয়া বক্তব্যের সাথে পুরোটাই অসঙ্গতিপূর্ণ। তিনি অসুস্থ নন বলে জানান।

সাংবাদিকদের দেওয়া লিখিত বিবৃতিতে ষোড়শ সংশোধনী রায়ের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধান বিচারপতি বলেন, "ইদানিং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও বিশেষভাবে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন, এতে আমি সত্যিই বিব্রত।"

সরকারের একটি মহল তাঁর রায়ের ভুল ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পরিবেশন করায় প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতি অভিমান করেছেন বলে মনে করেন মি: সিনহা।

এটি অচিরেই দূর হবে বলে মি: সিনহা বিশ্বাস করেন।

একই সাথে বিচার বিভাগে সম্ভাব্য সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এমনই প্রেক্ষাপটে এলো সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতির খবর। যেখানে প্রধান বিচারপতি মি: সিনহার দেওয়া বক্তব্যকে বিভ্রান্তিমূলকও বলা হয়েছে। মাহবুবে আলম বলছেন

"প্রধান বিচারপতি যাওয়ার আগে যে নাটক করে গেলেন দেশবাসীর জানা উচিত কি হয়েছিলো ব্যাপারটা।"

ওদিকে যাওয়ার আগে প্রধান বিচারপতি বলেছেন তাকে ভুল বোঝা হচ্ছে এবং বিচার বিভাগ যাতে কলুষিত না হয় সেজন্য তিনি সাময়িকভাবে দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একটি দেশের প্রধান বিচারপতি ও দেশটির সরকারের মধ্যে ঠিক কি হচ্ছে সেটি এখনও পরিস্কার নয়।

সম্পর্কিত বিষয়

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর