বাংলাদেশে নোয়াখালীর যে ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের নেয়া হবে সেখানকার অবস্থা এখন কেমন?

ঠেঙ্গারচর এখনও জনবসতিহীন একটি চর
Image caption ঠেঙ্গারচর এখনও জনবসতিহীন একটি চর

রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ভাসান চরে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প আজ মঙ্গলবার অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সরকার।

কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমার থেকে যারা আগে এসেছেন তাদের মধ্যে থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে প্রথমে সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে।

চরটি বসবাসের জন্যে উপযুক্ত কীনা এই প্রশ্নে রোহিঙ্গাদেরকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বেশ সমালোচনা রয়েছে। তবে এখন এটা স্পষ্ট যে সরকার তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বদ্ধ পরিকর।

ওই চরে নিয়মিত কাজ করতে যান একজন শ্রমিক মোহাম্মদ অলিউদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন চরটা খুবই বড়, যেখানে বেশ কিছু গাছপালা আছে ।

"বিশাল এই চরের ১২০০ একর এলাকা জুড়ে এখন কাজ চলছে সেটাকে বসবাসের উপযোগী করার জন্য। এর বাইরে বাকি এলাকাগুলো এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে।"

নৌবাহিনী ও উপকূলরক্ষীরা সেখানে কাজ করছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন চরে এখন কোন বাড়িঘর নেই। সেখানে আপাতত একটা রেস্ট হাউস আছে। এছাড়া নৌবাহিনীর কাজের জন্য অস্থায়ী কিছু ঘর তৈরি করা হচ্ছে।

"সেখানে স্থানীয়ভাবে এখন কোন মানুষ থাকে না, সেখানে আছে শুধু মহিষা-বাথান, মোষের থাকার জায়গা। সেখানে বারো থেকে চোদ্দ হাজার মহিষ রয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মোহাম্মদ অলিউদ্দিন।

মি: অলিউদ্দিন বলেন চরের মাটি শক্ত এবং সেখানে জোয়ার ভাঁটার সময় খুব একটা পানি ওঠে না।

তবে তিনি বলেন নদী এই সময় শান্ত থাকলেও বর্ষায় তা কিছুটা প্রমত্তা হয়ে ওঠে।

"ঝড়ের সময় আমি বহুবার চরে গেছি। ঝড় এলে নৌকা চরের লগে বাঁধাইয়া আমরা উপরে উঠিয়া গেছি, উঁচা জায়গায় গাছের লগে গাছ ধরিয়া আছিলাম।"

তবে মূল ভূখণ্ড থেকে চরটি অনেক দূরের পথ।

Image caption অগাস্ট মাস থেকে মিয়ানমার থেকে প্রায় ছয় লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

"হাতিয়া উপজেলা থেকে নদীর কূলে যাইতে ১০কিলোর মত পথ আছে। ওইখান থেকে ট্রলারে করে চরে যাইতে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা লাগে।"

তিনি বলেন আগে চরটার নাম ঠেঙ্গার চর থাকলেও এখন সরকার এই চরের নাম দিয়েছে ভাসান-চর। দক্ষিণ দিকে আরেকটা চর আছে যাকে গাঙ্গুরিয়া চর বলে। উত্তর দিকেও জাহাজিয়ার চর নামে একটি চর আছে, যেটাকে স্বর্ণদ্বীপও বলে বলে মি: অলিউদ্দিন জানান।

নোয়াখালীর এই আবাসন তৈরির পরিকল্পনার নাম দেয়া হয়েছে আশ্রয়ণ ৩। এই প্রকল্পটি পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন হবে। আর বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেবে। ২০১৯ সালের শেষের দিকে প্রকল্পটি শেষ করার চিন্তা করছে সরকার। সেনিয়ে সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তাফা কামাল জানিয়েছেন অতি দ্রুত সে জায়গায় তাদের বসবাস করার মত পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টির কাজটি করা হবে।

"কিন্তু তারা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকবে না। তাদের সেখানে সাময়িক আবাসস্থল তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে । তবে সেখানে সাইক্লোন শেল্টার এবং বেড়ি বাঁধ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।"

২০১৫ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের এই চরটিতে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে আলাপ আলোচনা শুরু হলেও সেটি জোরালো-ভাবে উঠেছে এ বছরই।

রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করা ও তাদের একটি তালিকা তৈরির জন্য একটি শুমারিও হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা নিজেরা এমন একটি চরে যেতে চান কিনা সেনিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

২০০৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসেন মোহাম্মদ নুর। তিনি বলছেন স্থায়ীভাবে থাকার জন্য তারা বাংলাদেশে আসেন নি। তিনি নিজের দেশেই ফিরে যেতে চান।

মোহাম্মদ নুর প্রশ্ন তুলছেন চরে তাদের জন্য আবাসন প্রকল্প বানিয়ে সেখানে তাদের স্থানান্তর করার মাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুর দীর্ঘস্থায়ী ও সত্যিকার সমাধান হবে কিনা।

মিয়ানমারে সহিংসতা ও নির্যাতনের মুখে ৭০ দশকের শেষের দিকে প্রথম বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শুরু করেন রোহিঙ্গারা। গত প্রায় ৪ দশকে ৪ লাখের মতো রোহিঙ্গা আগেই থেকেই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে নতুন করে আরও রোহিঙ্গা আসতে শুরু করে আগস্টের শেষের দিক থেকে। সেই সময় থেকে নতুন করে আরো অগাস্ট মাস থেকে মিয়ানমার থেকে প্রায় ছয় লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

দু মাসের মধ্যে মিয়ানমারে তাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা নিয়ে দু দেশের সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা দলিলও সাক্ষর হয়েছে।

তবে নানা সমালোচনা ও বিরোধিতার মধ্যেই মূল ভূমি থেকে যেতে দু তিন ঘণ্টা সময় লাগে এমন একটি জন মানবহীন চরেই এক লাখ রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সম্পর্কিত বিষয়