বাবা-মেয়ের সম্পর্কের মুখোশটাই কি বিকৃতির কারণ?

দেবশ্রুতি রায়চৌধুরী ছবির কপিরাইট দেবশ্রুতি রায়চৌধুরী

ঝুমি আমার ছোট বেলার বন্ধু পারমিতার মেয়ে। সেদিন আমি আর পারো কফি খেতে গিয়েছি, সঙ্গে ঝুমি। কলকাতার নামকরা কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়ুয়া এই মেয়ে আমার বড় আদরের। গত কয়েক বছরে পারমিতার সঙ্গে দেখা করার তাগিদের একটা বড় কারণ এই বড় বড় গভীর চোখের কিশোরীর প্রতি আমার বেড়ে চলা অপত্য স্নেহ।

তা সে দিন আড্ডা দিতে দিতে কথা প্রসঙ্গে আমরা চলে এলাম ভারতের কুখ্যাত ধর্ষক 'বাবা' রাম রহিম-এর প্রসঙ্গে।

লোকটা কতটা জঘন্য, বিকৃত, নৃশংস- ইত্যাদি বিশেষণ-সহ কথা বলছিলাম আমরা। আমি মাঝে মাঝে ঝুমির দিকে তাকিয়ে ওর প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছিলাম। এ রকম ঘটনা ওর বয়সী কিশোরীদের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে তার আন্দাজ করতে পারি বলেই।

ঝুমি চোখ নামিয়ে গ্রিন আপেল সোডার গ্লাস নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি বুঝতে পেরেই সম্ভবত চোখ তুলে তাকাল, সরাসরি আমার দিকে। "শ্রুতিমাসী, রাম রহিমের সঙ্গে ওর সো-কল্ড মেয়ের সম্পর্কটা তুমি কীভাবে দেখো?"

আমি থমকালাম। কন্যাসমার সটান প্রশ্নে। কফি তে চুমুক দিতে উত্তরটা ভেবে নিলাম। এ বিষয়ে আমাদের উত্তর ঝুমিদের মনে খানিকটা বা অনেকটা নাড়া দিতে পারে ধরে নিয়ে দায়িত্বশীল জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলাম, " এক কথায় বিকৃত, মানে..." ঝুমি আমায় থামিয়ে দিল, " বিকৃত তো বুঝলাম, তাই বলে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের অছিলায় এই ধরনের বিকৃত মানসিকতা? খুব অবাক হয়েছি।" থেমে থেমে শেষের বাক্যটা বলে আমাদের ঝুম।

" এ রকম ঘটনা বিরল হলেও ঘটে কিন্তু ঝুম সোনা, ঘটছেও।" ঝুমিকে বাস্তবের কঠিন মাটির কাছাকাছি আনার চেষ্টায় বলি আমি।

ঝুমি চুপ। পারো গম্ভীর। সোডার স্ট্র-টা দাঁতে কাটতে কাটতে ঝুমি নীরবতা ভাঙে, " আমি ইন্টারনেটে এই জাতীয় বিকৃতি নিয়ে পড়ছিলাম। এটা বিরল নয়, ঠিক। "

ঝুমি আবার থামে, "কাগজে তো নিয়মিত পড়ি, বাবা মেয়েকে ধর্ষণ করেছে, বাচ্চা মেয়েগুলোর অনেকে তো প্রেগন্যান্ট অবধি হয়ে পড়েছে..."।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption রাম রহিমের সম্পর্ক তরুণদের কী মেসেজ দেয়?

পারো গলা ঝাড়া দিয়ে ওঠে, "বার্গার খাবি না কি ঝুম?" মা-র অস্বস্তির জায়গাটা বুঝে হ্যাঁ বা না কোনো উত্তর না দিয়ে পারোর দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে মেয়েটা।

"শ্রতিমাসী, আমি যে ঘটনাগুলো পড়ছিলাম, মানে যে সম্পর্কগুলোয় দু' পক্ষেরই সায় ছিল, সেগুলোয় কিন্তু তথাকথিত বাবা-মেয়েরা কোনো রাখঢাক না করেই সেই সম্পর্কগুলোয় যৌনতাই যে মুখ্য তা স্বীকার করে নিয়েছে। এই হনিপ্রীত বা রামরহিমের মতো বাবা-মেয়ের সম্পর্কের বিজ্ঞাপন করে বেড়ায়নি। "

ঝুমির গলার স্বর ইষৎ চড়া এখন। পারমিতা অস্বস্তি ঢাকার চেষ্টায় মোবাইল নিয়ে খুটুর খাটুর করে চলেছে।

"তোর কি এই মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারটা বেশি খারাপ লেগেছে ওদের সম্পর্কর বিকৃতির থেকে?'' প্রশ্ন ছুড়ে দিই আমি।

এ এক নতুন ঝুমকে দেখছি আজ আমি। আমার কোলঘেঁষা ছোট্ট মেয়েটা কবে এত বড় হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। কেন যে পারিনি!

" হ্যাঁ তো। সম্পর্কটাকে আমরা বিকৃত বলছি এই মিথ্যা মোড়কটার জন্যেই। তুমি একটু ভেবে দেখো শ্রুতিমাসী। এরা দুজনে নিজেদের অপত্যস্নেহমিশ্রিত ভালবাসা আর শ্রদ্ধার লাগাতার বিজ্ঞাপন না করলে খারাপ লাগার প্রশ্ন উঠতে কি? দু'জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একে অপরের সম্মতিতে তো কোনো সম্পর্কে যেতেই পারে, তাই না?"

আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ি। পারমিতার মুখে রা নেই।

"আমার সব থেকে বেশি কী খারাপ লাগছে জানো?"

আমি ঝুমির উত্তরের অপেক্ষায়। আজ ও বলবে, আমরা শুনব।

" বাবা-মেয়ের সম্পর্কের মোড়কটাই কেন? বেশ তো গুরু-শিষ্যার ভেক ধরে চলছিল সব কিছু। সে ভাবেই তো চলতে পারত এই ব্যাপারটাও..." ঝুম থামে। ওর গলা এখন খাদে হলেও তাতে শ্লেষ স্পষ্ট।

আমি ওকে ব্যাখ্যা করে বোঝাতেই পারতাম হনিপ্রীতকে মেয়ে হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পেছনের পুরুষতন্ত্রী ছক আর যৌন লালসার দাপাদাপির কথা, বলতে পারতাম হানিপ্রীতের তাতে সায় দেওয়ার পেছনের ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতার চিরকালীন লড়াইয়ের গল্প। কিন্তু ইচ্ছে করল না। আজ ঝুমির কথা শোনার দিন। ওর অনুভূতি গুলো ছোঁওয়ার চেষ্টা আজ।

শুনতে পেলাম জোরে শ্বাস নিয়ে আপেল সোডার খালি গ্লাস মা-র দিকে ঠেলে দিতে দিতে স্বগতোক্তির মতো ঝুম বলছে, "এদের মতো কিছু মানুষের জন্যেই সব সম্পর্ক থেকে আমাদের বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।"

বিকেল ফুরিয়ে ঠাণ্ডা কফি পার্লারের কাচ বেয়ে তখন অন্ধকার নামছে। আমার খুব ইচ্ছা করল চেয়ার ছেড়ে উঠে ঝুমির মাথায় একটু হাত রাখি।

সম্পর্কিত বিষয়