ভারতে টিভিতে কন্ডোমের বিজ্ঞাপন শুধু রাতে

ভারতে কন্ডোমের বিজ্ঞাপন দিনেরবেলায় দেখানো যাবে না ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ভারতে কন্ডোমের বিজ্ঞাপন দিনেরবেলায় দেখানো যাবে না

ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বলেছে ভোর ছটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত কোন টিভি চ্যানেলে কন্ডোমের বিজ্ঞাপন দেখানো যাবে না।

ওই সময়কালে বাচ্চারা টিভি দেখে আর কন্ডোমের বিজ্ঞাপনগুলো তাদের ওপরে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে, এ কারণেই এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে।

রাত দশটা থেকে পরের দিন ভোর ছটা পর্যন্ত কন্ডোমের বিজ্ঞাপন দেখানোর ওপরে কোনও বাধা থাকবে না।

দেশের সবকটি টিভি চ্যানেলের কাছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এই নির্দেশ পাঠিয়েছে।

কেবল্ টেলিভিশন নেটওয়ার্ক রুলস-এ বলা হয়েছে, যেসব বিজ্ঞাপন শিশুদের সুরক্ষা বিঘ্নিত করতে পারে বা কিছু অস্বাস্থ্যকর বিষয়ে কৌতূহল তৈরি করতে পারে, এমন বিজ্ঞাপন দেখানো যাবে না।

কন্ডোমের বিজ্ঞাপনগুলির প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল অ্যাডভারটাইজিং স্ট্যান্ডার্স কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া। এই সংস্থাটি বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে তৈরি একটি স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা।

গত সেপ্টেম্বরে সানি লিওন অভিনীত একটি কন্ডোমের বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে গুজরাটের সুরাট শহরে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়।

গুজরাটের বড় উৎসব নবরাত্রির আগে ওই বিজ্ঞাপনে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, ''খেল, কিন্তু ভালবাসার সঙ্গে।''

হিন্দু যুব বাহিনী ওই বিজ্ঞাপনটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল।

একটা জনপ্রিয় ধারণা রয়েছে, যে গুজরাটে নবরাত্রির উৎসবের সময়ে অনেক অবিবাহিত নারীই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়েন। এ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে প্রচুর।

সেই প্রচলিত ধারণাকে কেন্দ্র করেই গুজরাটিদের উদ্দেশ্যে নবরাত্রির সময়ে কন্ডোমের ব্যবহার বাড়াতে আর তাদের নিজের পণ্য বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছিল ওই বিশেষ ব্র্যান্ড বলেই মনে করা হয়ে থাকে।

বিজ্ঞাপনটি নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হওয়ায় প্রায় ৫০০ হোর্ডিং গুজরাত থেকে সরিয়ে নিয়েছিল ওই কন্ডোম প্রস্তুতকারী সংস্থাটি।

তা নিয়ে অ্যাডভারটাইজিং কাউন্সিলে অভিযোগ জমা পড়ে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়ে দিয়েছিল যে বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু নিয়ে তাদের কিছু বলার নেই, তবে তাদের পক্ষে কোনও পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারের সময় বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বিষয়টি মন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়েছিল বিবেচনার জন্য।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption কেউ কেউ বলছে কিশোর-কিশোরীদের তো জানা উচিত কন্ডোম সহ নানা ধরণের গর্ভনিরোধকের ব্যাপারে। তাহলে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বা এইডস-এর ব্যাপারে সচেতন থাকতে পারবে।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের এই নির্দেশে বিতর্ক কেন?

কেউ বলছেন, সত্যিই পরিবারের সঙ্গে বসে টিভি দেখার সময়ে হঠাৎ কন্ডোমের বিজ্ঞাপন চলে এলে বেশ অস্বস্তিতেই পড়তে হয়। কেউ আবার বলছেন এমন বহু সিরিয়াল বা সিনেমা সারাদিন ধরেই দেখানো হয়, যেখানে পারিবারিক হিংসা, একাধিক নারীর সঙ্গে বিবাহের মতো ক্ষতিকারক বিষয় থাকে। শিশুদের ওপরে সেসবেরও কুপ্রভাব পড়ে। তাই বন্ধ করতে হলে সেগুলোও বন্ধ করা উচিত।

কেউ কেউ আবার মনে করছেন যে কন্ডোমের বিজ্ঞাপনগুলো আজকাল একটু বেশিরকমেরই উত্তেজক হয়ে যাচ্ছে। পরিবার নিয়ন্ত্রণ বা এইডস্-এর মতো মারণ রোগের প্রতিরোধে কন্ডোমের যে গুরুত্ব, সেই বার্তা কিছুটা খাটো হয়ে যাচ্ছে।

মুম্বাইয়ে বিজ্ঞাপন ফিল্ম তৈরি করেন শৌভিক রায়। তিনি বলছিলেন, "আমরা এমন একটা যুগে বাস করছি, যেখানে যৌন-শিক্ষা বা খারাপ-ছোঁয়া, ভাল-ছোঁয়া এগুলোও যেমন দশ এগারো বছর থেকেই শেখানো দরকার, তেমনই পরিবার নিয়ন্ত্রণ বা এইডসের সম্বন্ধেও ধারণা দেওয়া দরকার। তবে এখন কন্ডোমের বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই সেই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়ার বদলে যৌন আবেদনের সীমার কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। অনেকগুলিতেই যৌনসুড়সুড়িও দেওয়া হয়।"

মি. রায়ের নিজেরও সাত বছরের একটি মেয়ে আছে।

তিনি বলছিলেন, ভারতীয় সমাজে এখনও পরিবারের সঙ্গে বসে টিভি দেখার চল রয়েছে বেশিরভাগ বাড়িতেই।

তাই কন্ডোমের যেসব বিজ্ঞাপন কিছুটা উত্তেজক, - যা সফট পর্ণোগ্রাফির কাছাকাছি চলে যায়, অথবা গোটা বিষয়টাকে একটা মজা করার বিষয়বস্তু হিসাবে তুলে ধরে, সেই বার্তাটা ছোট বাচ্চাদের সামনে না দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে করেন শৌভিক রায়।

জাতীয় শিশু সুরক্ষা কমিশনও কন্ডোমের বিজ্ঞাপনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার এই সরকারি নির্দেশনাকে স্বাগত জানিয়েছে।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption অনেকে প্রশ্ন তুলছেন সারাদিন ধরে টিভিতে যেসব সিনেমা বা সিরিয়াল হয়, সেগুলো কি শিশুদের ওপরে খারাপ প্রভাব ফেলে না?

তবে কন্ডোমের বিজ্ঞাপনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার বিরুদ্ধ মতও দেখা যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে।

'অপেক্ষা' নামের এক টুইট ব্যবহারকারী লিখছেন, "মনে হচ্ছে কন্ডোমের বিজ্ঞাপন দেখে ছোটদের থেকে বড়রাই বেশি অস্বস্তিতে পড়ে। কিন্তু ছোটরা অন্য যাসব ছবি, ভিডিও দেখছে বা যেসব গান শুনছে - সেগুলোও কি সবসময়ে রুচিকর?"

পশ্চিমবঙ্গ শিশু সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারপার্সন অনন্যা চ্যাটার্জীও উল্লেখ করছিলেন এই বিষয়টিরই।

তাঁর কথায়, "সারাদিন ধরে যেসব সিনেমা বা সিরিয়াল হয়, সেগুলো কি শিশুদের ওপরে খারাপ প্রভাব ফেলে না? সেগুলোতে কি পারিবারিক হিংসা, বেআইনীভাবে একই পুরুষের দুতিনটি বিয়ে এসব দেখানো হয় না? শুধু কন্ডোমের বিজ্ঞাপন কেন, তাহলে ওইসব সিনেমা সিরিয়ালও বন্ধ হোক। ওগুলো বন্ধ করা বেশি জরুরি।"

"একেবারে ছোট বাচ্চাদের ওপরে কন্ডোমের বিজ্ঞাপনের প্রভাব হয়তো পড়তে পারে, কিন্তু কিশোর-কিশোরীদের তো জানাই উচিত কন্ডোম সহ নানা ধরণের গর্ভনিরোধকের ব্যাপারে। তাহলে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বা এইডস-এর ব্যাপারে সচেতন থাকতে পারবে,"বলছিলেন মিসেস চ্যাটার্জী।

'যশ সিঙ্গলা' টুইটারে মন্তব্য করেছেন, "কেন জনসংখ্যার দিক থেকে একেবারে প্রথম সারিতে আছে ভারত, জানেন সেটা? কারণ এই দেশে মানুষ কন্ডোমের ব্যাপারে অজ্ঞ আর সেটা কিনতে তারা লজ্জা পায়। কন্ডোমের বিজ্ঞাপনে কি পর্নোগ্রাফি দেখানো হয় যে সেটা বন্ধ করতে হবে?"

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিবার পরিকল্পনার অংশ হিসাবে সরকারি কন্ডোমের বিজ্ঞাপন তিন চার দশক ধরেই ভারতের টিভি তে দেখানো হত। সেগুলোতে অবশ্য মূলত ''ছোটপরিবার, সুখী পরিবার'' ধরণের বার্তাই দেওয়া হত।

জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নববিবাহিত দম্পতিদের অবহিত করার জন্য কন্ডোম সহ বেশ কয়েকধরণের গর্ভনিরোধক বড়ি আর কয়েকরকমের প্রসাধনী উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে উত্তরপ্রদেশ সরকার।

সম্পর্কিত বিষয়

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর