রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুই মাস: কীভাবে বাংলাদেশ জড়ালো এই সংকটে

ছবির কপিরাইট GETTY/DAN KITWOOD
Image caption রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল অব্যাহত আছে বাংলাদেশে

গত ২৫শে অগাস্টের পর মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর চরম নির্যাতনের মুখে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এরই মধ্যে ৬ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে।

জাতিসংঘেরই হিসেবে পুরনো ও নতুন মিলিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন দশ লাখ ছাড়িয়েছে।

মূলত গত বছরের অক্টোবরে রাখাইনে পুলিশ চেক পোস্টে হামলার ঘটনার পরেই সেখানে সেনা অভিযান শুরু হয় এবং ঐ দফাতেই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

পরে চলতি বছরের অগাস্টের শুরু থেকে সেনাবাহিনী ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করলে আবারো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালাতে শুরু করে। কিন্তু সীমান্তে নানা স্থানে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীরা। যদিও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে মূলত ২৫শে অগাস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা চেকপোস্টে হামলার পর। এরপর হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বাধাহীনভাবে প্রবেশের সুযোগ পায়।

বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা ঢুকে পড়ার পর বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ডিজিটাল নিবন্ধনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরিস্থিতির বিবেচনায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করে সরকার। ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণ সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় জেলা প্রশাসনকে।

জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরে পাঁচ দফা প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিরাপত্তা পরিষদ তিন দফায় আলোচনা করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে, যদিও কার্যকর কোন ব্যবস্থা তারা নিতে পারেনি চীন ও রাশিয়ার অবস্থানের কারণে ।

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবার শরণার্থীদের পরিদর্শন করে এসেছেন। এছাড়া তুরস্কের ফার্স্ট লেডি,মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ও জর্ডানের রানী কক্সবাজারে এসেছেন শরণার্থী পরিস্থিতি দেখতে।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption রাখাইনে পোড়া ভিটার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন দুজন রোহিঙ্গা।

নতুন করে রোহিঙ্গাদের আসার চেষ্টা ও পুশব্যাক

গত বছর অক্টোবর থেকেই সেনাবাহিনী রাখাইনে নির্যাতন শুরু করলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা শুরু হয়। কিন্তু বিজিবি তাদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দিতে চেষ্টা করে। ১৯শে নভেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফ সংলগ্ন নাফ নদীতে ১২৫ জনের মত রোহিঙ্গা মুসলমান মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের মংডু থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় কোস্ট গার্ডের টহলের মুখে পড়ে। কোস্ট গার্ড তাদের পুশব্যাক করে অর্থাৎ মিয়ানমারের দিকে ঠেলে দেয়।

এরপর মাঝে মধ্যেই কমবেশি রোহিঙ্গারা আসতে চেষ্টা করে। অনেককেই পুশব্যাক করে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত বছরের ২৪শে নভেম্বর অভিযোগ করেন যে মিয়ানমারের সরকার সে দেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালাচ্ছে। বিবিসি বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআর অফিসের প্রধান কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুঠতরাজ চালাচ্ছে।

বছরের শুরুতে ৯ই জানুয়ারি জাতিসংঘ জানায় সে সময় এক সপ্তাহেই বাংলাদেশে আসে ২২,০০০ রোহিঙ্গা।

ছবির কপিরাইট EPA
Image caption মিয়ানমারের ডি ফেক্টো নেত্রী অং সান সু চি

কোফি আনান কমিশনের রিপোর্ট ও সেনা ঘাঁটিতে হামলা

চলতি বছরের ২৫শে অগাস্ট মিয়ানমার সরকার দাবি করে রাখাইন রাজ্যে দেড়শো'র মতো মুসলিম জঙ্গি একযোগে বিভিন্ন পুলিশ স্টেশন, সীমান্ত ফাঁড়ি এবং সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছে। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি'র অফিস থেকে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ জন সদস্য রয়েছে।

মাত্র আগের দিনই সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কোফি আনানের নেতৃত্বাধীন একটি কমিশন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব দেয়ার পথ খুলে দেয়ার আহবান জানিয়েছিলো। কমিশন তাদের রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেয়ারও আহ্বান জানিয়েছিল। তবে এর আগে থেকেই সেখানে ব্যাপক সেনা অভিযান চলছিলো।

Image caption রাখাইনে আগুনে পুড়ছে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর

২৫শে অগাস্ট থেকেই ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করে

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সর্বশেষ সহিংসতার পর বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পালিয়ে আবারও বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছে বলে খবর আসতে থাকে। ২৪শে অগাস্ট রাতে থেকে কয়েকশো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করলে তাদের আবার ঠেলে ফেরত পাঠানো হয়।

রোহিঙ্গারা প্রথমে টেকনাফের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করে। তবে টেকনাফে এবং উখিয়ায় নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমার সীমান্তে শত শত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে দেখা যায়।

তবে শেষ পর্যন্ত আর তাদের বাধা দিয়ে রাখা যায়নি। রোহিঙ্গা মুসলমানদের যারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে, তাদের প্রাথমিক আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ জানায় শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর । মানবিক কারণে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে শিথিলতার নীতি নেয় বাংলাদেশও। এরপরেই শুরু হয় হাজার হাজার রোহিঙ্গার ঢল, যা এখনো চলছে।

পরে ২৮শে অগাস্ট বিরোধী দল বিএনপিও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসতে দেয়ার দাবি জানায়। ২রা সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ জানায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ৬০,০০০ ছাড়িয়ে যায়।

ছবির কপিরাইট DAN KITWOOD
Image caption রাখাইনে স্বামী-স্বজন হারিয়ে অনেক নারী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন।

নাফ নদীতে রোহিঙ্গার লাশ

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বহনকারী কয়েকটি নৌকা ডুবে যায় নাফ নদীতে ৩০শে অগাস্ট। সেই ঘটনায় ১৯জন রোহিঙ্গার মৃতদেহ উদ্ধারের একদিন পরেই ১লা সেপ্টেম্বর উদ্ধার করা হয় আরও ২৬জনের মৃতদেহ। শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় বঙ্গোপসাগরের কাছে নাফ নদীতে বিভিন্ন পয়েন্ট মানুষের মৃতদেহ ভেসে ওঠে। ১৬ই অক্টোবর আরেকটি নৌকাডুবিতেও বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে এ দফায় নৌকা ডুবিতে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ১৮০ জন রোহিঙ্গা।

শরণার্থী ক্যাম্প ও জাতিসংঘে শেখ হাসিনা

মিয়ানমারে 'জাতিগত নিধন' নি:শর্তে বন্ধের আহ্বান জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সাথে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণে তিনি এই মানবিক সংকট নিরসনের জন্য পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।

প্রথমত, তিনি অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও 'জাতিগত নিধন' নিঃশর্তে বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে মিয়ানমারের ভিতরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সেফ জোন বা নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন এবং জাতিসংঘের মহাসচিবকে অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে একটি অনুসন্ধানী দল পাঠাতে বলেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কোফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো নিঃশর্তভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ব্যাপারে পুরো বিশ্বের সহযোগিতা কামনা করেন। রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানের প্রস্তাবের পাশাপাশি সন্ত্রাস এবং জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থানের কথাও জাতিসংঘে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এর আগে ১২ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রধান হিসেবে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিদর্শন করেন।

ছবির কপিরাইট K.M. ASAD
Image caption দুই দেশের সীমান্তবর্তী নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা। ৪ঠা সেপ্টেম্বর, উখিয়া এলাকার ছবি।

মিথ্যা প্রচারণার দাবি সু চি'র

মিয়ানমারের নেত্রী আং সান সু চি ৬ই সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকটকে পুরোপুরি ভুয়া খবর এবং মিথ্যে প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, মিথ্যে প্রচারণা চালিয়ে রাখাইনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টিতে উ‌স্কানি দেওয়া হচ্ছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যেভাবে নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে এবং তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, তা নিয়ে তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার পর তার দফতর থেকে এই বিবৃতি দেয়া হয়।

পরে ১৯শে সেপ্টেম্বর তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, চার লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমান কেন বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে, সে সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। তাঁর দাবি ছিলো যে অধিকাংশ মুসলিম পালিয়ে যায়নি এবং সহিংসতা বন্ধ হয়ে গেছে।

সু চি বলেন, অধিকাংশ মুসলিম রাখাইন অঞ্চলে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এতে বোঝা যায় যে সেখানে পরিস্থিতি খুব মারাত্মক নয়।

রাখাইনে নির্যাতন চলছেই: অ্যামনেস্টি

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ১৫ই সেপ্টেম্বর জানায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যে পরিকল্পিতভাবেই রোহিঙ্গা মুসলিমদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে তার অনেক প্রমাণ তাদের কাছে আছে।

স্যাটেলাইট থেকে তোলা রাখাইন রাজ্যের অনেক ছবি বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি বলে যে সেখানে তিন সপ্তাহে আশিটিরও বেশি স্থানে বিশাল এলাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো এই কাজ করছে বলে অ্যামনেস্টি তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করে।

ছবির কপিরাইট DAN KITWOOD
Image caption রাতের অন্ধকারে ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা

নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু

মূলত কোফি আনান কমিশনের রিপোর্ট পাওয়ার পরেই কিছুটা সোচ্চার হয়ে উঠেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এর ধারাবাহিকতায় ১৩ই সেপ্টেম্বর বৈঠকে বসে নিরাপত্তা পরিষদ। ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে আলোচনা উঠেছিল - তখন অবশ্য চীন ও রাশিয়া ভেটো প্রয়োগ করেছিল।

রাখাইনে চলমান সহিংসতার ঘটনা নিয়ে ১৪ই সেপ্টেম্বর বৈঠকে বসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ।বৈঠকে নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সেখানে সেনা অভিযান বন্ধে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বানও জানানো হয়। যদিও মার্চ মাসেই জাতিসংঘ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের হত্যা এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঘটনাগুলো একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার ডাক দিয়েছিলো।

এরপর ২৮শে সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের আরেকটি বৈঠকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস বলেন, মিয়ানমারে সহিংসতা বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি করেছে, যা কিনা মানবাধিকার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নিয়ে গিয়েছে।

ওদিকে এর আগে ২৬শে সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী সেদেশের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে 'মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ' চালাচ্ছে জানিয়ে বিবৃতি দেয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

Image caption স্বামীর কাঁধে ভর দিয়ে তারপরও এগিয়ে যাবার চেষ্টা। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য খোঁজ করছেন তাঁর স্বামী

জাতিসংঘের আশঙ্কা ও দাবি

গত ২০শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান জেইদ রাদ আল-হুসেইন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে দেশটির ওপর জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন।

১৪ই সেপ্টেম্বর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানায়, রাখাইনে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশে শরণার্থীর সংখ্যা এক মিলিয়ন বা ১০ লক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বর্মী সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণের স্থগিত করলো ব্রিটেন

ব্রিটিশ সরকার ১৯শে সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সাথে তাদের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি স্থগিত করে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্মী সেনাবাহিনীর অব্যাহত সহিংসতার মধ্যে ব্রিটেনের কাছ থেকে এই ঘোষণা আসে। বর্মী সামরিক বাহিনীর সাথে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রতি বছরই হয়ে আসছিল। এজন্যে ব্রিটেনের খরচ হয় বছরে তিন লক্ষ পাউন্ড। এই কর্মসূচির আওতায় ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বর্মী সৈন্যদের প্রশিক্ষণের জন্যে অর্থ সাহায্য দিয়ে আসছে।

রোহিঙ্গাদের ২১৪টি গ্রাম ধ্বংস: এইচআরডব্লিউ

নিউইয়র্ক-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১৯শে সেপ্টেম্বর জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে ২১৪টি গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। স্যাটেলাইটের ছবি পর্যালোচনা করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। সংস্থাটি বলে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করছে এবং সেজন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এর নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করা দরকার। একই সাথে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর উপর কিছু বিষয়ে অবরোধ আরোপের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রতিও আহবান জানায় সংস্থাটি।

Image caption মিয়ানমারে সেনাদের নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশমুখী হয়েছেন এ বৃদ্ধ ও তাঁর নাতনীরা।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা বাড়ছেই

৬ই সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ ধারণা দেয় যে তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে পারে। পরে ১৫ই সেপ্টেম্বর শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানায় বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা দশ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

৬ই অক্টোবর জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিলো ৫ লাখ ১৫ হাজার। তবে ২২শে অক্টোবর অর্থাৎ গত রোববারে এ সংখ্যা পৌঁছে ৬ লাখ তিন হাজারে। এর মধ্যে কুতুপালংয়ে ৩ লাখ ২৪ হাজার, অন্য ক্যাম্পগুলোতে বা বিচ্ছিন্নভাবে ২ লাখ ৩৩ হাজার এবং আগে থেকে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের কাছেই আশ্রয় নেয় আরও ৪৬,০০০-এর মতো।

বাংলাদেশে এখনো আসা অব্যাহত রয়েছে রোহিঙ্গাদের।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়া-ভারত

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতায় জড়িত সেনা ইউনিট ও কর্মকর্তাদের সামরিক সহায়তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপসহ আরও কিছু ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "কোন নিপীড়ন হলে তার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ"।

এর আগে বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বই রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়নের জন্য দায়ী। তিনি মিয়ানমারকে সতর্ক করে বলেছিলেন বিশ্ব কোন নিষ্ঠুরতার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে বসে থাকবে না।

তবে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান এখনো মিয়ানমারের পক্ষেই। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসে রোহিঙ্গা শব্দ উল্লেখ না করেই বলে গেছেন রাখাইন সংকটের সমাধান আছে বাস্তুহারাদের সেখানে ফেরত যাওয়ার মধ্যেই।

মিয়ানমার, রোহিঙ্গা, বাংলাদেশ
Image caption বাংলাদেশ অভিমূখে রোহিঙ্গাদের ঢল

দু মাসের রোহিঙ্গার সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে ইউনিসেফ

মিয়ানমার থেকে আসা মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন প্রায় ১২ লাখ বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৭ লাখ ২০ হাজারই শিশু। শিশুদের মধ্যে ৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী আছে সাড়ে চার লাখ এবং এর মধ্যে ২ লাখ ৭০ হাজার ২৫শে অগাস্টের পর এসেছে। অন্যদিকে গর্ভবতী নারী রয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার।

কলেরা টিকা দেয়া হয়েছে দু'লাখের মতো শিশুসহ প্রায় সাত লাখ মানুষকে। ৪ লাখ ৫৩ হাজার শিশুর জন্য শিক্ষা সুবিধার প্রয়োজন বলে মনে করছে ইউনিসেফ।

২৫শে অগাস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৬৬ হাজার ব্যক্তিকে খাদ্য সহায়তা দিতে পেরেছে জাতিসংঘ। শরণার্থী ও তাদের ঘিরে থাকা স্থানীয় মিলিয়ে ১২ লাখেরও বেশি মানুষে স্বাস্থ্য সহায়তা প্রয়োজন।

সম্পর্কিত বিষয়