বিদেশে অনুষ্ঠানের নামে মানবপাচার: কঠোর হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার

ছবির কপিরাইট Facebook
Image caption অনন্য মামুনের বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হতে পারে। খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর।

বিদেশে অনুষ্ঠানের নামে মানব পাচারের ঘটনা ঠেকাতে এটি করা হবে বলছেন তিনি।

এমন ঘটনার সাথে সংস্কৃতি কর্মীরাই জড়িত বলে বেশ কিছুদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। মানব পাচারের অভিযোগে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা অনন্য মামুন গ্রেফতার হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

তার সাথে আরো ৫৭ জন বাংলাদেশিকে গত সপ্তাহে আটক করেছে মালয়েশিয়ার গোয়েন্দা পুলিশ। সংস্কৃতির নানা অঙ্গনের জড়িতরা বলছেন এমন ঘটনার প্রভাব পরছে তাদের ওপরে।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে 'বাংলাদেশি নাইট' নামে একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নিতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের এক ঝাঁক তারকা। সেখানে বাংলাদেশিদের জন্য এ পর্যন্ত আয়োজিত এটিই সবচাইতে বড় অনুষ্ঠান ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশীদের জন্য এর শেষটা ছিলো রীতিমতো বিব্রতকর।

অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন চিরকুট ব্যান্ডের ভোকালিস্ট শারমিন সুলতানা সুমি। তিনি বলেন, "আয়োজকদের কিছু অব্যবস্থাপনার কারণে শুরুতেই আমরা আমাদের মতো হোটেল নিয়ে আলাদা হয়ে যাই। এর পর শুধু শো করে চলে আসি। ফেরার দিন বিমানবন্দরে এসে একটা ছেলের সাথে কথা হলো। সে বললো আমি ওখান থেকে ছাড়া পেয়ে আসছি। অনেক মানুষ সহ অর্গানাইজারকে ধরা হয়েছে। ব্যাপারটা আমাদের জন্য অত্যন্ত শকিং। এইভাবে যে হতে পারে তা আমাদের মাথাতেই নাই।"

ঐ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পক্ষের আয়োজক, চলচ্চিত্র নির্মাতা অনন্য মামুন গ্রেফতার হয়েছেন মানব-পাচারের অভিযোগে। মালয়েশিয়ার পুলিশ সেদিন আরো ৫৭ জন বাংলাদেশিকে আটক করেছে।

বাংলাদেশী অভিবাসীদের আমন্ত্রণে বিশ্বের নানা দেশেই যান বাংলাদেশের শিল্পীরা। সিনেমা, নাটক বা বিজ্ঞাপন চিত্রের ফিল্মিং এ বিদেশে যাওয়ার প্রচলনও রয়েছে। কিন্তু প্রায়শই অভিযোগ ওঠে সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে শিল্পী ভিসায় মানব-পাচারের। আর সেই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সংস্কৃতি-কর্মীরা নিজেরাই।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption কুয়ালালামপুরে সাংস্কৃতিক দল নেয়ার নামে মানুষ পাচারের অভিযোগ ওঠে

এর আগে অনেক বড় তারকাদের নামেও অভিযোগ এসেছে। বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত বিদেশে সিনেমার শুটিং এ যান চিত্র পরিচালক শাহ আলম কিরণ। তিনি বলছেন, এমন ঘটনার কারণে তাদেরকে প্রায়ই ভিসা নিতে গিয়ে বা বিদেশে বিমানবন্দরে সন্দেহের তালিকায় পড়তে হয়। তিনি বলছেন, "আমরা প্রায়শই শুটিং এ বাইরে যাই। মালয়েশিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড যাই। এই ঘটনার রেফারেন্স দিয়ে দেখা যাবে আমাদেরকে যেতে দেবে না। এরকম ঘটনা এর আগেও ঘটেছে।"

তিনি আরো বলছেন, "আমার খুব কষ্ট হয় যখন দেখি এই কাজ আমাদের দেশের কালচারাল অঙ্গনের সেলেব্রিটিরা করে। এই সুন্দর সাংস্কৃতিক অঙ্গন কেন ব্যবহার করবে? আমি এসবে বিচার দাবি করছি।"

বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন গোয়েন্দা পুলিশের সূত্র বলছে বিদেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে অনিয়মের ঘটনার নজির তারা পাচ্ছেন। কিন্তু বিদেশী প্রতিষ্ঠান বা প্রবাসীদের আয়োজনে করা এসব অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে ভিসা, বিমান টিকেট আর হোটেল সব কিছুই ঠিকঠাক থাকে। তাই তারা কখনো কিছু করতে পারেন নি। বিমানবন্দরে আটকের পর উল্টো মামলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে, এমনটাও বলছিলেন একজন কর্মকর্তা।

জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার বাপ্পা মজুমদার বলছেন, সংস্কৃতি কর্মীদের নিজেদের জড়িত থাকার ঘটনায় শুধু শিল্পী মহলের নয় বরং পুরো বাংলাদেশেরই দুর্নাম হচ্ছে। তিনি বলছেন, "অবশ্যই এতে আমাদের দুর্নাম হচ্ছে। যখন দেশের বাইরে আমরা যাই, তারাতো আর সকলকে চেনে না। সেই কারণে দলের সবার উপরে এর প্রভাবটা পড়ে।"

তিনি বলছেন, এমন ঘটনা শিল্পী হিসেবে তার জন্য খুব অস্বস্তিকর ও অসম্মানজনক। তার মতে, "মালয়েশিয়া যে ঘটনা ঘটে গেলো তার কারণে পুরো বাংলাদেশী কমিউনিটিকে ওরা আর সম্মানের চোখে দেখবে না। সেই হিসেবে এর ইমপ্যাক্ট সরাসরি দেশের উপরে পড়ছে।"

বিদেশে অনুষ্ঠানের নামে এমন মানব পাচারের ঘটনা ঠেকাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভ্রমণের ক্ষেত্রে শিল্পীদের মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হবে। এছাড়ার শিল্পীদের যাচাই বাছাইয়ের বিষয়টিও চিন্তা করছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর বলছেন, "পুরো বিষয়টা আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা নিজেরা ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে কথা বলেছি। স্বরাষ্ট্র এবং তথ্য মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একসাথে আলোচনা করে এ ব্যাপারে খুব শীঘ্রই একটা সিদ্ধান্ত নেব এই কারণে যে বিদেশ থেকে যখন শিল্পীরা এদেশে আসে তখন তো অনুমতি লাগে কিন্তু যেতে হলে লাগে না। এমন আইন এ দেশে নেই।"

তিনি আরো বলছেন, শিল্পী যে মাধ্যমেরই হোক তাদের কোন না ভাবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি। মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা অ্যাকাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, শিল্পীদের সংগঠন, তাদের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব। তাদের সবাই নিয়ে আমরা নিশ্চয় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা কিছু দাঁড় করাতে পারবো।"

অনুমতির বাধ্য-বাধকতার বিষয়টি এমন আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য সময় সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে বলে নিজেই উল্লেখ করলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী। তবে তা এই অঙ্গনের সবাইকে নিজেদের স্বার্থেই মেনে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।