ভারতের দিল্লিতে মারাত্মক ধোঁয়াশা: জনস্বাস্থ্যের জন্য 'ইমার্জেন্সি'

  • শুভজ্যোতি ঘোষ
  • বিবিসি বাংলা, দিল্লি
দিল্লিতে দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার ৩০গুণ বেশি

ছবির উৎস, PRAKASH SINGH/Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

দিল্লিতে দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার ৩০গুণ বেশি

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত রাজধানী শহর বলে পরিচিত দিল্লিতে বায়ু দূষণের মাত্রা আজ মঙ্গলবার এই মৌশুমে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

পুরো শহর সকাল থেকে ঘন ধোঁয়াশার চাদরে ছেয়ে যাওয়ার পর ভারতের মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন পরিস্থিতিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য 'ইমার্জেন্সি' বলে ঘোষণা করেছে।

দিল্লি সরকারও জানিয়েছে তারা স্কুল-কলেজ সব আপাতত বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছে। আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে শহরে গাড়ির পার্কিং ফি চারগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ সংস্থাগুলো ও দিল্লির বাসিন্দারা সবাই প্রায় একবাক্যে বলছেন, শহরের বাতাস আর মোটেই স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপযুক্ত নেই।

শীতের গোড়ার দিকে দিল্লিতে কুয়াশায় মোড়া সকাল যদিও কোনও বিরল দৃশ্য নয় - কিন্তু এদিন ৭ নভেম্বরের সকালে পুরো শহর যেভাবে ঘন ধোঁয়াশায় ছেয়ে গিয়েছিল, দিল্লির বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন এ জিনিস তারা বহু দিন দেখেনি।

কালো ধোঁয়াশা বা স্মগে দেখা যাচ্ছিল না দুশো ফিট দূরের গাড়িও, ফলে লম্বা যানজট ছড়িয়ে পড়েছিল শহরের নানা প্রান্তে। পথচারীরা প্রায় সবাই বেরিয়েছিলেন নাক-মুখঢাকা মুখোশ পরে।

শহরের প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেসের কাছে অ্যাজমার রোগীরা বলছিলেন, ওষুধ না-নিয়ে আর মাস্ক না-পরে তাদের এখন বেরোনোর কোনও জো নেই। কেউ আবার বলছিলেন, এবার অবস্থা গত বছরের চেয়েও আরও খারাপ।

ইন্ডিয়া গেটের কাছে স্কুটারের আরোহীরা আবার বলছিলেন, রাস্তায় বেরোনোর পর তাদের ঘন ঘন কাশি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে, গলায় জ্বালা জ্বালা করছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে অত্যন্ত মারাত্মক, সরকারকে চিঠি লিখে এদিন সকালেই সে ব্যাপারে সতর্ক করে দেয় ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন।

সংস্থার সভাপতি ড: কে কে আগরওয়াল বলেন, "জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতে দিল্লিতে এখন আপদকালীন অবস্থা চলছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ করা দরকার, খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না-বেরোনোই উচিত - বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক, গর্ভবতী মহিলা বা হৃদরোগীদের।"

"পিএম-টেনের মাত্রা শহরে হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে, এটা যতক্ষণ না দুশোর নিচে নামছে ততক্ষণ পার্কে গিয়ে জগিং তো দূরস্থান, হাঁটাহাঁটি করাও অত্যন্ত বিপজ্জনক", বলেন ড: আগরওয়াল।

বস্তুত দিল্লির পাঞ্জাবিবাগে এদিন পিএম-টেন বা দশ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট পার্টিকুলেট ম্যাটারের মাত্রা ছিল ৯৯৯ - নিরাপদ মাত্রার চেয়ে দশগুণ বেশি।

ছবির উৎস, Twitter

ছবির ক্যাপশান,

টুইটারে দিল্লির বাসিন্দা অনন্ত্ প্রভু এই ছবি পোস্ট করে লিখেছেন উঁচু ভবনগুলো দেখাই যাচ্ছে না।

কেন হঠাৎ করে দিল্লির পরিস্থিতি এতটা খারাপ হল?

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের গবেষক পলাশ মুখার্জি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আসলে গত বছরও ঠিক একই জিনিস হয়েছিল। বাতাসে যে পলিউট্যান্টগুলো আছে সেগুলো বেরোনোর কোনও পথ পাচ্ছে না আবহাওয়ার কন্ডিশন যেরকম, সে কারণে। বাতাসের গতিবেগ ভীষণ কমে গেছে বলে দূষণ বেরোতে পারছে না।"

"আসলে এখানে বাতাস কোন দিকে বইছে সেটা যেমন দেখা দরকার, বাতাসের গতিবেগটাও দেখা দরকার। 'মিক্সিং লেয়ার' যেটাকে বলে সেটার উচ্চতা অনেক কমে যাওয়ায় বায়ুমন্ডলের নিচের দিকে পলিউট্যান্টের ঘনত্ব অনেক বেড়ে গেছে, সেটাই সমস্যার প্রধান কারণ," জানাচ্ছেন মি মুখার্জি।

এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (একিউআই) মাপকাঠিতে দিল্লির পরিমাপ এখন ৪৫০ থেকে ৪৬০র মতো, যেটাকে বিশেষজ্ঞরা বলেন সিভিয়ার বা গুরুতর।

আর এই সূচক পাঁচশো ছাড়িয়ে গেলে সেটাকেই বলা হয় চরম ইমার্জেন্সি।

আবহবিদরাও জানিয়েছেন, আগামী আট-দিনে দিল্লিতে কোনও পশ্চিমী ঝঞ্ঝার ঝোড়ো বাতাস আসার সম্ভাবনা নেই - ফলে অবস্থার কোনও দ্রুত উন্নতিও হবে না।

কিন্তু সপ্তাহ তিনেক আগে দিওয়ালির সময় এবার দিল্লিতে বাজি ফাটানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তাতেও কি কোনও সুরাহা হল না?

জবাবে পলাশ মুখার্জি বলছিলেন, "আদালত নির্দেশ দিলেও বাজি বিক্রি কি পুরোপুরি বন্ধ করা গেছে? লুকিয়েচুরিয়ে বেআইনি বিক্রিবাটা তো হয়েইছে। পাশাপাশি এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে দিল্লির আশেপাশের রাজ্য, যেমন পাঞ্জাব বা হরিয়ানায় চাষের ক্ষেতে ফসলের গোড়াটা পুড়িয়ে দেওয়ার ধূম!"

তিনি আরও জানাচ্ছেন, দিল্লিতে দূষণের মাত্রা যেহেতু এখন 'সিভিয়ার প্লাস' ক্যাটেগরিতে ঢুকে পড়েছে তাই কেন্দ্রীয় সরকারের 'গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান' অনুসারে কিছু কিছু পদক্ষেপ বাধ্যতামূলকভাবে নিতে হবে।

ছবির উৎস, MAANVINARCISA

ছবির ক্যাপশান,

শহরতলী নয়ডার চিত্র

যেমন, গাড়িঘোড়া চলাচলে পালা করে জোড়-বিজোড়ের ফর্মুলা বা অনুরূপ কোনও ব্যবস্থা নিতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বহনকারী গাড়ি ছাড়া অন্য কোনও ট্রাক-টেম্পো বা বাণিজ্যিক যানও দিল্লিতে ঢুকতে পারবে না।

সোজা কথায়, দূষণের ধাক্কা সামলাতে দিল্লি এখন ঢুকে পড়েছে একটা ইমার্জেন্সি মোডে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সেই সঙ্গেই বলছেন এগুলো সবই হল রিঅ্যাকট্ভি পদক্ষেপ - দীর্ঘমেয়াদী সমাধান একমাত্র সম্ভব প্রোঅ্যাকট্ভি পদক্ষেপ নিলেই।

স্কুল বা অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সেই সঙ্গে বন্ধ রাখতে হবে। সরকারও এই নির্দেশিকা জারি করবে যে একান্ত জরুরি না-হলে বাইরে খোলা আকাশের নিচে কোনও কর্মকান্ড করা যাবে না।

অন্যথায় প্রতি শীতে দিল্লির ছবি রয়ে যাবে যে-কে-সেই, যাকে আজ মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল নিজেই বর্ণনা করেছেন একটি 'গ্যাস চেম্বার' হিসেবে।