বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁওয়ে পরকীয়ার অভিযোগে সালিশ এবং গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু

বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলায় এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ছবির কপিরাইট Google Maps
Image caption বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলায় এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে

স্বামীর পরিবার থেকে আনা পরকীয়ার অভিযোগ নিয়ে সালিশের পর বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলায় এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

পুলিশ বলছে, ওই গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু তার একজন স্বজনের দাবি, সালিশে দোররা মারায় তার মৃত্যু হয়েছে।

এ ঘটনায় সালিশে থাকা স্থানীয় একজন কাজীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, সালিশ হলেও দোররা মারার কোন ঘটনা ঘটেনি। ওই গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন।

তাহলে কেন একজন স্থানীয় কাজীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, সেটিরও পরিষ্কার কোন ব্যাখ্যা পুলিশ দিতে পারে নি।

আরো পড়তে পারেন:

'সৌদি আরবে নারী শ্রমিকের পরিবেশের পরিবর্তন হচ্ছে'

কে ছিলেন ইন্তিফাদার সেই কালো পোশাক পরা তরুণী?

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৯ মাস আগে হরিপুরের জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে পাশের গ্রামের মৌসুমি আক্তারের বিয়ে হয়েছিল। এরপর থেকেই মৌসুমিকে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করছে গৃহবধূর পরিবার।

তবে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর থানার ওসি রুহুল কুদ্দুস বিবিসি বাংলাকে বলেন, ''ওই গৃহবধূর সঙ্গে তার দেবরের পরকীয়া রয়েছে বলে তার স্বামীর পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন। গত ১৬ই ডিসেম্বর তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলার পর গত ১৬ই ডিসেম্বর পারিবারিক সালিশ বসে। সেখানে মেয়েটিকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তিনি আর এরকম কাজ করবেন না, এরকম কথা দেয়ার কয়েকদিন পর আবার স্বামী তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। কিন্তু বাড়িতে আসার পর আবার এ নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি হয়। এর জের ধরে গত ২২শে ডিসেম্বর তিনি আত্মহত্যা করেন।''

খবর পেয়ে পুলিশ মৃতদেহের সুরতহাল এবং ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে।

তিনি বলছেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা নেয়া হয়েছে। তবে এখানে সালিশ করে দোররা মারার কোন ঘটনা ঘটেনি বলে মি: কুদ্দুস দাবি করেন।

তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন নিহত গৃহবধূর ভগ্নীপতি আবেদ আলী।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''বিয়ের সময় মৌসুমির স্বামী জাহাঙ্গীরকে কিছু টাকা যৌতুক দেয়া হলেও, এরপরেও সে আরো একলক্ষ টাকা যৌতুক চাইছিল। এ নিয়ে প্রায়ই মৌসুমিকে সে নির্যাতন করতো। সেটা না দেয়ার কারণেই এই পরকীয়ার অভিযোগ সাজিয়ে মৌসুমির উপর নির্যাতন করা হয়েছে। ''

তিনি বলেন, '' ১৬ই ডিসেম্বর পরকীয়ার অভিযোগ তুলে মৌসুমিকে মারধর করে মার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর আবার ২০ তারিখ তার স্বামী এসে তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়। সেদিন রাতেই এলাকার লোকজনকে ডেকে স্বামী জাহাঙ্গীরের বাড়িতে সালিশ বসানো হয়। সেই সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সে পরকীয়া করে, এরকম মিথ্যা কথা বলে মোসুমিকে ১০১টি দোররা মারা হয়। একসময় সে অজ্ঞান হয়ে গেলেও, তার জ্ঞান ফিরে আসার পর আবার তাকে দোররা মারা হয়। পরদিন বিকালে সে মারা যায়। তখন তার দেহ ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা করেছে বলে সাজানো হয়।''

ছবির কপিরাইট FARJANA KHAN GODHULY
Image caption বাংলাদেশে সালিশ বা ফতোয়ার মাধ্যমে দোররা মারা নিষিদ্ধ করে হাইকোর্টের রায় রয়েছে

সালিশ বা দোররা মারার সময় তিনি উপস্থিত না থাকলেও, জাহাঙ্গীর আলমের একজন প্রতিবেশীর কাছে মৌসুমির ভগ্নীপতি মি: আলী এসব ঘটনার বিস্তারিত শুনেছেন বলে জানান।

তিনি বলছেন, ''মৌসুমিকে দোররা মারা, তাকে মেরে ঝুলিয়ে রাখার সব কথা উল্লেখ করে আমরা পুলিশের কাছে অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু এখনো আমাদের অভিযোগ মামলা হিসাবে না নিয়ে তারা ঝুলিয়ে রেখেছে।''

তবে এ ঘটনায় মৌসুমির মা সাবেরা বেগম কেন অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাকে ভুল বুঝিয়ে আর টাকাপয়সা দিয়ে মামলাটি দায়ের করানো হয়েছে।

এ ঘটনাটি টাকা পয়সা দিয়ে ''ম্যানেজ'' করার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি দাবি করেন।

সালিশ এবং দোররা মারার এসব অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় একজন কাজীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। সালিশে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ওই কাজীরও নাম রয়েছে ।

কিন্তু পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সালিশ করে দোররা মারার ঘটনা না ঘটলেও কেন একজন স্থানীয় কাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার কোন ব্যাখ্যা দিতে পারেননি স্থানীয় থানার ওসি রুহুল কুদ্দুস।

এই ঘটনার অনুসন্ধানে ওই গ্রামে গিয়েছিলেন স্থানীয় সাংবাদিক পার্থ সারথি দাস। নিহত গৃহবধূর স্বজন, প্রতিবেশী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন।

তিনি বলছেন, ''আমার কাছে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেছেন যে, তাদের সামনেই দোররা মারা হয়েছে। তবে নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা সামনে এগিয়ে আসতে রাজি নন।''

বাংলাদেশে সালিশ বা ফতোয়ার মাধ্যমে দোররা মারা নিষিদ্ধ করে হাইকোর্টের রায় রয়েছে।

তবে এই সালিশ এবং দোররা মারার বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত করতে পারেননি স্থানীয় কোন জনপ্রতিনিধি।

যে গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মংলা বলছেন, ''ওই গৃহবধূর মৃত্যুর কথা শুনে আমি বাড়িতে গিয়েছিলাম। একটা সালিশ হয়েছে বলে শুনেছি, কিন্তু এ বিষয়ে আমাকে কেউ কিছু জানায়নি।'' দোররা মারার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।

পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এখন অপেক্ষা করছেন ময়না তদন্তের প্রতিবেদনের জন্য। সেটার ভিত্তিতেই তারা পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন।

বিবিসি বাংলার আরো খবর:

অবশেষে কাটা পড়ছে হোয়াইট হাউজের 'ম্যাগনোলিয়া'

জেরুসালেমে 'ট্রাম্প স্টেশন' বানাবে ইসরায়েল

সাইবেরিয়ার গহীনে রুশরা যেভাবে গড়েছিল বিজ্ঞাননগরী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের 'যৌনদাসী' বিতর্ক কেন আবার সামনে

সম্পর্কিত বিষয়