জেরুজালেমকে ইসরায়েলি রাজধানীর স্বীকৃতি দিচ্ছে আমেরিকা, কিন্তু বিপদ কোথায়?

জেরুজালেম ছবির কপিরাইট AHMAD GHARABLI
Image caption জেরুজালেম, ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সঙ্কটের কেন্দ্রে যে শহর

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এখন নিশ্চিত করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আজই (বুধবার) জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিতে চলেছেন।

তা দিলে, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্র হবে প্রথম রাষ্ট্র যারা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।

স্বভাবতই ইসরায়েল সন্তুষ্ট, কিন্তু ফিলিস্তিনিরা ছাড়াও পুরো আরব বিশ্বের নেতারা সাবধান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকেই নস্যাৎ করবে।

এমনকী আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত "পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য চরম এক উস্কানি।"

কিন্তু কেন জেরুজালেম মধ্যপ্রাচ্যে এত স্পর্শকাতর একটি ইস্যু?

প্রাচীন এই শহরটি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি বিরোধের একদম কেন্দ্রে।

শুধু এই শহরটি নিয়ে দশকের পর দশক ধরে থেকে থেকেই সহিংসতা হয়েছে, প্রচুর রক্তপাত হয়েছে।

বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা ইয়োল্যান্ডে নিল বলছেন, জেরুজালেমের অবস্থার যে কোনো পরিবর্তনের প্রভাব নানাবিধ এবং তা যে কোনো সময় আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে।

প্রথম কথা, ধর্মীয় দিক থেকে জেরুজালেম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর একটি শহর।

ইসলাম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনার অনেকগুলোই এই শহরে।

এছাড়া, এর রাজনৈতিক গুরুত্ব হয়তো এখন ধর্মীয় গুরুত্বকেও ছাপিয়ে গেছে।

ইসরায়েল বলে "অভিন্ন জেরুজালেম তাদের চিরদিনের রাজধানী।" আসলে ১৮৪৮ সালে ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই ইসরায়েল জেরুজালেমের পশ্চিমাংশে দেশের সংসদ ভবন স্থাপন করে।

১৯৬৭ সালে আরবদের সাথে যুদ্ধে জিতে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমও দখল করে নেয় এবং পুরো জেরুজালেম শহরটিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে ঘোষণা করে।

ছবির কপিরাইট THOMAS COEX
Image caption ইসলাম, খ্রিস্টান এবং ইহুদিদের পবিত্রতম স্থাপনার অনেকগুলোই এই শহরে

ফিলিস্তিনিরা কি বলে?

ফিলিস্তিনিরা কোনোদিনই পূর্ব জেরুজালেমের দখল মেনে নেয়নি। তারা সবসময় বলে আসছে পূর্ব জেরুজালেম হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী।

ফিলিস্তিনি নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দিয়ে দেওয়া। তাদের কথা, জেরুজালেম তাদের না থাকলে, কোনো টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কখনই সম্ভব হবেনা।

যদিও গত দশকগুলোতে পূর্ব জেরুজালেমের বহু জায়গায় ইহুদি বসতি বানিয়েছে, কিন্তু তারপরও এখানকার সিংহভাগ বাসিন্দা ফিলিস্তিনি যারা শত শত বছর ধরেই এই শহরে বসবাস করছেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও মেনে নিয়েছে, জেরুজালেম শহরের মর্যাদা, মালিকানা নির্ধারিত হবে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তি রফার অংশ হিসাবে। জাতিসংঘের প্রস্তাবে তা লিখিত আকারে রয়েছে।

ফলে এখন পর্যন্ত কোনো দেশই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি।

সমস্ত বিদেশি দূতাবাস তেল আবিবে, যদিও জেরুজালেমে অনেকে দেশের কনস্যুলেট রয়েছে।

এতদিনের সেই নীতি এখন ভাঙছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছবিতে আগুন দিচ্ছে ফিলিস্তিনিরা

ট্রাপ কেন এই ঝুঁকি তিনি নিচ্ছেন?

হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বলছেন, "প্রেসিডেন্ট নেহাতই একটি বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন"। তাদের কথা, ইসরায়েলকে বাড়তি সুবিধা দেওয় তার উদ্দেশ্য নয়।

তারা বলার চেষ্টা করছেন - জেরুজালেমের সীমানা নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান এখনও আমেরিকা মেনে নিচ্ছেনা, সেটা ঠিক হবে চূড়ান্ত শান্তি মীমাংসায়।

ফিলিস্তিনিরা কোনোভাবেই তাতে ভরসা পাচ্ছেনা। তাদের কথা, মি ট্রাম্প জেরুজালেমে ইসরায়েলের তৈরি ডজন ডজন অবৈধ ইহুদি বসতিগুলোতে স্বীকৃতি দিয়ে দিচ্ছেন।

ওয়াশিংটনে বিবিসির সংবাদদাতা বারবারা প্লেট-উশেরও বলছেন, নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইহুদিদের সমর্থন পেতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন - জিতলে তিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেবেন এবং মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করবেন। তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রাখছেন।

সংবাদদাতা বলছেন, এই স্বীকৃতি দিয়ে মি ট্রাম্প যে পরে প্রতিদান হিসাবে শান্তি চুক্তি ত্বরান্বিত করতে ইসরায়েলের ওপর চাপ দেবেন, তার কোনো ইঙ্গিতই নেই।