২০১৭ সালে যেসব ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল

আতিয়া মহলের পূর্বপাশ ছবির কপিরাইট আশকার আমিন রাব্বি
Image caption আতিয়া মহলের পূর্বপাশ

মার্চের ২৪ তারিখ। স্থান বাংলাদেশের উত্তরের জেলা সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকার আতিয়া মহল।

স্মরনকালের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এবং দীর্ঘতম সময় ধরে চলা জঙ্গি বিরোধী অভিযান শুরু হয়। বিরাট এই অভিযান সম্পর্কে শুধু টের পান আতিয়া মহলবাসী, সেখানে জঙ্গিরা অবস্থান করছিলেন তারা, আর আইনশৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্যরা।

ঘটনার দিন শুক্রবার ভোরের দিকে প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভাঙ্গে আতিয়া মহলের ২য় তলায় থাকা বিশ্বজিত কুমার দে'র। শ্বাসরুদ্ধকর ৩০ ঘণ্টা আটকে থাকার পর বিবিসি বাংলার কাছে তিনি বর্ণনা করেন প্রথম তিনি কি দেখেছিলেন।

"শুক্রবার সকালে বিশাল শব্দ হয়। ভয় পেয়ে নীচে নেমে আসি। কিন্তু দেখতে পাই কলাপসিবল গেটে তালা মারা, কিছু ব্যাগ আর তার রাখা। এইসব দেখে ভয় পেয়ে আমরা আবার সবাই উপরে চলে গিয়েছি। এরপর থেকেই আমরা ঘরের মধ্যে আটকা। আর্মির আসার আগ পর্যন্ত আমরা ঘরের মধ্যেই ছিলাম। প্রায় ৩০ ঘণ্টা সময় আমরা আটকে ছিলাম'।

২০১৬ সালে গুলশানের হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা-বাহিনী মরিয়া হয়ে পড়ে তাদের ভাষায় জঙ্গি বিরোধী অভিযানে।

রাজধানী ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে চলতে থাকে এমন অভিযান। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে চলা এই অভিযানে নানা দিক দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। পুলিশ, র‍্যাব, সোয়াট বাহিনী সহ সিলেটের ওই বাড়ি ঘিরে 'অপারেশন টোয়াইলাইট' নামে অভিযানটি অব্যাহত সেনাবাহিনী। তবে কারো কোন ধারণা ছিল না কতদিন ধরে চলবে।

অভিযানের ২য় দিনে অভাবনীয় এক ঘটনা ঘটে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের স্থানীয় সাংবাদিক আহমেদ নুর। যিনি নিজেও আহত হন।

তিনি বলছিলেন "সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আতিয়া মহলের পার্শ্ববর্তী একটি ভবনে প্রেস ব্রিফিং করা হয়। প্রেস ব্রিফিং শেষে যখন আমরা ফিরে আসছিলাম তখন মূল সড়কের পাশে ঘটে এই বিস্ফোরণের ঘটনা। চারিদিকে মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। আমি নিজেও আহত হয়ে সড়কের পাশে গড়িয়ে পরি"।

পাঁচ দিন ধরে টানা অভিযান, থেমে থেমে গুলি, আইনশৃঙ্খলা-বাহিনীর সংবাদ ব্রিফিং, পাঁচতলা আতিয়া মহলের সব বাসিন্দাদের অভিনব কায়দায় অক্ষত অবস্থায় সরিয়ে নেয়া শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেশবাসী।

এর পর মার্চ মাসেই আরো তিনটি স্থানে আইনশৃঙ্খলা-বাহিনী জঙ্গি-বিরোধী অভিযান চালায়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও শালিস কেন্দ্র হিসেব অনুযায়ী ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১০ অভিযান চালিয়েছে, যেসব অভিযানে নারী শিশু, পুরুষসহ ৩৫ জন নিহত হয়। পুলিশ অবশ্য নিহতদের মধ্যে ১৪ জন আত্মঘাতী হয়েছে বলে দাবি করেন।

বছরের আরেক আলোচিত ঘটনা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগ। মূলত বিচারপতি সিনহা ও সরকারের সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয় সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে।

অসদাচরণ ও অযোগ্যতার কারণে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত হাই কোর্টের রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগ রায় দেয় জুলাই মাসে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয় গত পয়লা আগস্ট।

আদালতের রায়ের নয়দিন পর সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়, যেটা নজিরবিহীন। রায়ে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য এবং পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সেই সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টত প্রধান বিচারপতির উপর অসন্তোষ প্রকাশ পায়।

সে টানাপড়েনের এক পর্যায়ে আইনমন্ত্রী বিবিসিকে জানান বিচারপতি এস কে সিনহা তাকে জানিয়েছেন যে তিনি ক্যান্সারের রোগী। এরপরই জানা যায় প্রধান বিচারপতি ছুটিতে যাচ্ছেন।

ছবির কপিরাইট BANGLADESH SUPREME COURT
Image caption বিচারপতি এস কে সিনহা লম্বা ছুটি নিয়ে প্রথমে অস্ট্রেলিয়া যান, সেখান থেকে যান সিঙ্গাপুরে।

এরপর বিচারপতি এস কে সিনহা লম্বা ছুটি নিয়ে প্রথমে অস্ট্রেলিয়া যান, সেখান থেকে যান সিঙ্গাপুরে।

কিন্তু দেশ ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের হাতে দিয়ে যান কিছু লিখিত বক্তব্য যা সরকারের দেয়া বক্তব্যের সাথে পুরোটাই অসঙ্গতিপূর্ণ। সেইসাথে তিনি অসুস্থ নন বলেও জানান।

বিচারপতি এস কে সিনহার ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি দেশে ফিরবেন কি-না, সে নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে তখন জানা গেল সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে তাঁর পদত্যাগ পত্র জমা দেয়ার খবর।

১১ই নভেম্বর বঙ্গভবনের মুখপাত্র জয়নাল আবেদীন বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেন খবরটি। তবে পদত্যাগের কারণ হিসেবে চিঠিতে কি লেখা হয়েছে সেটি জানাতে পারেননি রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব। বিচারপতি এস কে সিনহার পক্ষ থেকেও কোন বক্তব্য জানা যায়নি।

২০১৭ সালে বাংলাদেশে জন্য আরেক আতঙ্কের কারণ ছিল নিখোঁজ বা গুমের ঘটনা। বছরের শেষ দিকে নভেম্বর মাসে নিখোঁজ হন বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বার হাসান। পরে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়।

ইসলাম, রাজনীতি এবং জঙ্গিবাদ বিষয়ে সম্প্রতি তিনি দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং জার্নালে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন।

ছবির কপিরাইট NASHIRUL ISLAM
Image caption উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর ফরহাদ মজহার

এর আগে জুলাই মাসে কবি, কলামিস্ট, প্রবন্ধকার এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহারকে ভোর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানায় তার পরিবার।

ঢাকার শ্যামলীর নিজের বাসা থেকে ভোর পাঁচটার দিকে একটা ফোন পেয়ে বের হয়ে যান ফরহাদ মজহার।মি. মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার দুপুরে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন একটি ফোন পেয়ে তিনি বের হয়ে যান।

তিন জুলাই রাতে যশোর থেকে পুলিশ উদ্ধার করে মি. মজহারকে। সকালে ঢাকায় ডিবি অফিসে নিয়ে তার জবানবন্দি নেয়া হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয় তিনি স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে ছিলেন আর মি. মজহারের পরিবার বলে তাকে অপহরণ করা হবে। পুরো বিষয়টি নিয়ে রহস্য তৈরি হয়। তবে যারা ফিরে এসেছেন তাদের অনেকেই আর মুখ খোলেন নি।

এদিকে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার বলছে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর থেকে ৮০ জন নিখোঁজ হয়েছেন।

তারা কোথায় গেছেন বা আদৌ ফিরে আসবেন কিনা সেটা নিয়ে ভীষণ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নিখোঁজদের পরিবারগুলো। যদি এই নিখোঁজ ব্যক্তিরা ফিরে না আসেন তাহলে আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালেও তাদের এই ভয়, শঙ্কা অব্যাহত থাকবে।

চিঠিপত্র: সম্পাদকের উত্তর