জড়িয়ে ধরায় স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রী বহিষ্কার ভারতে

ছবির কপিরাইট Vivek Nair
Image caption ছেলেটি বলছে, মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরার পেছনে উদ্দেশ্য ছিলো তাকে অভিনন্দন জানানো, এর পেছনে অন্য কিছু ছিলো না

দক্ষিণ ভারতে দু'জন ছাত্রছাত্রীর একে অপরকে জড়িয়ে ধরা বা আলিঙ্গন করার ঘটনায় স্কুল থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করার পর এনিয়ে সারা দেশে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে 'প্রকাশ্যে ভালোবাসা প্রদর্শনের' মাধ্যমে 'অশোভন' ও 'নীতি-বিবর্জিত' আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তটি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। কেরালার হাইকোর্ট স্কুলের পক্ষে রায় দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ছেলেটির পিতা বলছেন, তারা এখন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করবেন।

কেরালার সেন্ট টমাস সেন্ট্রাল স্কুলে গানের এক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পর মঞ্চ থেকে নেমে আসে ১৫ বছর বয়সী ওই মেয়েটি। সে তখন তার এক বন্ধু ১৬ বছর বয়সী একটি ছেলের কাছে জানতে চায় তার গান কেমন হয়েছে। ছেলেটি তখন মেয়েটিকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে জড়িয়ে ধরে এবং তার অসাধারণ পারফর্মেন্সের জন্যে তাকে অভিনন্দন জানায়।

"এই আলিঙ্গন মাত্র এক কি দুই সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছিলো," বিবিসির সংবাদদাতাকে একথা বললো মেয়েটি, যদিও এই প্রতিবেদনের জন্যে সে তার কোনো ছবি তুলতে দিতে রাজি হয়নি।

"আমাদের চারপাশে আরো অনেক ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক শিক্ষিকারা ছিলো। আমার মনে হয়নি যে আমি ভুল কিছু করছি।"

তুই চলে যা, পেছনে তাকাইলে মাইরা ফালামু: মোবাশ্বার হাসানকে যেভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়

কিন্তু শিক্ষক শিক্ষিকাদের মধ্য থেকে একজন প্রিন্সিপালের কাছে এবিষয়ে অভিযোগ করেন। এবং তারপরই সব সমস্যার শুরু।

পরদিন, ২২শে জুলাই, ওই দু'জন ছাত্রছাত্রীকে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে বরখাস্ত করা হয়। এবং তার চার মাস পর, ২২শে নভেম্বর, ছেলেটিকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সংবাদ মাধ্যমে এই দু'জনের কারো নামই উল্লেখ করা হয়নি।

"স্কুলের পড়াশোনা শিক্ষার্থীদের সংশোধনের জন্যেও," বিবিসিকে বলেন স্কুলটির প্রিন্সিপাল সেবাস্টিয়ান টি জোসেফ। "আমরা তাকে সময় দিয়েছিলাম ক্ষমা চাওয়ার জন্যে। কিন্তু এই ঘটনার জন্যে তার এবং তার পিতামাতার কোন অনুশোচনাও নেই।"

কিন্তু ছেলেটি বিবিসিকে বলেছে যে 'ঘটনার পরপরই' সে দুঃখ প্রকাশ করেছিলো।

এই ঘটনার পর মেয়েটি আর স্কুলে ফিরে আসে নি। স্কুলের রেকর্ডেও দেখা গেছে সে স্কুলের ছাত্রী নয়।

মেয়েটি তার বাবার কর্মসূত্রে দুবাই-এ থাকতো। গত জুন মাসে সে সেন্ট টমাস স্কুলে যোগ দেয়। কিন্তু তার ভর্তির বিষয়ে কাগজপত্র পূরণের কাজ এখনও শেষ হয়নি।

এই ঘটনার পর তাদের দু'জনকেই শৃঙ্খলা সম্পর্কিত একটি কমিটির সামনে ডেকে পাঠানো হয়েছিলো। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে এই কমিটি গঠন করা হয়।

ছবির কপিরাইট Vivek Nair
Image caption শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করায় স্কুলটির সমালোচনা হচ্ছে

স্কুল তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে তার খসড়াটি বিবিসি সংগ্রহ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে তাদের বিরুদ্ধে 'অশোভন, নীতি-বিবর্জিত উপায়ে প্রকাশ্যে অন্যান্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শিক্ষিকাদের সামনে 'ভালোবাসা প্রদর্শনের' অভিযোগ আনা হয়েছে।

সেখানে তাদের ব্যক্তিগত ব্লগ এবং ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সেখানকার 'ছবি এবং কথাবার্তাও কুরুচিপূর্ণ, অন্তরঙ্গ, অশ্লীল এবং আপত্তিকর।'

"ইন্সটাগ্রামে আমার অ্যাকাউন্ট ব্যক্তিগত, সেখানে আমি যা কিছু লিখি শুধু আমার ফলোয়াররাই সেটা দেখতে পায়। সেখানে কুরুচি বা অশ্লীলতার কিছু নেই," ছেলেটির বক্তব্য।

বাংলাদেশের নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার ফিরেছেন: কেন নিখোঁজ ছিলেন তিনি?

সে জানায়, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলোর সে জবাব দিয়েছে। সেখানে সে বলেছে, "জড়িয়ে ধরার পেছনে উদ্দেশ্য ছিলো মেয়েটিকে শুধু অভিনন্দন জানানো, এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না।"

মেয়েটি অভিযোগ করেছে যে স্কুলের কমিটির কাছে ইন্সটাগ্রামে তাদের পোস্ট করা ছবিগুলোর কপি আছে এবং কমিটির সদস্যরা তাদেরকে গালিগালাজও করেছেন।

এই কমিটি তাদেরকে 'দোষী' সাব্যস্ত করার আগেই তারা চার মাস স্কুলে যেতে পারেনি।

ছবির কপিরাইট Vivek Nair
Image caption মেয়েটি বলছে, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করেছে

এর মধ্যে ছেলেটির পিতামাতা কেরালায় শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যে কমিশন তার কাছে স্কুলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। ওই কমিশন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্যে স্কুলকে আদেশ দেয়।

কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ তখন কেরালা হাই কোর্টে পিটিশন দায়ের করে। শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে আদালত। সেখানে বলা হয়, স্কুলের মান ও সুনাম ধরে রাখার জন্যে স্কুল কর্তৃপক্ষের এধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

ছেলেটির পিতামাতা এখন আদালত পুনরায় শুরু হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছেন। ক্রিসমাসের জন্যে আদালত এখন বন্ধ। তারা বলছেন যে আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন।

ছেলেটির বাবা বলেছেন, এই ঘটনার পর থেকে তিনি কাজে যেতে পারছেন না।

তিনি জানান, তার ছেলে এবং ওই মেয়েটির ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট স্কুলের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অনুসরণ করেন না। কিন্তু তারপরেও তারা কোনো না কোনো উপায়ে তাদের ছবি সংগ্রহ করেছে। এমনকি সেসব আদালতের সামনেও উপস্থাপন করেছে।

"তারা কি তাহলে তাদের ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে না?" তিনি বলেন, ব্যক্তিগত এই গোপনীয়তার কথা তিনি আদালতের সামনেও তুলে ধরবেন।

ছেলেটির বাবা মা দুজনেই তাদের সন্তান বার্ষিক পরীক্ষা দিতে পারবে কীনা সেটা নিয়ে চিন্তিত। তাদের আশঙ্কা যে এর ফলে ছেলেটির কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়েও সমস্যা হতে পারে।

Image caption ছেলেটি গত চার মাস ধরে স্কুলে যেতে পারে নি

স্কুল কর্তৃপক্ষ বিবিসিকে বলেছে যে তারা ছেলেটিকে অন্য কোনো স্কুলে ভর্তি হতে বলেছে। তবে সেটা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় শিক্ষা বোর্ডের উপর।

গত বৃহষ্পতিবার প্রিন্সিপালের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছে ছেলেটি। তাকে আরেকটি মিটিং-এ যেতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, বিষয়টি তারা সেখানে পুনরায় খতিয়ে দেখবেন।

তবে স্কুলে মেয়েটির ভবিষ্যৎ কি সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। তার পিতামাতাও নিশ্চিত নন যে তারাও আদালতের দ্বারস্থ হবেন কীনা।

তবে মেয়েটি বলেছে যে সে আর ওই স্কুলে যেতে চায় না। তবে সে আশা করছে কর্তৃপক্ষ তাকে বার্ষিক পরীক্ষায় বসতে দেবে যাতে তার জীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে না যায়।

সে জানায় ইতোমধ্যে সে অন্য একটি স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্যে আবেদন করেছিলো কিন্তু এই ঘটনার কারণে তারা তাকে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

"তারা (স্কুল) আমাকে আমার শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। লঙ্ঘন করেছে আমার ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও," মেয়েটির বক্তব্য।

সম্পর্কিত বিষয়

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর