কী সম্পর্ক সিনেমার পদ্মাবতী আর গুজরাট ভোটের?

পদ্মাবতীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দীপিকা পাডুকোন ছবির কপিরাইট STR
Image caption পদ্মাবতীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দীপিকা পাডুকোন

ভারতের বলিউডে চলতি বছরের সম্ভবত সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ছবির নাম ছিল পদ্মাবতী - যা প্রায় সাতশো বছর আগে চিতোরের রানির পদ্মিনীর জীবন নিয়ে তৈরি।

কিন্তু পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভানশালির এই সিনেমাকে ঘিরে তুমুল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের পর এই ছবির মুক্তিই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে - আর অনেকেই তার জন্য দায়ী করছেন গুজরাটের নির্বাচনকে।

সে রাজ্যে প্রভাবশালী রাজপুত ভোটারদের তুষ্ট করতেই বিজেপি পদ্মাবতীর বিরোধিতায় সরব হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে - আর বিরোধী কংগ্রেসও তাতে গলা মিলিয়েছে।

রাজপুত মর্যাদা রক্ষার নামে গুজরাটের নির্বাচনী রাজনীতি কীভাবে শিল্পীর স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে তুলেছে, গুজরাটের পথে-প্রান্তরে তারই সন্ধান করেছিলাম।

রাজপুতানার ঘুমর লোকনৃত্যের তালে নাচতে ভালবাসতেন চিতোরের রানী পদ্মিনী - যিনি দিল্লির শাসক আলাউদ্দিন খিলজির হাত থেকে সম্ভ্রম বাঁচাতে শত শত সঙ্গিনীকে নিয়ে আগুনে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, সংক্ষেপে এই হল বলিউডের 'ম্যাগনাম ওপাস' পদ্মাবতী সিনেমার বিষয়বস্তু।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption গুজরাতের রাজপুত নেতা ও বিজেপি এমএলএ জগরূপ সিং

ছবিটি সারা ভারতেই মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল এ মাসের গোড়ায় - কিন্তু নির্মাতা সঞ্জয় লীলা ভানশালির সেই স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়েছে রাজপুতদের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটি।

গুজরাটে রাজপুত নেতাদের অন্যতম বাপুনগরের বিজেপি এমএলএ জগরূপ সিং রাজপুত। তিনি বলছেন, "ভারতের দুর্ভাগ্য হল চিরকাল এ দেশে ইতিহাসকে বিকৃত করে পেশ করা হয়। মহারানা প্রতাপকে না-বলে আমরা নায়ক বলি আকবরকে।"

"হুমায়ুনের বীরগাঁথা গাই, অথচ শরীরে বিরাশিটা আঘাত নিয়ে যিনি তার সঙ্গে লড়েছিলেন সেই রানা সাঙ্গার কথা বলি না। রানি পদ্মিনী ঘোমটা ছাড়াই নাচছেন, সিনেমায় এ দৃশ্য দেখাতে আমাদের সঙ্কোচ হয় না - অথচ বাস্তবে রাজপুত রমণীরা আজও ঘোমটা প্রথা মানেন, রাজপুত সমাজে তাদের আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়।"

বলিউডের পদ্মাবতী সেই মর্যাদার অবমাননা করেছে, এই যুক্তিতেই গুজরাটের বিজেপি সরকার রাজ্যে ছবিটির বিরোধিতা করেছে।

রাজস্থানের বাইরে এই গুজরাটেও রাজপুতরা যথেষ্ট প্রতিপত্তিশালী, রাজ্যের বহু নেতা-রাজনীতিক-শিল্পপতি থেকে ক্রিকেট তারকা রবীন্দ্র জাডেজা, অনেকেই রাজপুত।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

গুজরাটে ‘হিন্দুত্বে’র লড়াইয়ে মুসলমানরা কোনঠাসা

চব্বিশ বছরের যুবক কেন গুজরাটে 'বিজেপির ত্রাস'?

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption সমাজবিজ্ঞানী ও অধ্যাপিকা রঞ্জনা ঢোলাকিয়া

আর তাদের আবেগকে উসকে দিতেই যে এই সিদ্ধান্ত, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।

তবে সমাজবিজ্ঞানী ও গুজরাট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রঞ্জনা ঢোলাকিয়া বলছিলেন, "ছবিটা কেউ দেখেইনি - অথচ সবাই ধরেই নিচ্ছে ওতে অমুক আছে বা তমুক আছে এবং রাজপুতদের অপমান করা হয়েছে।"

এটা যে গুজরাটের নির্বাচনের কারণেই, তা নিয়ে তার অন্তত কোনও সন্দেহ নেই। আহমেদাবাদের তরুণী প্রিয়াঙ্কা শাহও তার সঙ্গে একমত।

তিনি বলছিলেন, "ভোটের জন্যই ছবিটাকে এখানে আটকানো হয়েছে সেটা বেশ বুঝতে পারছি। নইলে এখানকার লোকজন যেমন মারকুটে ধরনের, তাতে পদ্মাবতী নিয়ে একটা দাঙ্গা বা হিংসা বেঁধে যেতে আর কতক্ষণ!"

তবে রাজ্যে একটা বড় অংশের জনমত যে পদ্মাবতী ছবিটির বিরুদ্ধে, সেটা অবশ্য সহজেই টের পাওয়া যায়।

ছবির কপিরাইট NOAH SEELAM
Image caption পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভানশালির বিরুদ্ধে রাজপুতদের বিক্ষোভ

আহমেদাবাদের ভিরাম ঠাকোরের কথায়, "স্কুলে আমরা রানি পদ্মাবতীকে নিয়ে অনেক কিছু পড়েছি - তিনি কী ছিলেন সেটা জানি। কিন্তু মুশকিল হল ভারতে কিছু লোক এই ধরনের বিষয়ে বিতর্ক তৈরি করে ফায়দা লুটতে চায়, আর সঞ্জয় লীলা ভানশালি তাদেরই একজন!"

কেউ আবার প্রশ্ন তোলেন, "শিল্পীর স্বাধীনতার কথাই যদি বলেন - তাহলে উনি অন্য সম্প্রদায়কে নিয়ে ছবি বানান না-কেন, শুধু কেন রাজপুতদেরই তিনি বেছে নেবেন?"

গুজরাট নির্বাচনে প্রায় প্রতিটি বিষয়ে বিজেপির বিরোধিতায় সরব হলেও পদ্মাবতীর প্রশ্নে কিন্তু কংগ্রেসেরও অবিকল একই সুর।

গুজরাট কংগ্রেসের মুখপাত্র মনীশ দোশীর কথায়, "রানি পদ্মাবতীর আত্মত্যাগ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে - আমরা নতমস্তকে তাকে প্রণাম করি। সেই ইতিহাসকে দুমড়েমুচড়ে পেশ করে কেউ একটা জাতির আবেগকে আহত করবে, তা তো মানা যায় না।"

আবার আহমেদাবাদে শাহিনা শেখের মতো বাঙালি তরুণীরাও আছেন, যারা পদ্মাবতী দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলেন এবং ছবিটা মুক্তি না-পাওয়ায় অত্যন্ত হতাশ।

ছবির কপিরাইট Ranveer Singh/Twitter
Image caption পদ্মাবতীতে আলাউদ্দিন খিলজির ভূমিকায় রণবীর সিং

শাহিনার কথায়, "পুরোটাই আসলে রাজনীতির কারণে। আমি তো খুব চেয়েছিলাম, রানি পদ্মিনীর চরিত্র নিয়ে ইতিহাসে এত কিছু পড়েছি, তাকে সিনেমায় কীভাবে পিকচারাইজ করা হল সেটা দেখতে। ছবিটা মুক্তি পেলে আমি ছুটে গিয়ে দেখতাম।"

শাহিনার বলতে কোনও দ্বিধা নেই, পদ্মাবতী নিয়ে আপত্তির মূল কারণটা বোধহয় আলাউদ্দিন খিলজি।

"দেখুন প্রতিটা মুদ্রার যেমন দুটো পিঠ থাকে, তেমনি ইতিহাস বলে খিলজির চরিত্রেরও দুরকম দিক ছিল - পজিটিভ ও নেগেটিভ। এখন ছবিটা না-দেখেই সবাই কেন ধরে নিচ্ছেন খিলজির চরিত্রের নেগেটিভিটিই শুধু দেখানো হবে, এটা আমার মাথায় ঢুকছে না। আরে ছবিটা আগে তো মুক্তি পেতে দাও, তারপর তোমার মতামত দিও!", বিবিসিকে বলছিলেন তিনি।

কিন্তু একজন মুসলিম শাসক রাজপুতদের যুদ্ধে হারিয়ে দেবেন, ফিল্মে রাজপুতদের ভিলেন হিসেবে দেখানো হবে - এসব জিনিস সিনেমাতেও আর দেখানো যাবে না, হুঁশিয়ারি দেন বিজেপি নেতা জগরূপ সিং।

ছবির কপিরাইট বিবিসি
Image caption আহমেদাবাদে গুজরাট ইউনিভার্সিটি

তিনি বলছেন, "মনোরঞ্জনের নামে ইতিহাসের বিকৃতি যতদিন চলেছে, চলেছে। কিন্তু এখন আর তা আমরা হতে দেব না।"

"হিন্দি সিনেমায় দেখবেন খলনায়ক বেশিরভাগ সময় রাজপুত বা ঠাকোররাই হয় - কিন্তু এখন আমাদের সমাজও সচেতন হচ্ছে, ফিল্মওয়ালারা আমাদের যতটা খারাপ দেখাতে চায় আমরা মোটেও সেরকম নই", জানাচ্ছেন গুজরাটের এই রাজপুত নেতা।

ফলে রাজপুতদের এই নতুন স্বাভিমান আর আত্মমর্যাদার অনুসন্ধানেই আপাতত কোপ পড়ল পদ্মাবতীর ওপর।

অনেকেরই ধারণা এ মাসে গুজরাটে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেটা আগেভাগে মাথায় রাখলে পদ্মাবতীর নির্মাতারা ছবির মুক্তিও হয়তো এ সময়ে ফেলতেন না!

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

নিউইয়র্কে হামলাকারী সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?

সিনেমার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হচ্ছে সৌদি আরবে

এক দেশে প্রায় ৬০ কোটি সিসিটিভি ক্যামেরা?